ফাতেমা খুরশিদ সোমায়া:
ঢাকার দিলকুশা এলাকার একটি ঠিকানা ঘিরে ইন্স্যুরেন্স খাতে অনিয়ম, অবৈধ নিয়োগ, আর্থিক দুর্নীতি এবং ক্ষমতার অপব্যবহারের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান হিসেবে ইসলামী ইন্স্যুরেন্স বাংলাদেশ লিমিটেড এবং এর নাম সামনে এসেছে। অভিযোগে বলা হয়েছে, প্রতিষ্ঠানটির বর্তমান ও সাবেক সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে ক্ষমতার অপব্যবহার, রাজনৈতিক প্রভাব খাটানো এবং আর্থিক অনিয়মের মাধ্যমে বিভিন্ন সিদ্ধান্ত গ্রহণের বিষয়টি প্রশ্নবিদ্ধ। বিশেষ করে আব্দুল খালেক মিয়া নামের এক ব্যক্তির বিরুদ্ধে একাধিক অভিযোগ উত্থাপিত হয়েছে। তিনি অতীতে ইন্স্যুরেন্স খাতের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করেছেন বলে জানা যায়। অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়, আব্দুল খালেক মিয়া দীর্ঘ সময় চাকরিচ্যুত বা কর্মহীন থাকার পর পুনরায় মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) পদে নিয়োগ পান। তার শিক্ষাগত যোগ্যতা তৃতীয় বিভাগভুক্ত হওয়া সত্ত্বেও এবং দীর্ঘদিন কর্মবিরতির পরও এ ধরনের গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগ পাওয়া নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। সংশ্লিষ্ট মহলের দাবি, এ নিয়োগ প্রক্রিয়ায় যোগ্যতা ও নীতিমালার যথাযথ অনুসরণ হয়নি।
এছাড়া তার বিরুদ্ধে রাজনৈতিক প্রভাব ব্যবহার করে বিভিন্ন সুবিধা নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে। অভিযোগে বলা হয়, তিনি আওয়ামী লীগের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতা-কর্মীদের সাথে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রেখে কোম্পানির সিদ্ধান্ত প্রভাবিত করেছেন। একইসাথে মোঃ সাঈদ খোকন—এর প্রভাব ব্যবহার করে পরিচালনা পর্ষদে পরিবর্তন আনার ক্ষেত্রেও ভূমিকা রাখার অভিযোগ করা হয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, কোম্পানির প্রতিষ্ঠাকালীন পরিচালকদের একটি অংশকে অপসারণ করে নতুন করে ১০ জন পরিচালক নিয়োগ দেওয়া হয়, যা নিয়ম বহির্ভূত বলে দাবি করা হচ্ছে।
অভিযোগপত্রে আরও বলা হয়েছে, আব্দুল খালেক মিয়ার বিরুদ্ধে একাধিক হত্যা মামলা চলমান রয়েছে। মামলাগুলোর নম্বর যথাক্রমে ৫৪, ২৭ ও ৩৮ বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এসব মামলার কারণে তিনি আইনের আওতায় আছেন কিনা বা পলাতক কিনা—তা নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়েছে।
সূত্রমতে, গত ১৩ নভেম্বর ২০২৪ তারিখে তিনি পরিবারের সদস্যদের সাথে বিপুল অর্থ নিয়ে ঢাকা বিমানবন্দর দিয়ে বিদেশে পালানোর চেষ্টা করেন। তবে ব্যর্থ হয়ে বর্তমানে আত্মগোপনে আছেন বলে দাবি করা হয়েছে। তার বিরুদ্ধে অবৈধ উপায়ে সম্পদ অর্জন, মানিলন্ডারিং এবং বিদেশে অর্থপাচারের অভিযোগও উত্থাপিত হয়েছে। সূত্রে আরও জানা যায়, ইসলামী ইন্স্যুরেন্স বাংলাদেশ লিমিটেড-এর চেয়ারম্যান এবং বর্তমান ডিরেক্টরগণ ভার্চুয়াল মিটিংয়ে অনুপস্থিত থাকার শর্তেও কোম্পানির সমস্ত সুবিধা, বিল ভাতা ভোগ করে যাচ্ছেন। ৩১ ডিসেম্বর ২০২২ শেষে অগ্নি এবং মেরিন বিমা পলিসির খাতে এজেন্ট কমিশন দেওয়ার ক্ষেত্রেও অনেক গড়মিল দেখা যায়। এবং কোম্পানির এইচআর ভুক্ত স্টাফ মোট ৮২ জনের মধ্যে আইডিআরের লাইসেন্সপ্রাপ্ত শুধু মাত্র ৬০ জন। এই বাকি ২২ জন লাইসেন্স ছাড়াই বেতন, কমিশন ভোগ করছেন। আইডিআর কর্তৃক ২০২২ সালে অডিট রিপোর্টে যা উঠে এসেছে।
অভিযোগে উল্লেখ করা হয়, তার মালিকানায় বা পরিবারের সদস্যদের নামে ঢাকার গুলশান এলাকায় একাধিক ফ্ল্যাট রয়েছে। এছাড়া বসুন্ধরা এলাকার বিভিন্ন প্রকল্পে প্লট থাকার কথাও বলা হয়েছে। তার গ্রামের বাড়িতে একটি বিলাসবহুল অট্টালিকা নির্মাণাধীন রয়েছে বলেও অভিযোগে উল্লেখ করা হয়। এসব সম্পদের উৎস নিয়ে স্বচ্ছ তদন্তের দাবি উঠেছে।
অন্যদিকে, তার ব্যক্তিগত ব্যাংক লেনদেন ও আর্থিক বিবরণী পর্যালোচনা করলে আরও অনেক অজানা সম্পদের তথ্য পাওয়া যেতে পারে বলে অভিযোগকারীরা দাবি করছেন। তারা মনে করেন, একটি পূর্ণাঙ্গ ও নিরপেক্ষ তদন্ত হলে দুর্নীতি ও অবৈধ সম্পদের প্রকৃত চিত্র বেরিয়ে আসবে।
এ বিষয়ে কোম্পানির পরিচালনা পর্ষদ ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে যে, তারা যথাযথ যাচাই-বাছাই ছাড়াই অযোগ্য ব্যক্তিদের গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগ দিয়েছেন এবং অভ্যন্তরীণ স্বচ্ছতা বজায় রাখেননি।
এদিকে, অভিযোগপত্রে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের বিরুদ্ধাচরণ এবং রাজনৈতিক প্রভাব ব্যবহার করে বিভিন্ন সিদ্ধান্ত গ্রহণের বিষয়টিও উল্লেখ করা হয়েছে। বলা হচ্ছে, কোম্পানির অভ্যন্তরীণ নিয়োগ ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা ছিল, যা কর্পোরেট শাসনব্যবস্থার জন্য উদ্বেগজনক।
সংশ্লিষ্ট মহল বলছে, ইন্স্যুরেন্স খাত একটি সংবেদনশীল আর্থিক খাত হওয়ায় এখানে স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা এবং যোগ্যতার ভিত্তিতে নিয়োগ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু এ ধরনের অভিযোগ প্রমাণিত হলে তা পুরো খাতের প্রতি জনআস্থা কমিয়ে দিতে পারে।
এ পরিস্থিতিতে অভিযোগগুলো যাচাই করে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ এবং একটি স্বাধীন তদন্ত কমিটির মাধ্যমে পুরো বিষয়টি খতিয়ে দেখার দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।