মোহাম্মদ হোসেন হ্যাপী:
না খেয়ে জমানো টাকায় ফি দেওয়া হয়েছিল, তবুও এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নিতে পারেনি জান্নাতুল ফেরদৌস।
এসএসসি পরীক্ষার্থী জান্নাতুল ফেরদৌসের দিন শুরু হয়েছিল অন্য পরীক্ষার্থীদের মতোই। বাবা-মা ও প্রতিবেশীদের দোয়া নিয়ে সে পৌঁছেছিল পরীক্ষা কেন্দ্রে। সেখানে তার প্রবেশপত্র পাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু অন্যরা প্রবেশপত্র পেলেও জান্নাতুল তা পায়নি। বারবার অনুরোধ ও কান্নাকাটির পরও কোনো সমাধান হয়নি—ভেঙে যায় তার স্বপ্ন।
ঘটনাটি ঘটেছে এসএসসি ও সমমান পরীক্ষায় রংপুরের মিঠাপুকুর উপজেলার আলিম মাদরাসা পরীক্ষাকেন্দ্রে। জান্নাতুল ওই উপজেলার বালুয়া মাসুমপুর ইউনিয়নের সন্তোষপুর হাচিয়া গ্রামের রিকশাচালক জিয়াউর রহমানের মেয়ে। সে বুজরুক সন্তোষপুর কারামতিয়া ফাজিল মাদরাসা থেকে বিজ্ঞান বিভাগে দাখিল পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার কথা ছিল।
মেয়ে পরীক্ষা দিতে না পারায় ভেঙে পড়েছেন জান্নাতুলের বাবা-মা। তার মা এসমোত আরা বলেন, “পরীক্ষার ফরম পূরণের জন্য ২ হাজার ৩০০ টাকা দিয়েছি। এক মাস একবেলা না খেয়ে জমিয়েছিলাম এই টাকা। কিন্তু প্রবেশপত্র না পাওয়ায় আমার মেয়েটা পরীক্ষা দিতে পারল না। ভাঙা ঘরে থেকেও ডাক্তার হওয়ার স্বপ্নটা শেষ হয়ে গেল ওর।”
দরিদ্র এই পরিবারটি মেয়ের লেখাপড়ার জন্য দীর্ঘদিন ধরে সংগ্রাম করে আসছিল। রিকশাচালক বাবার সীমিত আয়ে পড়ালেখার খরচ চালানো কঠিন হলেও মেয়ের ইচ্ছার কথা ভেবে সংসারের খরচ বাঁচিয়ে ফরম পূরণ করা হয়। পরীক্ষার জন্য ভালোভাবে প্রস্তুতিও নিয়েছিল জান্নাতুল।
জান্নাতুল জানায়, “অন্য প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা আগেই প্রবেশপত্র পেয়েছে। কিন্তু আমাদের পরীক্ষার দিন কেন্দ্রে দেওয়া হয়। সেখানে ৫০০ টাকা করে নেওয়া হয় প্রবেশপত্রের জন্য। অন্যরা পেলেও আমি পাইনি, তাই পরীক্ষা দিতে পারিনি।”
তার অভিযোগ, বিষয়টি জানাজানি হলে তাকে মাদরাসার অধ্যক্ষ এ কে মোনায়েম সরকারের কাছে নিয়ে যাওয়া হয়। তিনি বলেন, “মা, এ বছর তোমার পরীক্ষা দেওয়া হলো না। আগামী বছর তোমার পরীক্ষা দিতে যা খরচ হবে, আমি দেব।”
জান্নাতুল আরও বলে, “এরপর শিক্ষকরা আমাকে বাড়িতে পৌঁছে দেন। তারা আমার আম্মুকে ২ হাজার টাকা দিতে চেয়েছিলেন, কিন্তু মা তা নেননি। কারণ লাখ টাকা দিলেও তো আমার এক বছর ফিরিয়ে দিতে পারবে না।”
কান্নাজড়িত কণ্ঠে জান্নাতুল বলে, “আমি এই বছরেই পরীক্ষা দিতে চাই।”
এ বিষয়ে জানতে চাইলে মাদরাসার অধ্যক্ষ এ কে মোনায়েম সরকার দায় স্বীকার করে বলেন, জান্নাতুলের প্রবেশপত্র কেন আসেনি, তা তিনি বুঝে উঠতে পারছেন না। বিষয়টি নিয়ে বোর্ডের সঙ্গে যোগাযোগ করে খোঁজ নেওয়া হচ্ছে বলে জানান তিনি।