ফারইস্ট ইসলামী লাইফ ইনস্যুরেন্সে হাজার কোটি টাকার অনিয়মের অভিযোগ

মোঃ জাহাঙ্গীর হোসেন:

দেশের বীমা খাতে বহুল আলোচিত ও সমালোচিত প্রতিষ্ঠানের তালিকায় শীর্ষে উঠে এসেছে ফারইস্ট ইসলামী লাইফ ইনস্যুরেন্স কোম্পানি লিমিটেড। একের পর এক আর্থিক কেলেঙ্কারি, দুর্নীতি, অনিয়ম, অর্থ আত্মসাৎ এবং গ্রাহকদের দাবি পরিশোধে দীর্ঘসূত্রতার অভিযোগে প্রতিষ্ঠানটি এখন তীব্র আস্থার সংকটে পড়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্র, তদন্ত সংস্থা এবং নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠানের নথিপত্র বিশ্লেষণে দেখা গেছে, প্রতিষ্ঠানটির অনিয়ম শুধু একটি কোম্পানির সীমাবদ্ধতা নয়, বরং পুরো বীমা খাতের জন্য একটি বড় ধরনের সতর্ক সংকেত হয়ে দাঁড়িয়েছে।

ফারইস্ট ইসলামী লাইফের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলোর মধ্যে সবচেয়ে গুরুতর হলো বিপুল পরিমাণ অর্থ আত্মসাৎ ও আর্থিক জালিয়াতি। তদন্তে উঠে এসেছে, কোম্পানির সাবেক চেয়ারম্যান মো. নজরুল ইসলামসহ কয়েকজন প্রভাবশালী ব্যক্তি রাজধানীর তোপখানা রোডে জমি কেনার নামে ভুয়া কাগজপত্র তৈরি করে প্রায় ৪৫ কোটি টাকা আত্মসাৎ করেছেন। শুধু তাই নয়, নজরুল ইসলাম ও তাঁর স্ত্রী তাসলিমা ইসলামের বিরুদ্ধে প্রায় ১৯ কোটি ৫০ লাখ টাকা অবৈধভাবে গ্রহণ ও আত্মসাতের অভিযোগও রয়েছে। এই ঘটনায় দুর্নীতি দমন কমিশন একাধিক মামলা দায়ের করেছে, যেখানে দুর্নীতি প্রতিরোধ আইন, দণ্ডবিধি এবং মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইনের আওতায় অভিযোগ আনা হয়েছে।

মানি লন্ডারিং বা অর্থ পাচারের অভিযোগও এই কেলেঙ্কারির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তদন্তকারী সংস্থার দাবি, আত্মসাৎ করা অর্থের একটি অংশ বিদেশে পাচার করা হয়েছে অথবা বিভিন্ন অবৈধ আর্থিক চ্যানেলের মাধ্যমে গোপনে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। এই অভিযোগগুলোর প্রেক্ষিতে একাধিক তদন্ত এখনো চলমান রয়েছে এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে বিচারিক কার্যক্রম অব্যাহত আছে। তবে মামলাগুলোর দীর্ঘসূত্রতার কারণে এখনো চূড়ান্ত কোনো নিষ্পত্তি হয়নি, যা গ্রাহকদের মধ্যে হতাশা আরও বাড়িয়ে তুলেছে।

এই অনিয়ম ও দুর্নীতির সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী হচ্ছেন সাধারণ গ্রাহকরা। হাজার হাজার পলিসিধারী তাদের কষ্টার্জিত অর্থ বিনিয়োগ করে এখন বিপাকে পড়েছেন। মেয়াদপূর্তির পরও তারা সময়মতো টাকা পাচ্ছেন না, এমনকি মৃত্যু দাবির ক্ষেত্রেও দীর্ঘ বিলম্ব দেখা যাচ্ছে। অনেক গ্রাহক বছরের পর বছর ধরে কোম্পানির অফিসে ঘুরেও কোনো সমাধান পাচ্ছেন না। ফলে তাদের মধ্যে চরম অসন্তোষ ও হতাশা তৈরি হয়েছে।

অন্যদিকে, ২০১৯ সালের পর থেকে কোম্পানিটি কোনো ধরনের বোনাস ঘোষণা করেনি। এতে গ্রাহকদের সঞ্চিত অর্থের প্রত্যাশিত প্রবৃদ্ধি বন্ধ হয়ে গেছে। বিশেষ করে যারা দীর্ঘমেয়াদি পলিসি নিয়েছিলেন, তারা আর্থিকভাবে বড় ক্ষতির মুখে পড়েছেন। অনেকেই অভিযোগ করছেন, কোম্পানি ইচ্ছাকৃতভাবে বোনাস বন্ধ রেখে নিজেদের আর্থিক সংকট আড়াল করার চেষ্টা করছে।

দুর্নীতি ও অর্থ আত্মসাতের ফলে কোম্পানিটি মারাত্মক তারল্য সংকটে পড়েছে। এই সংকট এতটাই তীব্র যে নিয়মিত দাবি পরিশোধ করাও কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফলে নতুন গ্রাহক আকৃষ্ট করা তো দূরের কথা, পুরনো গ্রাহকদের আস্থা ধরে রাখাও এখন কোম্পানির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে। অনেক ক্ষেত্রে দেখা গেছে, আংশিক অর্থ পরিশোধ করে গ্রাহকদের সন্তুষ্ট করার চেষ্টা করা হচ্ছে, যা সমস্যার স্থায়ী সমাধান নয়।

পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (আইডিআরএ) একাধিক পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। ২০২১ সালে কোম্পানির সার্বিক কার্যক্রম তদারকির জন্য একজন প্রশাসক নিয়োগ দেওয়া হয়। পাশাপাশি দুর্নীতির অভিযোগে আগের পরিচালনা পর্ষদ ভেঙে দিয়ে নতুন বোর্ড গঠন করা হয়েছে। গ্রাহকদের দাবি পরিশোধ নিশ্চিত করতে কোম্পানির বিভিন্ন সম্পদ, যেমন জমি ও ফ্ল্যাট বিক্রির নির্দেশও দেওয়া হয়েছে। তবে এসব পদক্ষেপ সত্ত্বেও এখনো কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি দেখা যায়নি।

২০২৬ সালে এসে ফারইস্ট ইসলামী লাইফ এখনো সংকট কাটিয়ে উঠতে পারেনি। সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, বর্তমানে প্রায় ১৫০০ কোটির বেশি দাবি বকেয়া রয়েছে। কিছু পুরনো দাবি আংশিকভাবে পরিশোধ করা হলেও অধিকাংশ গ্রাহক এখনো তাদের প্রাপ্য অর্থ থেকে বঞ্চিত। নতুন পলিসি বিক্রি প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে, যা কোম্পানির ভবিষ্যৎ নিয়ে আরও অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে।

বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এই সংকট থেকে উত্তরণে শুধু প্রশাসনিক পদক্ষেপ যথেষ্ট নয়, প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি কাঠামোগত সংস্কার। তারা বলছেন, কোম্পানির আর্থিক স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা, জবাবদিহিতা বাড়ানো এবং দুর্নীতির সঙ্গে জড়িতদের দ্রুত বিচারের আওতায় আনা জরুরি। অন্যথায় গ্রাহকদের আস্থা ফিরিয়ে আনা সম্ভব হবে না।

ফারইস্ট ইসলামী লাইফের এই সংকট পুরো বীমা খাতের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। সাধারণ মানুষের মধ্যে বীমা নিয়ে অনাস্থা বেড়ে গেছে, ফলে নতুন পলিসি গ্রহণে আগ্রহ কমে গেছে। এর ফলে অন্যান্য বীমা কোম্পানিগুলোকেও চাপের মুখে পড়তে হচ্ছে। অনেকেই এখন বীমাকে ঝুঁকিপূর্ণ বিনিয়োগ হিসেবে বিবেচনা করছেন, যা দেশের আর্থিক খাতের জন্য উদ্বেগজনক।

এ অবস্থায় গ্রাহকদের জন্য কিছু গুরুত্বপূর্ণ করণীয় তুলে ধরেছেন সংশ্লিষ্টরা। যাদের ফারইস্ট ইসলামী লাইফে পলিসি রয়েছে, তারা আইডিআরএ-এর হটলাইন ১৬১৩০ নম্বরে কল করে অভিযোগ নিবন্ধন করতে পারেন। বড় ধরনের আর্থিক অনিয়মের ক্ষেত্রে দুর্নীতি দমন কমিশনের ১০৬ নম্বরে অভিযোগ জানানো যেতে পারে। এছাড়া ঢাকার দিলকুশা বাণিজ্যিক এলাকায় কোম্পানির প্রধান কার্যালয়ে সরাসরি যোগাযোগ করে দাবির অগ্রগতি সম্পর্কে খোঁজ নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

গ্রাহকদের আরও পরামর্শ দেওয়া হয়েছে, তাদের সব ধরনের কাগজপত্র—যেমন প্রিমিয়াম রশিদ, পলিসি ডকুমেন্ট এবং লেনদেন সংক্রান্ত তথ্য—সংরক্ষণ করতে। কারণ ভবিষ্যতে আইনি প্রক্রিয়ায় এসব কাগজপত্র গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ হিসেবে কাজ করতে পারে।

বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে ফারইস্ট ইসলামী লাইফে নতুন পলিসি গ্রহণ করা ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। তারা গ্রাহকদের আর্থিকভাবে শক্তিশালী ও নির্ভরযোগ্য প্রতিষ্ঠানে বিনিয়োগ করার পরামর্শ দিয়েছেন। একই সঙ্গে নিয়ন্ত্রক সংস্থার প্রতি আহ্বান জানানো হয়েছে, যাতে তারা আরও কঠোর নজরদারি ও দ্রুত পদক্ষেপ গ্রহণ করে বীমা খাতকে স্থিতিশীল রাখে।

উপসংহারে বলা যায়, ফারইস্ট ইসলামী লাইফ ইনস্যুরেন্সের এই ঘটনা শুধুমাত্র একটি প্রতিষ্ঠানের সংকট নয়, বরং এটি দেশের বীমা খাতের দুর্বলতা, অনিয়ম এবং নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতার প্রতিফলন। দুর্নীতির বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ, দ্রুত বিচার নিশ্চিত করা এবং গ্রাহকদের স্বার্থ সুরক্ষায় শক্তিশালী পদক্ষেপ নেওয়া না হলে ভবিষ্যতে আরও বড় সংকটের আশঙ্কা রয়েছে।

এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো গ্রাহকদের আস্থা পুনরুদ্ধার করা। এই আস্থা ফিরিয়ে আনতে পারলেই কেবল দেশের বীমা খাত আবারও স্থিতিশীলতার পথে ফিরতে পারবে। অন্যথায় এই সংকট দীর্ঘস্থায়ী হয়ে পুরো আর্থিক ব্যবস্থার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *