তাহের উদ্দিন:
রাজধানীর পরিচ্ছন্নতা রক্ষায় যাঁরা দিনরাত রোদ-বৃষ্টি উপেক্ষা করে রাস্তায় কাজ করেন, সেই খেটে খাওয়া শ্রমিকদের কষ্টার্জিত মজুরিই এবার লুটের শিকার হয়েছে বলে গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) পরিচ্ছন্ন লেবারদের মাসিক মজুরি থেকে বিপুল অঙ্কের অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে সংস্থাটির সহকারী পরিচ্ছন্ন কর্মকর্তা শাখাওয়াত মোল্লার বিরুদ্ধে। অভিযোগকারীরা দ্রুত তদন্ত ও দোষীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের জোর দাবি জানিয়েছেন।
অভিযোগে জানা গেছে, ডিএসসিসির ২ নম্বর জোনের আওতাধীন ১২টি ওয়ার্ডে প্রতিদিন হাজারের উপর পরিচ্ছন্ন শ্রমিক দৈনিক ভিত্তিতে কাজ করেন। এই শ্রমিকদের একটি বড় অংশকে ইচ্ছাকৃতভাবে অনুপস্থিত দেখিয়ে তাদের প্রাপ্য মজুরি থেকে অর্থ কেটে নেওয়া হচ্ছে। মাস শেষে এই কাটা অর্থের পরিমাণ কয়েক লক্ষ টাকায় গিয়ে দাঁড়ায় বলে ভুক্তভোগীরা জানিয়েছেন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক শ্রমিক অভিযোগ করেন, যাঁরা এই অন্যায়ের বিরুদ্ধে মুখ খুলতে সাহস করেন, তাঁদের চাকরি হারানোর ভয় দেখিয়ে চুপ করিয়ে দেওয়া হয়। ভয় ও প্রভাবের কাছে অসহায় এই শ্রমিকরা দীর্ঘদিন ধরে নীরবে এই অবিচার সহ্য করে আসছেন।
এক ক্ষুব্ধ শ্রমিক বলেন, “আমাদের হাজিরা ঠিক থাকলেও অনেক সময় ইচ্ছামতো নাম কেটে দেওয়া হয়। টাকা চাইলে বলা হয় চাকরি থাকবে না। তাই বাধ্য হয়েই নীরব থাকতে হয়।”এই একটি বাক্যেই ফুটে ওঠে কতটা অসহায় অবস্থায় দিন পার করছেন এই নিম্ন আয়ের মানুষগুলো।
অভিযোগ রয়েছে, শাখাওয়াত মোল্লা একটি প্রভাবশালী চক্রের মাধ্যমে দীর্ঘদিন ধরে পুরো প্রক্রিয়াটি নিয়ন্ত্রণ করে আসছেন। শ্রমিকদের বেতন তালিকা কারসাজি করে অর্থ আত্মসাতের এই চক্র সুকৌশলে পরিচালিত হচ্ছে বলে অভিযোগকারীরা দাবি করেন।
ভুক্তভোগী শ্রমিকরা নিজেদের ন্যায্য অধিকার ফিরে পেতে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের বর্তমান প্রশাসক আবদুস সালামের কাছে লিখিত আবেদন দাখিল করেছেন। আবেদনে দ্রুত তদন্ত কমিটি গঠন করে দোষীদের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ও আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার জোর দাবি জানানো হয়েছে।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে সহকারী পরিচ্ছন্ন কর্মকর্তা শাখাওয়াত মোল্লা সকল অভিযোগ সরাসরি অস্বীকার করেন। তিনি বলেন, “আমি কোনো ধরনের অনিয়ম বা দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত নই। আমার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।”তবে তাঁর এই দাবির বিপরীতে ভুক্তভোগী শ্রমিকদের অভিযোগ ও সাক্ষ্য অত্যন্ত সুনির্দিষ্ট ও বিস্তারিত বলে সংশ্লিষ্ট মহল মনে করছে।
উদ্বেগজনক বিষয় হলো, অভিযোগ দাখিলের পরেও ডিএসসিসি কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়নি এবং কোনো আধিকারিক বক্তব্যও পাওয়া যায়নি। কর্তৃপক্ষের এই নীরবতা সংশ্লিষ্ট এলাকায় শ্রমিকদের মধ্যে চরম অসন্তোষ ও ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে।
স্থানীয় সচেতন মহল মনে করছেন, অভিযোগগুলোর সুষ্ঠু তদন্ত না হলে পরিচ্ছন্নতা ব্যবস্থায় মারাত্মক অস্থিরতা তৈরি হতে পারে এবং প্রকৃত শ্রমিকরা তাঁদের ন্যায্য অধিকার থেকে চিরতরে বঞ্চিত হবেন। তাঁরা দাবি করেছেন, দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে দ্রুত দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করা না হলে সরকারি প্রতিষ্ঠানে এ ধরনের অনিয়ম আরও বাড়তে থাকবে।
সামগ্রিক পরিস্থিতি বিবেচনায় সংশ্লিষ্ট সকলে মনে করছেন, ডিএসসিসি প্রশাসকের উচিত এই বিষয়টিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে অবিলম্বে একটি নিরপেক্ষ তদন্ত কমিটি গঠন করা এবং তদন্তের ভিত্তিতে দোষীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া। অন্যথায় নগরীর পরিচ্ছন্নতা রক্ষায় নিযুক্ত এই অসহায় শ্রমিকদের ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠা সুদূরপরাহত থেকে যাবে।