পটুয়াখালী জেলা প্রতিনিধি :
পটুয়াখালীর মির্জাগঞ্জে এখন মানুষের মুখে মুখে একটাই নাম—“কালো মানিক”। বিশালাকৃতির কালো এই ষাঁড়কে এক নজর দেখতে প্রতিদিনই ভিড় জমাচ্ছেন দূর-দূরান্তের মানুষ। চকচকে কালো শরীর, গর্জন তোলা হাম্বা ডাক আর প্রায় ৪৪ মণ ওজনের এই গরুটি এখন জেলার সবচেয়ে আলোচিত কোরবানির পশুগুলোর একটি।
একসময় বিএনপি চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে উপহার দেওয়া হয়েছিল এই ষাঁড়টি। পরে তিনি সেটি আবার কৃষক সোহাগ মৃধার পরিবারকেই উপহার হিসেবে ফিরিয়ে দেন। এবার আসন্ন পবিত্র ঈদুল আজহা উপলক্ষে সেই আলোচিত “কালো মানিক” বিক্রির সিদ্ধান্ত নিয়েছেন মালিক সোহাগ মৃধা।
ফ্রিজিয়ান জাতের প্রায় ১২ ফুট লম্বা ও সাড়ে ৫ ফুট উচ্চতার এই গরুটির দাম চাওয়া হচ্ছে ২২ লাখ টাকা। শুধু তাই নয়, গরুটির সঙ্গে প্রায় ৫০ থেকে ৬০ হাজার টাকা মূল্যের একটি ব্ল্যাক বেঙ্গল ছাগলও উপহার দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন সোহাগ।
শুক্রবার (১৫ মে) সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, মির্জাগঞ্জ উপজেলার আমড়াগাছিয়া ইউনিয়নের উত্তর ঝাটিবুনিয়া এলাকায় সোহাগ মৃধার বাড়িতে যেন ছোটখাটো মেলা বসেছে। কেউ ছবি তুলছেন, কেউ ভিডিও করছেন, আবার কেউ বিস্ময়ে তাকিয়ে দেখছেন বিশাল দেহের “কালো মানিক”-কে।
খামারে গিয়ে দেখা যায়, গরুটির পরিচর্যায় ব্যস্ত সময় পার করছেন সোহাগ মৃধা ও তার স্ত্রী সুলতানা বেগম। পরিবারের সদস্যরাও যেন গরুটিকে ঘিরেই দিন কাটান। সোহাগের ছোট ছেলে জিসান গরুটির পিঠে উঠে চিরুনি দিয়ে লোম আচড়ে দিচ্ছিল। বিশাল দেহের “কালো মানিক” মাঝেমধ্যেই বিকট হাম্বা ডাক দিচ্ছিল, আবার কখনও শোঁ শোঁ শব্দ করছিল।
স্থানীয় বাসিন্দা আরিফ বলেন, “ওর ডাক প্রায় দেড় কিলোমিটার দূর থেকেও শোনা যায়। রেগে গেলে ৮-১০ জন মানুষ মিলেও সামলানো যায় না। গাছের সঙ্গে মোটা দড়ি পেঁচিয়ে বেঁধে রাখতে হয়। এত বড় গরু পটুয়াখালীতে আর আছে কি না সন্দেহ।”
আরেক স্থানীয় বাসিন্দা সানোয়ার হাওলাদার বলেন, “প্রতিদিন বিভিন্ন এলাকা থেকে মানুষ এই গরু দেখতে আসে। শরীরটা একদম তেলের মতো চকচকে। আমি জীবনে এত বড় গরু দেখিনি।”
মাহমুদ হাসান নামে আরেকজন বলেন, “৭-৮ বছর ধরে সোহাগ ভাই গরুটিকে সন্তানের মতো লালন-পালন করেছেন। এখন বিক্রি করবেন শুনে খারাপ লাগছে। কিন্তু গরুটির পেছনে অনেক খরচ হয়।”
স্থানীয় বাসিন্দা মুরাদ বলেন, “এই গরুটি একসময় দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে উপহার দেওয়া হয়েছিল। পরে তিনি আবার সোহাগ ভাইকে ফেরত দেন। তাই এই গরু কেনা মানে একটি স্মৃতিও পাওয়া।”
সোহাগ মৃধার স্ত্রী সুলতানা বেগম বলেন, “আমার দুইটা সন্তান, আর কালো মানিক আমার আরেক সন্তান। সাত বছর ধরে নিজের সন্তানের মতো বড় করছি। এখন বিক্রি করে সংসারের কাজে লাগাবো। প্রতিদিন ১০০০-১২০০ টাকা শুধু ওর খাবারের পেছনে খরচ হয়।”
কৃষক সোহাগ মৃধা বলেন, “আমার অনেক দিনের ইচ্ছা ছিল দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে গরুটি উপহার দেব। গত বছর আমরা প্রায় ৭০ জন মানুষ গরু নিয়ে ঢাকায় গিয়েছিলাম। নেত্রী গরুটি গ্রহণ করে আবার খুশি হয়ে আমার ছোট ছেলেকে দিয়ে দেন। এটা আমাদের জন্য অনেক বড় সম্মানের।”
তিনি আরও বলেন, “ছোটবেলা থেকেই ওর নাম রাখছি কালো মানিক। সাত বছর ধরে প্রাকৃতিক খাবার খাইয়ে বড় করছি। এখন পরিবারে স্বচ্ছলতা ফেরাতে বিক্রি করবো। যে কিনবে, তাকে সঙ্গে একটি বড় ব্ল্যাক বেঙ্গল ছাগলও উপহার দেব।”
পটুয়াখালী জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা হাবিবুর রহমান বলেন, “শুরু থেকেই উপজেলা প্রাণিসম্পদ অফিস থেকে কৃষক সোহাগ মৃধাকে পরামর্শ ও সহযোগিতা দেওয়া হয়েছে। কোরবানির আগে ঢাকার বড় পশুর হাটে গরুটি নেওয়ার পরামর্শও দেওয়া হয়েছে। আশা করি তিনি ভালো দাম পাবেন।”