নানা অনিয়ম ও সংকটে জর্জরিত শরীয়তপুর সদর হাসপাতাল

অনলাইন ডেস্ক:

নামে ‘আধুনিক’ হলেও বাস্তবে জরাজীর্ণতা, জনবল সংকট ও অনিয়মে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে শরীয়তপুর সদর আধুনিক হাসপাতাল। কোটি কোটি টাকার আধুনিক চিকিৎসা সরঞ্জাম অব্যবহৃত ও অবহেলায় নষ্ট হওয়ার পথে, অন্যদিকে সামান্য পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্যও রোগীদের ভরসা করতে হচ্ছে বেসরকারি ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের দালাল চক্রের ওপর।

স্থানীয়দের অভিযোগ, হাসপাতালের একাংশ চিকিৎসকই বেসরকারি ক্লিনিক ব্যবসার সঙ্গে জড়িত। তাদের দাবি, দুপুর ১টার পর থেকেই অনেক চিকিৎসক হাসপাতাল ত্যাগ করে ব্যক্তিগত ক্লিনিকে চলে যান। এতে সরকারি হাসপাতাল সেবার মান আরও ভেঙে পড়ে। পাশাপাশি ভবনের পুরোনো ও ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থার কারণে ছাদের প্লাস্টার খসে পড়ার মতো ঘটনা ঘটার আশঙ্কাও রয়েছে, যা রোগী ও চিকিৎসক উভয়ের জন্যই ঝুঁকিপূর্ণ।

হাসপাতাল সূত্র জানায়, কাগজে-কলমে ১০০ শয্যার প্রতিষ্ঠান হলেও বাস্তবে ৫০ শয্যার জনবলও এখানে নেই। অথচ এখানে আধুনিক চিকিৎসা সেবার জন্য প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি থাকলেও দীর্ঘদিন ধরে অজ্ঞাত কারণে অনেকগুলোই অচল অবস্থায় পড়ে আছে। তিনটি এক্স-রে মেশিনের মধ্যে কার্যকর রয়েছে মাত্র দুটি।

এছাড়া দুটি আল্ট্রাসনোগ্রাফি মেশিন, দুটি ইসিজি মেশিন, মাল্টি প্যারামিটার পেশেন্ট মনিটর ও পালস অক্সিমিটারসহ গুরুত্বপূর্ণ বেশ কয়েকটি যন্ত্র দীর্ঘদিন ব্যবহার না হওয়ায় নষ্ট হওয়ার উপক্রম হয়েছে। এই পরিস্থিতিকে কাজে লাগিয়ে বেসরকারি ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের দালাল চক্র রোগীদের বিভিন্নভাবে প্রলুব্ধ করে বাইরে নিয়ে যাচ্ছে, বিশেষ করে প্রসূতি মা ও সাধারণ রোগীদের লক্ষ্য করে। ফলে অতিরিক্ত অর্থ ব্যয়ে ভুগছেন দরিদ্র রোগীরা।

হাসপাতালে জনবল সংকট এখন চরম পর্যায়ে পৌঁছেছে। সম্প্রতি ২৫০ শয্যায় উন্নীত করা হলেও সে অনুযায়ী সেবার কোনো উন্নতি হয়নি। ৭২ জন চিকিৎসকের বিপরীতে বর্তমানে কর্মরত আছেন মাত্র ৩০ জন। ফলে ৪২টি চিকিৎসকের পদই শূন্য। সীমিত জনবল দিয়েই চলছে পুরো চিকিৎসা কার্যক্রম।

অভিযোগ রয়েছে, অনেক চিকিৎসক সপ্তাহে মাত্র ৩ থেকে ৪ দিন হাসপাতালে উপস্থিত থাকেন। এতে সেবা কার্যক্রম আরও দুর্বল হয়ে পড়ছে।

শুধু চিকিৎসক নয়, তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীর সংকটও প্রকট। ৮৩টি অনুমোদিত পদের মধ্যে ৪৩টি শূন্য, কর্মরত আছেন মাত্র ৪০ জন। নার্সিং বিভাগেও ৯২টি পদের মধ্যে ৫৯ জন কর্মরত থাকলেও ৩৩টি পদ শূন্য রয়েছে।

এদিকে দালাল চক্রের দৌরাত্ম্য হাসপাতালের ভেতরেই স্পষ্ট। ছোটখাটো অপারেশনসহ বিভিন্ন চিকিৎসা সেবার ক্ষেত্রে রোগীদের ভয়ভীতি দেখিয়ে বেসরকারি ক্লিনিকে পাঠানোর অভিযোগ রয়েছে। প্রতিদিন বহির্বিভাগে ৬০০ থেকে ৭০০ রোগী চিকিৎসা নিতে আসেন। ইনডোরেও রয়েছে ব্যাপক চাপ। কিন্তু প্রয়োজনীয় ওষুধের বড় অংশই রোগীদের বাইরে থেকে কিনতে হচ্ছে।

হাসপাতাল চত্বরে ময়লা-আবর্জনার দুর্গন্ধ এবং পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার অভাবও রোগীদের ভোগান্তি বাড়াচ্ছে। পাশাপাশি দূর-দূরান্তের রোগীদের জন্য একটি মাত্র সরকারি অ্যাম্বুলেন্স থাকায় জরুরি পরিস্থিতিতে চরম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে, যার সুযোগ নিচ্ছে প্রাইভেট অ্যাম্বুলেন্স সিন্ডিকেট ও দালালরা।

শরীয়তপুর সদর হাসপাতালের আরএমও ডা. মিতু আক্তার বলেন, চিকিৎসক সংকট রয়েছে, তাই সীমিত জনবল দিয়েই হাসপাতাল পরিচালনা করতে হচ্ছে। দীর্ঘদিন ধরে একাধিক কনসালটেন্ট পদ শূন্য। বিষয়টি নিয়ে আমরা নিয়মিত ঢাকায় চিঠি পাঠাচ্ছি, কিন্তু এখনো পর্যাপ্ত চিকিৎসক পাওয়া যায়নি।

তিনি আরও বলেন, দক্ষ জনবলের অভাবে অনেক যন্ত্র দীর্ঘদিন ব্যবহার না হওয়ায় অচল হয়ে পড়েছে। এতে রোগীদের ভোগান্তি বাড়ছে। পাশাপাশি হাসপাতাল ভবনও ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। নতুন ভবনের কাজ সময়মতো শেষ না হওয়ায় বাধ্য হয়ে পুরোনো ভবনেই ঝুঁকি নিয়ে চিকিৎসা কার্যক্রম চালাতে হচ্ছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *