মোঃ আনজার শাহ:
আঁচলে মুখ ঢেকে কাঁদেননি তাঁরা। বরং মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়েছেন। চোখে স্বপ্ন, বুকে সাহস আর ঠোঁটে এক অদৃশ্য হাসি নিয়ে আজ বরুড়ার শত শত নারী একত্রিত হয়েছিলেন এক অসাধারণ মুহূর্তের সাক্ষী হতে। কুমিল্লার বরুড়া উপজেলা পরিষদ মিলনায়তন আজ রবিবার (১৭ মে ২০২৬) যেন পরিণত হয়েছিল এক আলোর উৎসবে। যেখানে প্রতিটি নারীর উপস্থিতি ছিল একটি বার্তা, প্রতিটি করতালি ছিল একটি প্রতিজ্ঞা এবং প্রতিটি চোখের দীপ্তি ছিল একটি বিপ্লবের ঘোষণা।
“সবার বাংলাদেশ” শিরোনামে আয়োজিত এই নারী সমাবেশে বর্তমান সরকারের নির্বাচনি ইশতেহার বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে মানব পাচার বিরোধী সচেতনতা, ফ্যামিলি কার্ড বিতরণ, কৃষক কার্ড, কৃষি ঋণ মওকুফ, বৃক্ষরোপণ এবং নারীর জন্য বিশেষ পরিবহন সুবিধাসহ ইশতেহারে বর্ণিত বিষয়সমূহে জনসচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে বিভিন্ন কার্যক্রম উপস্থাপন করা হয়। অনুষ্ঠানটি আয়োজন করে তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন কুমিল্লা আঞ্চলিক তথ্য অফিস এবং সহযোগিতা করে বরুড়া উপজেলা প্রশাসন।
যে কথা বুকে চাপা ছিল, আজ তা বলার দিন—
মঞ্চে উঠলেন গৃহায়ণ ও গণপূর্তমন্ত্রী জাকারিয়া তাহের। মাইক্রোফোনের সামনে দাঁড়িয়ে তিনি তাকালেন সামনের দিকে—সারি সারি নারীর মুখের দিকে। একটু থেমে তিনি বললেন, এই দেশের প্রতিটি মায়ের ঘাম, প্রতিটি বোনের স্বপ্ন আর প্রতিটি কন্যার সম্ভাবনাকে আমরা আর উপেক্ষা করতে পারি না। এই দেশ তাঁদেরও, এই উন্নয়ন তাঁদেরও এবং এই সাফল্যের ভাগীদার তাঁরাও।
তিনি বলেন, আমরা নির্বাচনের আগে জনগণের কাছে যে ওয়াদা করেছিলাম তা আজ বাস্তবে রূপ নিচ্ছে। ফ্যামিলি কার্ডের মাধ্যমে দরিদ্র পরিবারের নারীদের হাতে সরাসরি রাষ্ট্রের ভালোবাসা পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে। কোনো দালাল নেই, কোনো মধ্যস্বত্বভোগী নেই। সরাসরি সেই নারীর হাতে—যিনি সারাজীবন দিয়েছেন, কিন্তু কিছুই পাননি।
আবেগঘন কণ্ঠে মন্ত্রী আরও বলেন, একজন নারী যখন শিক্ষিত হন, তখন শুধু একজন মানুষ শিক্ষিত হন না। আলোকিত হয় একটি পরিবার, জেগে ওঠে একটি সমাজ এবং শক্তিশালী হয় একটি জাতির মেরুদণ্ড। তাই নারীর শিক্ষা, নারীর স্বাস্থ্য, নারীর নিরাপত্তা এবং নারীর অর্থনৈতিক স্বাধীনতা নিশ্চিত করা এই সরকারের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকারের মধ্যে একটি। এই ওয়াদা আমরা দিয়েছিলাম, এই ওয়াদা আমরা রাখছি এবং শেষ দিন পর্যন্ত রাখব।
ঘরের কোণ থেকে রাষ্ট্রের কেন্দ্রে—
মন্ত্রী তাঁর বক্তব্যে আরও বলেন, বাংলাদেশের নারীরা কখনো দুর্বল ছিলেন না। তাঁরা শুধু সুযোগের অপেক্ষায় ছিলেন। সেই সুযোগ এখন তৈরি হচ্ছে। মানব পাচারের বিরুদ্ধে সচেতনতা তৈরি করা হচ্ছে, যাতে কোনো মা তাঁর মেয়েকে হারিয়ে না ফেলেন। নারীর জন্য বিশেষ পরিবহন সুবিধা নিশ্চিত করা হচ্ছে, যাতে তাঁরা নিরাপদে পথ চলতে পারেন। কারণ একজন নারীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা মানেই একটি পরিবারের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।
প্রশাসনের দৃঢ় প্রতিশ্রুতি—
সমাবেশে সভাপতিত্ব করেন বরুড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আসাদুজ্জামান রনি। তিনি বলেন, সরকারের প্রতিটি নারীবান্ধব কার্যক্রম যাতে প্রান্তিক নারীর দোরগোড়া পর্যন্ত নিরবচ্ছিন্নভাবে পৌঁছায়, তা নিশ্চিত করতে উপজেলা প্রশাসন সর্বদা প্রস্তুত। কোনো নারী যেন বঞ্চিত না থাকেন, সেটি আমাদের অঙ্গীকার।
অনুষ্ঠানে বরুড়া থানার অফিসার ইনচার্জ কাজী নাজমুল হাসানসহ উপজেলার প্রতিটি প্রান্ত থেকে ছুটে আসা নারী সমাজের প্রতিনিধি এবং স্থানীয় নেতাকর্মীরা প্রাণবন্ত অংশগ্রহণ করেন।
যে আলো একবার জ্বলে, তা আর নেভে না—
সমাবেশ শেষে উপস্থিত নারীরা জানান, আজকের এই আয়োজন তাঁদের কাছে শুধু একটি অনুষ্ঠান নয়, এটি তাঁদের জীবনের একটি মোড় ঘোরানো মুহূর্ত। যে নারী ভেবেছিলেন তাঁকে কেউ দেখছে না, আজ তিনি বুঝলেন রাষ্ট্র তাঁর দিকে তাকিয়ে আছে। যে নারী ভেবেছিলেন তাঁর কথা কেউ শুনছে না, আজ তিনি জানলেন সরকার তাঁর কথা শোনার জন্যই এসেছে।
বরুড়ার আকাশে আজ যে স্বপ্নের বীজ বপন হলো, তা একদিন মহীরুহে পরিণত হবে। আর সেই মহীরুহের ছায়ায় বিশ্রাম নেবে আগামী প্রজন্মের প্রতিটি নারী, যাঁরা জন্ম নেবেন এক নতুন বাংলাদেশে।