পিতার স্বপ্ন বাস্তবায়নে মন্ত্রীর হস্তক্ষেপেই যথেষ্ট

 

মোঃ আনজার শাহ

কুমিল্লার বরুড়া উপজেলার সোনাইমুড়ি গ্রামে একটি দোতলা সরকারি ভবন দাঁড়িয়ে আছে নিঃশব্দে, নিষ্প্রাণ হয়ে। দূর থেকে দেখলে মনে হয় এইমাত্র নির্মাণ শেষ হয়েছে। কিন্তু একটু কাছে গেলেই বুকে ধাক্কা লাগে। দেওয়ালজুড়ে বড় বড় ফাটল, ঝরে পড়া পলেস্তারা, মরিচা ধরা তালা, বিদ্যুৎহীন অন্ধকার করিডোর। ভেতরে নেই একটি চেয়ার, নেই একটি ওষুধ, নেই একটিও চিকিৎসা সরঞ্জাম। এটি কোনো ভাঙা বাড়ি নয়, এটি একটি সরকারি হাসপাতাল, যেখানে গত ২২ বছরে একজন রোগীও একটি দিনের জন্য চিকিৎসা পাননি।

সোনাইমুড়ি ২০ শয্যা হাসপাতালের এই করুণ পরিণতির পেছনে রয়েছে দীর্ঘ প্রশাসনিক উদাসীনতা, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা আর সদিচ্ছার চরম অভাব। রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে সাড়ে ১০ কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে এই হাসপাতালে। কাগজে-কলমে চিকিৎসকসহ ১০ জন জনবলও নিয়োগ দেওয়া আছে। তবু হাসপাতালটি আজও চালু হয়নি। পাঁচটি ইউনিয়নের প্রায় দেড় লাখ মানুষ আজও বঞ্চিত ন্যূনতম স্বাস্থ্যসেবা থেকে।

তবে এই অন্ধকারের মধ্যেও একটি আশার আলো দেখছেন এলাকাবাসী। এই হাসপাতালের স্বপ্ন একদিন বুনেছিলেন তৎকালীন সংসদ সদস্য এ কে এম আবু তাহের। সেই স্বপ্নদ্রষ্টার সুযোগ্য পুত্র আজ দেশের গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রী জাকারিয়া তাহের সুমন। স্থানীয় মানুষের বিশ্বাস, পিতার অসমাপ্ত স্বপ্ন পূরণে মন্ত্রী যদি একবার সদিচ্ছা নিয়ে এগিয়ে আসেন, তাহলে দেড় লাখ মানুষের বুক থেকে নামবে দুই দশকের পুঞ্জীভূত ভার।

দুই দফায় নির্মাণ, দুই দশকের অপেক্ষা,

জেলা স্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, ২০০২ সালে তৎকালীন বিএনপি সরকারের আমলে সাবেক সংসদ সদস্য এ কে এম আবু তাহেরের উদ্যোগে চার কোটি ১৩ লাখ টাকা বরাদ্দে হাসপাতালটির নির্মাণকাজ শুরু হয়। কাজ এগিয়ে চলে, ৭০ শতাংশ সম্পন্নও হয়। তারপর হঠাৎ কোনো কারণ ছাড়াই থেমে যায় সব। এরপর দুই দশক কেটে যায় নীরবে, নিষ্ক্রিয়ভাবে।

দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর ২০২৩ সালের ১৬ অক্টোবর পুনরায় নির্মাণকাজ শুরু হয়। বাকি কাজ শেষ করতে রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে আরও ব্যয় হয় ছয় কোটি ৪৭ লাখ ৪৪ হাজার ৪৪০ টাকা। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মেসার্স কবির ট্রেডার্স ২০২৪ সালের ৩ ডিসেম্বর ভবনটি জেলা সিভিল সার্জন কার্যালয়কে আনুষ্ঠানিকভাবে বুঝিয়ে দেয়। কিন্তু তারপরেও চালু করার কোনো উদ্যোগ নেই, উদ্বোধনের কোনো তৎপরতা নেই।

নিয়োগ আছে, হাসপাতালে চিকিৎসক নেই,

নথিপত্র ঘাঁটলে রীতিমতো অবাক হতে হয়। এই হাসপাতালে একজন আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তা, দুজন জুনিয়র কনসালট্যান্ট ও একজন মেডিকেল অফিসারসহ মোট ১০ জন জনবল নিয়োগ দেওয়া আছে। কিন্তু বাস্তবে এই হাসপাতালে কখনো কোনো চিকিৎসককে একটি দিনের জন্যও দেখা যায়নি।

নিয়োগপ্রাপ্ত আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তা কর্মরত আছেন নোয়াখালীর একটি হাসপাতালে। একজন জুনিয়র কনসালট্যান্ট রয়েছেন চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে, আরেকজন জাতীয় ক্যানসার গবেষণা ইনস্টিটিউটে। বাকি সাতজন কর্মীকে পাঠানো হয়েছে বরুড়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে। যে হাসপাতালের জন্য তাঁদের নিয়োগ দেওয়া হয়েছে, সেখানে তাঁরা কেউ নেই। অথচ রাষ্ট্র প্রতি মাসে নিয়মিতভাবে তাঁদের বেতন পরিশোধ করে যাচ্ছে।

অন্ধকারে একা পাহারাদার, বকেয়া বিদ্যুৎ বিল সোয়া চার লাখ,

হাসপাতালটির দেখাশোনার দায়িত্বে আছেন মোতালেব নামের এক নিরীহ মানুষ। তিন বছর ধরে একা এই বিশাল ভবন পাহারা দিয়ে যাচ্ছেন তিনি। আগে মাসে ২০ হাজার টাকা পেতেন, সেটুকুই ছিল তাঁর সংসারের একমাত্র ভরসা। গত আট মাস ধরে পাচ্ছেন মাত্র দুই থেকে তিন হাজার টাকা।

বিদ্যুৎ বিল বকেয়া পড়েছে চার লাখ ২০ হাজার টাকা। সংযোগ কেটে দেওয়া হয়েছে। রাতে ঘুটঘুটে অন্ধকারের মধ্যে একা পাহারা দিতে হয় কোটি টাকার এই সরকারি স্থাপনা। কষ্টমাখা কণ্ঠে তাঁর একটাই প্রশ্ন, “এই হাসপাতাল কি কোনো দিন চালু হবে?”

রাতে শিশু অসুস্থ হলে পথেই ঘটে বিপদ,

হাসপাতালটি চালু হলে বরুড়া উপজেলার আদ্রা, পয়ালগাছা, বাউকসার, লক্ষ্মীপুর ও আড্ডা ইউনিয়ন এবং পার্শ্ববর্তী কচুয়া উপজেলার আশ্রাপুর ইউনিয়নের প্রায় দেড় লাখ মানুষ নিজেদের দোরগোড়ায় স্বাস্থ্যসেবা পেতেন। কিন্তু তা না হওয়ায় রাত-বিরাতে কেউ অসুস্থ হলে কুমিল্লা বা বরুড়া সদর হাসপাতালে ছুটতে হয়। দীর্ঘ পথ, দুর্গম যাতায়াত আর সময়ের অভাবে পথেই ঘটে যায় অনেক অপূরণীয় ক্ষতি।

সোনাইমুড়ি গ্রামের প্রবীণ বাসিন্দা মাওলানা ইউসুফ নিজামী ক্ষোভের সঙ্গে বলেন, “এলাকায় কেউ অসুস্থ হলে তাকে নিয়ে কুমিল্লা বা বরুড়া সদরে দৌড়াতে হয়। সঠিক সময়ে চিকিৎসকের কাছে পৌঁছানো অনেক সময় সম্ভব হয় না। হাসপাতালটি চালু হলে এ অঞ্চলের দেড় লাখ মানুষের দীর্ঘদিনের দুঃখ ঘুচত।”

পদুয়ারপার গ্রামের গৃহিণী শারমিনের কথায় ঝরে পড়ে দুই দশকের পুঞ্জীভূত হতাশা। তিনি বলেন, “আমার বয়স যখন ছয় বছর, তখন থেকে দেখছি হাসপাতালের কাজ চলছে। এখন আমি পূর্ণবয়স্ক মানুষ, তবু হাসপাতাল চালু হলো না। রাতে বাচ্চা অসুস্থ হলে দূরের হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার পথে কী বিপদ হয়ে যাবে, সেই ভয়েই বুক কাঁপতে থাকে।”

কর্তৃপক্ষ বলছে, বরাদ্দ পেলেই চালু হবে,

বরুড়া উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. সাজিদুর রহমান জানান, হাসপাতালটি পরিপূর্ণভাবে চালু করতে আরও অন্তত ১৪ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী প্রয়োজন। আসবাবপত্র ও চিকিৎসা সরঞ্জামের বরাদ্দও এখনো আসেনি। বিষয়টি লিখিতভাবে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে বলে তিনি নিশ্চিত করেন।

কুমিল্লার সিভিল সার্জন ডা. আলী নূর মোহাম্মদ বশির আহমেদ বলেন, “হাসপাতালটি চালু করতে আমরা ২৮ জন জনবল চেয়েছি। ডাক্তারসহ ১০ জন আমাদের হাতে আছেন। বাকি জনবল এবং প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম ও ওষুধের বরাদ্দ পেলে শিগগিরই হাসপাতালটি চালু করতে পারব বলে আমরা আশাবাদী।”

পিতার স্বপ্ন পূরণের দায় এখন পুত্রের কাঁধে,

২০০২ সালে যে স্বপ্ন বুনেছিলেন এ কে এম আবু তাহের, সেই স্বপ্নের ভবন আজ দাঁড়িয়ে আছে পূর্ণ অবকাঠামো নিয়ে। শুধু প্রয়োজন একটি সিদ্ধান্ত, একটি উদ্যোগ। সেই সিদ্ধান্তটি নেওয়ার ক্ষমতা আজ রয়েছে তাঁর সুযোগ্য পুত্র গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রী জাকারিয়া তাহের সুমনের হাতে।

স্থানীয় সচেতন মহল মনে করেন, মন্ত্রী যদি সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে একবার কার্যকর হস্তক্ষেপ করেন, জনবল বরাদ্দ ও প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম নিশ্চিত করেন, তাহলে পিতার অসমাপ্ত স্বপ্ন পূর্ণতা পাবে। একই সঙ্গে দেড় লাখ মানুষের কাছে তিনি হয়ে উঠবেন শুধু একজন মন্ত্রী নন, একজন মানবিক নেতার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।

রাষ্ট্রের কাছে জনগণের একটাই প্রশ্ন,

সাড়ে ১০ কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে, ২২ বছর পেরিয়ে গেছে, চিকিৎসক নিয়োগ হয়েছে কিন্তু তাঁরা অন্যত্র কর্মরত, বকেয়া বিদ্যুৎ বিলে অন্ধকারে ডুবে আছে পুরো ভবন, দেওয়ালে ফাটল ধরেছে আর দেড় লাখ মানুষ প্রতিটি রাতে আতঙ্কে কাটাচ্ছেন কেউ অসুস্থ হলে কী হবে সেই ভয়ে।

এই চিত্র কেবল প্রশাসনিক ব্যর্থতার নয়, এটি রাষ্ট্রের নাগরিকের প্রতি দায়িত্বহীনতার এক জীবন্ত দলিল। রাষ্ট্র যদি সাড়ে ১০ কোটি টাকা ব্যয় করতে পারে, তাহলে সেই হাসপাতাল চালু করার সদিচ্ছাটুকুও রাষ্ট্রকেই দেখাতে হবে। এটি কোনো করুণার আবেদন নয়, এটি দেড় লাখ মানুষের সাংবিধানিক অধিকারের দাবি। আর সেই দাবি পূরণের সবচেয়ে সহজ পথটি এখন মন্ত্রী জাকারিয়া তাহের সুমনের হাতেই রয়েছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *