স্টাফ রিপোর্টার:
গাজীপুর সদর সাব-রেজিস্ট্রি অফিসকে ঘিরে দীর্ঘদিন ধরে এক অদৃশ্য প্রভাবশালী চক্রের অভিযোগ সামনে আসছে। স্থানীয় দলিল লেখক, সেবাগ্রহীতা এবং একাধিক সূত্রের দাবি অনুযায়ী, সরকারি কোনো পদে না থেকেও সোহেল রানা নামের এক ব্যক্তি পুরো অফিসের কার্যক্রমে অস্বাভাবিক প্রভাব বিস্তার করছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। বিষয়টি নিয়ে প্রশাসনিক মহলে আলোচনা থাকলেও এখনো পর্যন্ত কার্যকর কোনো দৃশ্যমান ব্যবস্থা না নেওয়ায় প্রশ্ন আরও ঘনীভূত হচ্ছে।
স্থানীয়দের ভাষ্য, গাজীপুর সদর সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে কোন দলিল আগে সম্পন্ন হবে, কার ফাইল দ্রুত নিষ্পত্তি হবে কিংবা কার কাজ ইচ্ছাকৃতভাবে বিলম্বিত হবে—এসব বিষয়েও পরোক্ষভাবে প্রভাব খাটানোর অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। ফলে সাধারণ মানুষকে হয়রানি ও অতিরিক্ত অর্থ ব্যয়ের শিকার হতে হচ্ছে বলেও অনেকে দাবি করছেন।
সূত্র জানায়, গাজীপুর সিটি কর্পোরেশন–এর ২৬ নম্বর ওয়ার্ডের মারিয়ালী এলাকায় সোহেল রানার বসবাস। ওই এলাকার কাছেই সাব-রেজিস্ট্রি কমপ্লেক্স ভবন হওয়ায় তার সামাজিক ও প্রশাসনিক প্রভাব আরও বিস্তৃত হয়েছে বলে স্থানীয়দের দাবি। কেউ কেউ বলছেন, রাজনৈতিক পরিচয়ের আড়ালে তিনি দীর্ঘদিন ধরে একটি প্রভাবশালী নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছেন, যা অফিসের কিছু অভ্যন্তরীণ কর্মকাণ্ডে প্রভাব ফেলছে।
অভিযোগকারীদের দাবি, তিনি নিজেকে বিএনপির স্থানীয় কর্মী হিসেবে পরিচয় দেন এবং সেই পরিচয়ের আড়ালে এলাকায় প্রভাব বিস্তার করেন। একসময় আর্থিকভাবে দুর্বল অবস্থানে থাকলেও বর্তমানে তার জীবনযাত্রায় উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন এসেছে—এমন দাবি করে অনেকে বিলাসবহুল জীবনযাপন ও সম্পদের বৃদ্ধির কথাও উল্লেখ করছেন। তবে এসব বিষয়ে স্বাধীনভাবে যাচাইযোগ্য কোনো সরকারি নথি এখনো প্রকাশ্যে আসেনি।
আরও অভিযোগ রয়েছে, সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে কর্মরত কিছু দলিল লেখক ও দালালচক্রের সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ রয়েছে। তাদের মাধ্যমেই সেবাগ্রহীতাদের কাছ থেকে অতিরিক্ত অর্থ আদায় বা কাজ দ্রুত করিয়ে দেওয়ার বিনিময়ে অবৈধ সুবিধা নেওয়ার অভিযোগ তুলেছেন একাধিক ভুক্তভোগী। তবে ভয়ের কারণে অনেকেই প্রকাশ্যে অভিযোগ করতে সাহস পাচ্ছেন না বলেও জানা যায়।
স্থানীয় সূত্রগুলোর দাবি, একাধিক সময় দুর্নীতি দমন সংক্রান্ত অভিযান চললেও তার প্রভাব বা কার্যক্রম পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। বরং অফিসের অভ্যন্তরীণ কিছু অসাধু কর্মচারীর সহযোগিতায় এই প্রভাব আরও টিকে আছে বলে অভিযোগ উঠেছে। তবে এসব অভিযোগ এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে প্রমাণিত হয়নি।
এদিকে সরকারি একটি গুরুত্বপূর্ণ দপ্তরে বহিরাগত কোনো ব্যক্তির এ ধরনের প্রভাব বিস্তার নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন স্থানীয় সচেতন মহল। তাদের মতে, দুর্নীতি দমন কমিশন এবং নিবন্ধন অধিদপ্তর–এর সমন্বিত তদন্ত ছাড়া এ ধরনের অভিযোগের সত্যতা নিরূপণ করা সম্ভব নয়। একই সঙ্গে তারা দ্রুত প্রশাসনিক নজরদারি বাড়ানোর দাবি জানিয়েছেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের মতো স্পর্শকাতর সরকারি প্রতিষ্ঠানে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত না হলে দালালচক্র ও অপ্রাতিষ্ঠানিক প্রভাব আরও গভীরভাবে শিকড় গেড়ে বসতে পারে। এতে সাধারণ নাগরিকরা সেবা থেকে বঞ্চিত হওয়ার পাশাপাশি দুর্নীতির চাপে অতিষ্ঠ হয়ে পড়েন।
অন্যদিকে স্থানীয়দের একটি বড় অংশের প্রশ্ন—সরকারি নিয়োগবিহীন একজন ব্যক্তি কীভাবে এতটা প্রভাব বিস্তার করতে পারেন? এর পেছনে কোনো শক্তিশালী নেটওয়ার্ক বা অভ্যন্তরীণ সহযোগিতা রয়েছে কি না, সেটিও এখন তদন্তের দাবি তুলেছে তারা।
সব মিলিয়ে গাজীপুর সদর সাব-রেজিস্ট্রি অফিস ঘিরে ওঠা এই অভিযোগগুলো প্রশাসনিকভাবে গুরুত্ব দিয়ে খতিয়ে দেখার দাবি জোরালো হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ দ্রুত পদক্ষেপ নিলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসবে বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।