দেশে কি আইনের শাসন নেই? হাইকোর্টের রায়কে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে বরিশাল কালেক্টরেট স্কুল অ্যান্ড কলেজ পরেশ সাগর মাঠ প্রাঙ্গণে বাণিজ্য মেলা উদ্বোধন

মোঃ ইসলাম উদ্দিন তালুকদার:

হাইকোর্ট বিভাগের সুস্পষ্ট নিষেধাজ্ঞার পরও বরিশাল কালেক্টরেট স্কুল অ্যান্ড কলেজ পরেশ সাগর প্রাঙ্গণে পুনরায় বাণিজ্য মেলার কার্যক্রম চালুর অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে তীব্র সমালোচনা, ক্ষোভ ও উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছে। ধর্মপ্রাণ মানুষ, শিক্ষাবিদ, আইনজীবী, মানবাধিকারকর্মী ও সচেতন নাগরিকদের প্রশ্ন—দেশে কি আইনের শাসন কার্যকর আছে, নাকি আদালতের নির্দেশনাও এখন উপেক্ষিত হচ্ছে?

জানা গেছে, বরিশাল কালেক্টরেট স্কুল অ্যান্ড কলেজ প্রাঙ্গণে বাণিজ্য মেলা আয়োজনের বিরুদ্ধে দায়ের করা জনস্বার্থমূলক রিটের শুনানি শেষে গত ১৮ মে হাইকোর্ট বিভাগ রুল জারি করে নির্দেশ দেন, রুল নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত ওই স্থানে কোনো ধরনের বাণিজ্য মেলা আয়োজন করা যাবে না।

বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগের বিচারপতি ফাহমিদা কাদের ও বিচারপতি মো. আশিফ হাসানের সমন্বয়ে গঠিত বেঞ্চ রিট পিটিশন নং-৬২৫৯/২০২৬ এর শুনানি শেষে এ আদেশ দেন। আদালত মেলা পরিপত্র-২০২৪ এর ধারা ৫(ছ) উল্লেখ করে পর্যবেক্ষণ দেন যে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরে এ ধরনের বাণিজ্যিক আয়োজন বিধিবহির্ভূত।

রিটে উল্লেখ করা হয়, মেলার কারণে পাঁচটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের খেলাধুলা ও স্বাভাবিক শিক্ষা কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। অতিরিক্ত জনসমাগম, শব্দদূষণ, যানজট ও অনিরাপদ পরিবেশ শিক্ষার্থীদের জন্য ঝুঁকি তৈরি করছে।

তবে অভিযোগ উঠেছে, আদালতের নির্দেশনার পরও পুনরায় মেলার স্টল নির্মাণ, আলোকসজ্জা, মাইকিং ও বাণিজ্যিক কার্যক্রম শুরু করা হয়েছে। স্থানীয় সূত্র জানায়, ২৬ মে সন্ধ্যায় বরিশাল কালেক্টরেট স্কুল অ্যান্ড কলেজ পরেশ সাগর প্রাঙ্গণে বাণিজ্য মেলার উদ্বোধন করা হয়।

এ সময় অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনার মোহাম্মদ আহসান হাবিবের একটি ভিডিও বার্তা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। ভিডিওতে তাকে বলতে শোনা যায়, জেলা প্রশাসক ও পুলিশ কমিশনার অনুপস্থিত থাকায় তাকে মেলা উদ্বোধনের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।

ঘটনাটি প্রকাশ্যে আসার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, অনলাইন প্ল্যাটফর্ম ও বিভিন্ন মহলে সমালোচনার ঝড় ওঠে। অনেকেই প্রশ্ন তুলেছেন, হাইকোর্টের সুস্পষ্ট নির্দেশনার পর কীভাবে প্রশাসনের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা মেলা উদ্বোধনে অংশ নিলেন।

এদিকে পরেশ সাগর প্রাঙ্গণে মেলা আয়োজন নিয়েও ধর্মপ্রাণ মানুষের মধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। স্থানীয়দের দাবি, দীর্ঘ প্রায় ২৬ বছর ধরে এ মাঠে মরহুম মাওলানা দেলোয়ার হোসেন সাঈদী পবিত্র কুরআনের তাফসির মাহফিল পরিচালনা করেছেন। ফলে স্থানটি বরিশালের ধর্মীয় ইতিহাস, ইসলামী ঐতিহ্য ও লাখো মানুষের আবেগের অংশ হিসেবে পরিচিত।

স্থানীয় প্রবীণদের ভাষ্য, একসময় এই প্রাঙ্গণ কুরআনের তাফসির, ইসলামী আলোচনা ও দ্বীনি পরিবেশে মুখর থাকত। সেখানে উচ্চ শব্দ, বিনোদনমূলক আয়োজন ও বাণিজ্যিক মেলা পরিচালনা ধর্মপ্রাণ মানুষের অনুভূতিতে আঘাত হেনেছে।

রিটকারী ও মানবাধিকারকর্মী মো. রনি শিকদার বলেন, “হাইকোর্টের নির্দেশ অমান্য করা আদালত অবমাননার শামিল। আদালতের আদেশ বাস্তবায়ন করা সংশ্লিষ্ট সকলের সাংবিধানিক দায়িত্ব। আদালতের নির্দেশ উপেক্ষা করে পুনরায় মেলা পরিচালনার ঘটনায় আমরা উচ্চ আদালতে আদালত অবমাননার আবেদন করবো।”

এ বিষয়ে বরিশাল মেট্রোপলিটন ডিসি সাউথ ও প্রশাসনের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বললে তারা জানান, হাইকোর্টের আদেশ তাদের কাছে পৌঁছেছে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে মেলা কর্তৃপক্ষকে উদ্বোধন কার্যক্রম বন্ধসহ আদালতের নির্দেশনা মেনে চলতে বলা হয়েছে। যদি মেলা কর্তৃপক্ষ প্রশাসনের নির্দেশনা অমান্য করে, তাহলে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করে মেলা বন্ধ করে দেওয়া হবে।

প্রশাসনের পক্ষ থেকে আরও বলা হয়, “আমরা আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল এবং আদালতের নির্দেশনা বাস্তবায়নে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশের সংবিধানের ১০৮ অনুচ্ছেদ এবং “Contempt of Courts Act, 2013” অনুযায়ী আদালতের আদেশ ইচ্ছাকৃতভাবে অমান্য করা শাস্তিযোগ্য অপরাধ। অভিযোগ প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে জরিমানা, কারাদণ্ড অথবা উভয় দণ্ডের বিধান রয়েছে।

সচেতন নাগরিকদের দাবি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও ঐতিহাসিক ধর্মীয় স্থানের মর্যাদা রক্ষায় প্রশাসনের আরও দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে আদালতের নির্দেশ দ্রুত বাস্তবায়নের দাবিও জানিয়েছেন তারা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *