মোঃ সুমন প্রতিনিধি: Smtv Media রাজশাহী।
রাজশাহীর বাঘা, নাটোরের লালপুর, পাবনার ঈশ্বরদী ও কুষ্টিয়ার দৌলতপুর পদ্মা নদীঘেরা এই চার উপজেলার সীমান্তবর্তী চরাঞ্চল এখন অপরাধী ও সশস্ত্র সন্ত্রাসী গ্রুপগুলোর অভয়ারণ্যে পরিণত হয়েছে। অবৈধ বালুমহালের নিয়ন্ত্রণ, নদীর বুকে চাঁদাবাজি এবং চরের শত শত বিঘা ফসলি জমি দখলকে কেন্দ্র করে গত কয়েক মাসে এই অঞ্চলে একের পর এক রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ ও খুনের ঘটনা ঘটেছে।
সর্বশেষ গত মঙ্গলবার (৯ জুন) বিকেলে নাটোরের লালপুর উপজেলার চরজাজিরা এলাকায় একটি ভাসমান স্পিডবোট থেকে আজিজুল হক ঝড়ু (৩৫) নামে এক যুবকের গুলিবিদ্ধ মরদেহ উদ্ধার করেছে পুলিশ। তিনি কুষ্টিয়ার দৌলতপুর ও রাজশাহীর বাঘা সীমান্তের ‘হবির চর’ এলাকায় কাকন গ্রুপ ও বেলাল গ্রুপের মধ্যে হওয়া তীব্র গোলাগুলির ঘটনায় নিহত হন।
স্থানীয়দের দাবি, সন্ত্রাসীরা আধুনিক ড্রোন ক্যামেরা ব্যবহার করে মানুষ ট্র্যাক করে এই নির্বিচার গুলিবর্ষণ চালিয়েছে।
সূত্রে জানা যায়, গত কয়েক মাসের প্রধান সংঘাত ও রক্তক্ষয়ী ঘটনাবলির মধ্যে উল্লেখযোগ্য ঘটনা গুলো হলো, বাঘার চরে ডাবল মার্ডার (অক্টোবর): রাজশাহীর বাঘা উপজেলার খানপুর চরের প্রায় ৫০০ বিঘা জমির ফসল ও খড় দখলকে কেন্দ্র করে কুষ্টিয়ার দৌলতপুরের ‘কাকন বাহিনী’ ও বাঘার ‘মনতাজ মণ্ডল গ্রুপ’-এর মধ্যে প্রকাশ্যে যুদ্ধ বেঁধে যায়। স্পিডবোটে করে এসে অস্ত্রের মহড়া দিয়ে কাকন বাহিনীর চালানো এলোপাতাড়ি গুলিতে আমান মণ্ডল ও নাজমুল হক নামের দুই ব্যক্তি নিহত হন এবং বেশ কয়েকজন গুরুতর আহত হন। এই ঘটনায় দৌলতপুর থানায় ২৩ জনের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা দায়ের করা হয়।
ঈশ্বরদীর সাড়াঘাটে ফিল্মি স্টাইলে হামলা (জুন): পাবনার ঈশ্বরদী উপজেলার সাড়া ইউনিয়নের ইসলামপাড়া ও সাড়াঘাট বালুমহাল দখল করতে লালপুরের একটি সশস্ত্র সন্ত্রাসী বাহিনী ফিল্মি স্টাইলে হানা দেয়। স্পিডবোট থেকে চরে থাকা শ্রমিক ও সাধারণ মানুষের ওপর এলোপাতাড়ি গুলি চালানো হয়। এতে মাঠে গরুর ঘাস কাটতে যাওয়া সোহান মোল্লা (২৮) নামের এক সাধারণ কৃষক গুলিবিদ্ধ হন। বৈধ ইজারাদারদের অভিযোগ, বারবার এমন হামলা চালিয়ে ঘাটগুলো জোরপূর্বক লিখে নেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে।
হবির চর ও আলাইপুর চরে ভারী অস্ত্রের যুদ্ধ (সাম্প্রতিক): কুষ্টিয়ার দৌলতপুরের হবির চর থেকে শুরু করে রাজশাহীর বাঘার আলাইপুর চর পর্যন্ত বিস্তীর্ণ নদীপথে একাধিক সন্ত্রাসী গ্রুপ প্রায়শই মুখোমুখি সংঘর্ষে জড়াচ্ছে। স্থানীয় প্রশাসন ও পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের মতে, এই দুর্গম চরাঞ্চলগুলো ভারতের সীমান্তঘেঁষা হওয়ায় অপরাধীরা খুব সহজেই নদীপথে অবৈধ অত্যাধুনিক আগ্নেয়াস্ত্র (এমনকি একে-৪৭ সদৃশ ভারী অস্ত্র) নিয়ে এসে সন্ত্রাসী কার্যক্রম পরিচালনা করছে।
স্থানীয় সূত্রের দেওয়া তথ্যানুযায়ী, এই চার উপজেলার চরাঞ্চল শাসন করছে অন্তত ১১টি সক্রিয় সন্ত্রাসী বাহিনী। এদের মধ্যে কাকন বাহিনী, মণ্ডল বাহিনী, বেলাল বাহিনী, টুকু বাহিনী, সাঈদ বাহিনী, লালচাঁদ বাহিনী, বাহান্ন বাহিনী ও সুখচাঁদ-নাহারুল বাহিনী অন্যতম।
এসব বাহিনীর প্রকাশ্য অস্ত্রের মহড়া ও স্পিডবোট নিয়ে নদী দাপিয়ে বেড়ানোর কারণে চরের সাধারণ মানুষের জীবন এখন বিপন্ন। কৃষকেরা জমিতে চাষাবাদ করতে পারছেন না এবং বালুমহালের সাধারণ শ্রমিকেরা সবসময় প্রাণভয়ে দিন কাটাচ্ছেন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ভীত-সন্ত্রস্ত চরবাসীরা জানান, দিনে কাজ করতে ভয়, রাতে ঘুমাতে ভয়। কখন কোন দিক থেকে স্পিডবোট নিয়ে এসে গুলি শুরু করবে, তার কোনো নিশ্চয়তা নেই। চরের বিস্তীর্ণ এলাকায় আইনশৃঙ্খলার কোনো স্থায়ী ক্যাম্প না থাকায় আমরা পুরোপুরি অসহায়।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী জানায়, চরাঞ্চলে অপরাধ দমনে ইতিপূর্বে ‘অপারেশন ফার্স্ট লাইট’ এর মতো বিশেষ অভিযান চালিয়ে দুই শতাধিক অপরাধীকে গ্রেপ্তার ও বিপুল পরিমাণ অস্ত্র উদ্ধার করা হয়েছিল। তবে ভৌগোলিক দুর্গমতার সুযোগ নিয়ে জামিনে বের হওয়া অপরাধীরা আবারো সংগঠিত হচ্ছে।চরাঞ্চলে সশস্ত্র গ্রুপগুলোর আধিপত্য ও অবৈধ অস্ত্র ব্যবহারের বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে দেখা হচ্ছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে চার জেলার সীমান্তবর্তী এই জোনে চিরুনি অভিযান ও একটি স্থায়ী ‘চর নিরাপত্তা জোন’ বা নৌ-পুলিশের টহল জোরদার করার বিষয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সাথে আলোচনা চলছে।