মোঃআনজার শাহ
ঢাকা শহরের বুকে যদি কোনো জায়গা থাকে যেখানে দাঁড়িয়ে একটু শ্বাস নেওয়া যায়, পাখির ডাক শোনা যায়, জলের শীতল স্পর্শ অনুভব করা যায় তবে সেটি হলো গুলশান-বাড়িধারা লেক। কিন্তু সেই লেক আজ বিপন্ন। দূষণের কালো ছায়া ধীরে ধীরে গ্রাস করছে এই নগর-প্রকৃতির শেষ আশ্রয়টুকু। সেই বিপদ থেকে লেককে রক্ষা করতে আজ সরকার সরাসরি মাঠে নামল।
গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রী জাকারিয়া তাহের এবং প্রতিমন্ত্রী আহম্মদ সোহেল মনজুরের নেতৃত্বে আজ অনুষ্ঠিত হলো গুলশান-বাড়িধারা লেকের সার্বিক উন্নয়ন, সৌন্দর্যবর্ধন, পরিবেশ সংরক্ষণ এবং নাগরিক সুবিধা বৃদ্ধিবিষয়ক এক উচ্চপর্যায়ের গুরুত্বপূর্ণ সভা। এই সভায় লেককে ঘিরে যে পরিকল্পনা গৃহীত হয়েছে, তা কেবল একটি জলাশয় রক্ষার পদক্ষেপ নয় এটি ঢাকাকে বাঁচানোর একটি ঐতিহাসিক উদ্যোগ।
মন্ত্রীর কণ্ঠে দৃঢ়তা ও প্রতিশ্রুতি,সভায় গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রী জাকারিয়া তাহের অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় বলেন, গুলশান-বাড়িধারা লেক রাজধানীর পরিবেশ রক্ষার এক অপরিহার্য সম্পদ। এই লেককে দূষণের হাত থেকে রক্ষা করা এখন আর শুধু পরিবেশের প্রশ্ন নয়, এটি ঢাকার কোটি মানুষের বেঁচে থাকার প্রশ্ন। সরকার এই লেকের সুরক্ষা ও উন্নয়নে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে বদ্ধপরিকর। যারা এই লেককে দূষিত করছে, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে এবং উন্নয়নকাজ অবিলম্বে শুরু করা হবে।
প্রতিমন্ত্রী আহম্মদ সোহেল মনজুর বলেন, একটি সুন্দর ও বাসযোগ্য ঢাকা গড়তে হলে এই শহরের জলাশয়গুলো রক্ষা করতেই হবে। গুলশান-বাড়িধারা লেক শুধু একটি জলাশয় নয়, এটি নগরবাসীর নিঃশ্বাস নেওয়ার জায়গা, শিশুদের প্রকৃতির সঙ্গে পরিচিত হওয়ার স্থান, বয়স্কদের একটু বিশ্রামের আশ্রয়। নাগরিক সমাজ ও সংশ্লিষ্ট সকলকে সঙ্গে নিয়ে এই লেককে আমরা আন্তর্জাতিক মানে নিয়ে যেতে চাই।
সভায় যে পরিকল্পনা গৃহীত হলো,পানি দূষণ রোধ,লেকে শিল্পবর্জ্য, গৃহস্থালি আবর্জনা ও অপরিশোধিত পয়ঃনিষ্কাশন মিশে পানি আজ মারাত্মকভাবে দূষিত হয়ে পড়েছে। এই দূষণ বন্ধে কঠোর মনিটরিং ব্যবস্থা চালু করা এবং দোষীদের বিরুদ্ধে দ্রুত আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে।
পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম জোরদার,লেক ও তার আশপাশের এলাকা নিয়মিত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখতে বিশেষ পরিচ্ছন্নতা দল গঠন করা হবে। নিয়মিত অভিযান পরিচালনার মাধ্যমে লেককে সর্বদা দৃষ্টিনন্দন রাখার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
নিরাপত্তা ব্যবস্থা উন্নয়ন,লেক এলাকায় নাগরিকদের নিরাপদ ও নির্বিঘ্নে চলাচল নিশ্চিত করতে পর্যাপ্ত আলোকসজ্জা, আধুনিক সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন এবং সার্বক্ষণিক নিরাপত্তা প্রহরার ব্যবস্থা করার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছে।
হাঁটার পথ ও বিনোদন সুবিধা বৃদ্ধি,লেকের চারপাশে সুপরিসর ও সুশোভিত হাঁটার পথ নির্মাণ, পর্যাপ্ত বসার ব্যবস্থা, শিশুদের জন্য আনন্দময় খেলার জায়গা এবং নগরবাসীর মানসিক প্রশান্তির জন্য বিনোদনের সুযোগ বাড়ানোর বিস্তারিত পরিকল্পনা তুলে ধরা হয়েছে।
সবুজায়ন সম্প্রসারণ,লেকের পাড়জুড়ে দেশীয় প্রজাতির গাছপালা রোপণ, সবুজ বেষ্টনী গড়ে তোলা এবং জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণের মাধ্যমে পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষার একটি সুনির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনা সভায় উপস্থাপন করা হয়।
দীর্ঘমেয়াদি রক্ষণাবেক্ষণ পরিকল্পনা,লেকের উন্নয়নকে টেকসই ও স্থায়ী করতে একটি সুনির্দিষ্ট দীর্ঘমেয়াদি রক্ষণাবেক্ষণ কাঠামো প্রণয়ন এবং বার্ষিক বরাদ্দ নিশ্চিত করার প্রস্তাব সর্বসম্মতিক্রমে গৃহীত হয়েছে।
শুধু একটি লেক নয়, ঢাকার প্রাণ,গুলশান-বাড়িধারা লেক কেবল একটি জলাশয় নয়। এটি রাজধানী ঢাকার পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষার অন্যতম প্রধান স্তম্ভ। বিস্তৃত এই লেক নগরীর জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে প্রতিনিয়ত অপরিহার্য ভূমিকা রেখে চলেছে। কংক্রিটের ঘেরাটোপে আটকে পড়া এই ব্যস্ত নগরীতে লক্ষাধিক মানুষের প্রাণ জুড়ানোর শেষ উন্মুক্ত স্থান হিসেবে এর গুরুত্ব অতুলনীয়। পরিবেশ বিশেষজ্ঞরা বারবার সতর্ক করে বলছেন, এই লেক সুরক্ষিত না থাকলে ঢাকার তাপমাত্রা বৃদ্ধি, বায়ুদূষণ এবং জলাবদ্ধতার সংকট ভবিষ্যতে আরও ভয়াবহ রূপ নেবে।
একটি স্বপ্নের শুরু,সভায় মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রী উভয়েই একটি কথা বারবার বলেছেন এই লেক রক্ষা করা মানে ঢাকাকে রক্ষা করা, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি সুন্দর শহর রেখে যাওয়া। তাঁরা সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি নাগরিক সমাজ, স্থানীয় বাসিন্দা, ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠান এবং পরিবেশ সংগঠনগুলোর সক্রিয় ও আন্তরিক অংশগ্রহণের আহ্বান জানান।
সুন্দর, বাসযোগ্য ও পরিবেশবান্ধব ঢাকা গড়ার যে স্বপ্ন বহু বছর ধরে মানুষ দেখে আসছে, আজকের এই সভা সেই স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার পথে একটি নিঃসন্দেহে ঐতিহাসিক মাইলফলক।