বরুড়ায় চিকিৎসকশূন্য ইউনিয়ন: তথ্য অধিকার আইনকে ‘থোড়াই কেয়ার’, ৩০ দিনেও মেলেনি জবাব; চরম ভোগান্তিতে সাধারণ মানুষ

 

মোঃআনজার শাহ

 

তথ্য অধিকার আইনের মতো একটি সাংবিধানিক অধিকারকেও যেন তোয়াক্কা করছে না কুমিল্লার বরুড়া উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা দপ্তর। উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নে কর্মরত চিকিৎসকদের তালিকা জানতে আইন মেনে আবেদন করা হলেও নির্ধারিত ৩০ দিন পার হয়ে গেলেও কোনো জবাব দেয়নি কর্তৃপক্ষ। অনুসন্ধানে দেখা যায়, উপজেলার একাধিক ইউনিয়ন সাব-সেন্টারে দীর্ঘদিন ধরে চিকিৎসক না থাকায় সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন সাধারণ মানুষ।

প্রথমে অস্বীকার, পরে চাপের মুখে সত্য স্বীকার,
বিষয়টি নিয়ে জানতে চাইলে উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডাঃ মোহাম্মদ সাজেদুর রহমান প্রথমে দাবি করেন, তথ্য অধিকার আইনের আবেদনের নথি তার অফিসে পৌঁছায়নি, তাই কোনো ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হয়নি। জনবল সংকটের প্রসঙ্গ তুলে তিনি জানান, গালিমপুর ইউনিয়ন সাব-সেন্টারে যে মেডিকেল অফিসার দায়িত্বে ছিলেন, গত ২২ জুন তিনি ঢাকা মেডিকেল কলেজে বদলি হয়ে গেছেন, ফলে ওই সাব-সেন্টার চিকিৎসকশূন্য হয়ে পড়েছে।
তিনি আরও জানান, উপজেলার পাঁচটি সাব-সেন্টারের মধ্যে তিনটিতে কোনো স্থাপনাই নেই, আর বাকি দুটিতে স্থাপনা থাকলেও জনবল সংকট প্রকট। তার ভাষ্য অনুযায়ী, উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে প্রতিদিন সাত থেকে আট শতাধিক, কখনো কখনো হাজার পর্যন্ত রোগী আসে, কিন্তু সেখানে কর্মরত আছেন মাত্র দুজন মেডিকেল অফিসার ও চারজন কনসালট্যান্ট। জনবল ঘাটতি পোষাতে সাব-সেন্টার ও বরুড়া ২০ শয্যা হাসপাতাল থেকে চিকিৎসক তুলে এনে উপজেলা কমপ্লেক্সে সংযুক্ত করতে হচ্ছে বলেও স্বীকার করেন তিনি।
তবে প্রতিবেদকের অনুসন্ধানের চাপে অবশেষে আবেদনটির হদিস মেলে দপ্তরের ভেতরেই। পরে ডাঃ সাজেদুর রহমান স্বীকার করেন, আবেদনটি কার কাছে জমা পড়েছিল তা তিনি চিহ্নিত করেছেন এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা কেন তা তার দপ্তরে পৌঁছে দেননি বা অবগত করেননি,এই গাফিলতির দায়ে তাকে শোকজ-সহ প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

জনগণের নীরব ভোগান্তি,
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, ইউনিয়ন পর্যায়ে দীর্ঘদিন ধরে চিকিৎসক না থাকায় সামান্য চিকিৎসার জন্যও ছুটতে হয় উপজেলা সদরে, যেখানে আগে থেকেই রোগীর চাপ সামলাতে হিমশিম খাচ্ছে কর্তৃপক্ষ। তথ্য অধিকার আইনে আবেদন করেও সঠিক তথ্য না পাওয়ায় বাস্তব পরিস্থিতি যাচাইয়ের সুযোগও সংকুচিত হয়ে পড়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

জবাবদিহিতা এখন সময়ের দাবি
একটি সাংবিধানিক অধিকার হিসেবে স্বীকৃত তথ্য অধিকার আইনের আবেদন কীভাবে দপ্তরের ভেতরেই দীর্ঘদিন অনিষ্পন্ন থেকে যায়— এই প্রশ্নের সদুত্তর জরুরি। শুধু একটি শোকজ নোটিশেই বিষয়টি সীমাবদ্ধ না রেখে, ইউনিয়ন পর্যায়ে দীর্ঘস্থায়ী জনবল সংকট নিরসনে সংশ্লিষ্ট উচ্চতর কর্তৃপক্ষের সরাসরি হস্তক্ষেপ এখন সময়ের দাবি।

উল্লেখ্য, বরুড়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ও বিভিন্ন ইউনিয়ন সাব-সেন্টারে কর্মরত চিকিৎসকদের তালিকা পর্যালোচনা করে দেখা যায়।

উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, বরুড়ায় উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা পদে দায়িত্বে রয়েছেন ডাঃ মোহাম্মদ সাজেদুর রহমান। জুনিয়র কনসালটেন্ট (অ্যানেসথেসিয়া) পদে আছেন ডাঃ মোঃ জুলকার নাঈন মজুমদার এবং জুনিয়র কনসালটেন্ট (মেডিসিন) পদে আছেন ডাঃ মোহাম্মদ শরীফুল ইসলাম। তবে জুনিয়র কনসালটেন্ট (সার্জারি) পদটি শূন্য রয়েছে। জুনিয়র কনসালটেন্ট (গাইনী) পদে আছেন ডাঃ শাহনাজ বেগম এবং সহকারী ডেন্টাল সার্জন পদে আছেন ডাঃ দিলরুম জান্নাত।

আবাসিক মেডিকেল অফিসার পদে ডাঃ মোহাম্মদ জাকির হোসেন থাকলেও তিনি প্রেষণে জেনারেল হাসপাতাল, কুমিল্লায় কর্মরত। মেডিকেল অফিসার (আয়ুর্বেদী পদের বিপরীতে) দায়িত্বে আছেন ডাঃ মোঃ মনির হোসেন এবং মেডিকেল অফিসার পদে আছেন ডাঃ মোহাম্মদ মাহমুদ হোসেন চৌধুরী। জরুরি বিভাগে ইমার্জেন্সি মেডিকেল অফিসার হিসেবে কর্মরত আছেন ডাঃ মুহাম্মদ নাহিদ হোসাইন ও ডাঃ ফারুক হোসেন।

এছাড়া সহকারী সার্জন পদে রয়েছেন ডাঃ বায়জিদ হাসান পারভেজ, ডাঃ শামীমা আক্তার, ডাঃ মোঃ আসিফ ইমতিয়াজ, ডাঃ মোঃ মাসুম বিল্লাহ ও ডাঃ সানজিদা মিলা। সহকারী সার্জন/মেডিকেল অফিসার (মেডিসিন) পদে আছেন ডাঃ প্রণয় দত্ত দীপ্ত এবং মেডিকেল অফিসার (আয়ুর্বেদী) পদে আছেন ডাঃ মোঃ ওমর ফারুক সরকার।

২০ শয্যা বিশিষ্ট হাসপাতাল, বরুড়ায় জুনিয়র কনসালটেন্ট (মেডিসিন) পদে আছেন ডাঃ শারমিন আক্তার, যিনি বর্তমানে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজে কর্মরত। জুনিয়র কনসালটেন্ট (অ্যানেসথেসিয়া) ও জুনিয়র কনসালটেন্ট (সার্জারি) পদ দুটিই শূন্য রয়েছে। জুনিয়র কনসালটেন্ট (গাইনী) পদে আছেন ডাঃ গোপা কুন্ডু, যিনি ঢাকা ক্যান্সার গবেষণা ইনস্টিটিউটে কর্মরত। আবাসিক মেডিকেল অফিসার পদে আছেন ডাঃ ফারহানা মাহফুজ এবং মেডিকেল অফিসার পদে আছেন ডাঃ শাহিনুর আক্তার।

ইউনিয়ন পর্যায়ে আগানগর সাব-সেন্টারে মেডিকেল অফিসার পদে ডাঃ ইয়াছমিন আক্তার থাকলেও তিনি প্রেষণে কর্মরত। ঝলম ইউনিয়ন সাব-সেন্টারে মেডিকেল অফিসার হিসেবে আছেন ডাঃ মোহাম্মদ আমিনুল ইসলাম। কিন্তু গালিমপুর ইউনিয়ন সাব-সেন্টারে কোনো চিকিৎসকের তথ্য উল্লেখ নেই, যা এলাকাবাসীর দীর্ঘদিনের অভিযোগের সত্যতা প্রমাণ করে।

শিলমুড়ী ইউনিয়ন সাব-সেন্টারে মেডিকেল অফিসার পদে আছেন ডাঃ সুপ্রিয়া সরকার এবং পয়ালগাছা ইউনিয়ন সাব-সেন্টারে মেডিকেল অফিসার পদে আছেন ডাঃ সবুজ চন্দ্র সরকার, যিনিও প্রেষণে কর্মরত। ভবানীপুর H & FWC-তে সহকারী সার্জন পদে আছেন ডাঃ ভাস্কর কিশোর মহলানবিশ। খোশবাস উত্তর ও দক্ষিণ ইউনিয়নে সহকারী সার্জন পদে ডাঃ ইসরাত জাহান থাকলেও তিনি প্রেষণে ঢাকায় কর্মরত।

উল্লেখযোগ্যভাবে, ঝলম উত্তর ইউনিয়নে চিকিৎসকের পদ সম্পূর্ণ শূন্য রয়েছে। শিলমুড়ী দক্ষিণ ইউনিয়নে সহকারী সার্জন পদে আছেন ডাঃ মোহাম্মদ আলী রেজা। কিন্তু দেওড়া উত্তর ও দেওড়া দক্ষিণ ইউনিয়নেও কোনো চিকিৎসকের তথ্য নেই। আড্ডা ইউনিয়নে সহকারী সার্জন পদে আছেন ডাঃ রথীন কুমার দত্ত, যিনি প্রেষণে জেনারেল হাসপাতাল কুমিল্লায় কর্মরত। আদ্রা ইউনিয়নে সহকারী সার্জন পদে আছেন ডাঃ সীমা মজুমদার।

এই তালিকা বিশ্লেষণে স্পষ্ট হয়ে ওঠে, কাগজে-কলমে পদ পূরণ থাকলেও বাস্তবে অনেক চিকিৎসক প্রেষণে অন্যত্র কর্মরত থাকায় এবং একাধিক ইউনিয়নে পদ শূন্য থাকায় প্রকৃত স্বাস্থ্যসেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন ইউনিয়নবাসী।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *