মোহাম্মদ হোসেন হ্যাপী:
নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লায় আদালত প্রাঙ্গণের পার্কিং এলাকা থেকে চুরি হওয়া একটি প্রাইভেটকার উদ্ধারের মধ্য দিয়ে একটি সক্রিয় আন্তঃজেলা গাড়ি চোরচক্রের রহস্য উদ্ঘাটন করেছে জেলা পুলিশ। মাত্র পাঁচ দিনের টানা অভিযান, তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার, সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ এবং গোয়েন্দা নজরদারির মাধ্যমে চক্রটির তিন সদস্যকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। একই সঙ্গে উদ্ধার করা হয়েছে তিনটি চোরাই গাড়ি।
শনিবার নারায়ণগঞ্জ জেলা পুলিশ সুপারের কার্যালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান নারায়ণগঞ্জের পুলিশ সুপার মো. মিজানুর রহমান মুন্সী।
তিনি জানান, গত ২২ জুন দুপুরে নারায়ণগঞ্জ জজ কোর্টের সামনে পার্কিংয়ে রাখা একটি টয়োটা এক্স করোলা (মডেল-২০০৬) প্রাইভেটকার চুরি হয়। গাড়ির মালিক মোহাম্মদ আরিফ আদালতের কাজ শেষে নাস্তা করতে গেলে অল্প সময়ের মধ্যেই দুর্বৃত্তরা গাড়িটি নিয়ে পালিয়ে যায়। ফিরে এসে গাড়িটি না পেয়ে তিনি ফতুল্লা মডেল থানায় অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে একটি চুরির মামলা দায়ের করেন।
মামলা দায়েরের পরপরই ফতুল্লা মডেল থানার একটি বিশেষ তদন্ত দল ঘটনাটিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত শুরু করে। তদন্তে তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তা, আশপাশের সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ ও বিশ্লেষণ, বিভিন্ন স্থানে গোয়েন্দা নজরদারি এবং সম্ভাব্য রুট পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে চোরচক্রের সদস্যদের পরিচয় শনাক্ত করা হয়।
তদন্তের ধারাবাহিকতায় প্রথমে ফতুল্লার দেলপাড়া-চিতাশাল এলাকা থেকে চক্রের মূলহোতা মুক্তার হোসেন ওরফে মুক্তা (৪৮)-কে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে কুমিল্লার নাঙ্গলকোট এলাকায় অভিযান চালিয়ে চক্রের আরও দুই সদস্য মো. মোমিনুর রহমান ওরফে লিটন (৪২) এবং আলাউদ্দিন (৩৬)-কে গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হয় পুলিশ।
গ্রেপ্তারকৃতদের জিজ্ঞাসাবাদে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যায়। তাদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে ফতুল্লা থেকে চুরি হওয়া টয়োটা এক্স করোলা গাড়িটি উদ্ধার করা হয়। একই সঙ্গে তাদের হেফাজত থেকে আরও দুটি চোরাই যানবাহন উদ্ধার করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে একটি নোয়া মাইক্রোবাস (ঢাকা মেট্রো-গ-১৪-৯২৩০) এবং একটি প্রাইভেটকার (চট্টগ্রাম মেট্রো-ঘ-১-২৮০)।
সংবাদ সম্মেলনে পুলিশ সুপার জানান, প্রাথমিক তদন্তে গ্রেপ্তার হওয়া তিনজনের বিরুদ্ধে মোট পাঁচটি মামলা থাকার তথ্য পাওয়া গেছে। এর মধ্যে চারটি গাড়ি চুরির এবং একটি মাদক সংক্রান্ত মামলা। দীর্ঘদিন ধরে তারা সংঘবদ্ধভাবে দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে পার্কিংয়ে রাখা কিংবা নির্জন স্থানে থাকা গাড়ি চুরি করে আসছিল। পরে চুরি করা গাড়ির নম্বর প্লেট ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্র পরিবর্তন করে বিভিন্ন এলাকায় বিক্রি অথবা পাচার করত।
তিনি বলেন, “মাত্র পাঁচ দিনের মধ্যেই তথ্যপ্রযুক্তি, সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ এবং গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে আন্তঃজেলা এই চোরচক্রকে শনাক্ত ও গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়েছে। এটি নারায়ণগঞ্জ জেলা পুলিশের একটি গুরুত্বপূর্ণ সাফল্য। কোনো চোরচক্রকে নারায়ণগঞ্জে অপরাধ করার সুযোগ দেওয়া হবে না।”
এসপি মিজানুর রহমান মুন্সী আরও বলেন, যানবাহন চুরি প্রতিরোধে জেলার গুরুত্বপূর্ণ পার্কিং এলাকা, আদালত চত্বর এবং জনসমাগমস্থলে সিসিটিভি ক্যামেরার আওতা বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি পুলিশের নিয়মিত টহল আরও জোরদার করা হয়েছে, যাতে ভবিষ্যতে এ ধরনের অপরাধ কার্যকরভাবে প্রতিরোধ করা যায়।
তিনি জানান, গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তিদের সঙ্গে আরও কেউ জড়িত রয়েছে কি না, চক্রটির বিস্তৃতি কতদূর এবং উদ্ধার হওয়া অন্যান্য গাড়ির প্রকৃত মালিক কারা—এসব বিষয় খতিয়ে দেখা হচ্ছে। ইতোমধ্যে উদ্ধার হওয়া গাড়িগুলোর প্রকৃত মালিকানা যাচাইয়ের কাজ চলছে এবং তদন্তের অগ্রগতির ভিত্তিতে আরও অভিযান পরিচালনা করা হবে।
পুলিশের দাবি, এই অভিযানের মাধ্যমে একটি সক্রিয় আন্তঃজেলা গাড়ি চোরচক্রের কার্যক্রমে বড় ধরনের ধাক্কা দেওয়া সম্ভব হয়েছে। তদন্ত অব্যাহত রয়েছে এবং চক্রটির সঙ্গে জড়িত অন্য সদস্যদেরও আইনের আওতায় আনার চেষ্টা চলছে। গ্রেপ্তার হওয়া তিন আসামির বিরুদ্ধে আইনগত কার্যক্রম প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।