আন্তর্জাতিক ডেস্ক ::
আফ্রিকার মধ্যাঞ্চলীয় দেশ ডেমোক্রেটিক রিপাবলিক অব কঙ্গোতে (ডিআর কঙ্গো) ইবোলার ভয়াবহ প্রাদুর্ভাবে মৃতের সংখ্যা ৪০০ ছাড়িয়েছে। বৃহস্পতিবার দেশটির সরকারি পরিসংখ্যানের বরাত দিয়ে এ তথ্য জানিয়েছে ফরাসি বার্তা সংস্থা এএফপি।
দেশটির জাতীয় জনস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের (আইএনএসপি) সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, গত ১৫ মে ইবোলার প্রাদুর্ভাব ঘোষণা করার পর থেকে এ পর্যন্ত ১ হাজার ৪০৬ জন এই ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন। তাদের মধ্যে অন্তত ৪৩৮ জনের মৃত্যু হয়েছে। এতে মৃত্যুহার দাঁড়িয়েছে ৩১ শতাংশেরও বেশি।
প্রাদুর্ভাবের মূল কেন্দ্র থেকে প্রায় ৬০০ কিলোমিটার দূরে উত্তর-পূর্বাঞ্চলের প্রধান শহর কিসাঙ্গানিতেও প্রথমবারের মতো একজন ইবোলা রোগী শনাক্ত হয়েছেন। আইএনএসপির তথ্যমতে, ২৪ বছর বয়সী এক গর্ভবতী নারীর মরদেহের নমুনা পরীক্ষায় ইবোলা পজিটিভ পাওয়া গেছে।
স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, নিহত ওই নারীর মরদেহ ইতুরি প্রদেশের নিয়া নিয়া স্বাস্থ্য অঞ্চল থেকে মোটরসাইকেলে করে গোপনে কিসাঙ্গানিতে আনা হয়েছিল। প্রায় ১৫ লাখ মানুষের আবাসস্থল কিসাঙ্গানি শোপো প্রদেশের রাজধানী।
বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, ইবোলায় আক্রান্ত হয়ে মারা যাওয়া ব্যক্তির মরদেহ অত্যন্ত সংক্রামক থাকে। অনেক ক্ষেত্রে দাফন বা অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার সময় মৃতদেহের সংস্পর্শে এসে ভাইরাসটি ছড়িয়ে পড়ার নজির রয়েছে। বর্তমান প্রাদুর্ভাবের জন্য দায়ী ইবোলার বুন্দিবুগিও (Bundibugyo) প্রজাতি, যার বিরুদ্ধে এখনো কোনো অনুমোদিত টিকা বা নির্দিষ্ট চিকিৎসা নেই। তবে এ বিষয়ে সম্ভাব্য প্রতিষেধকের ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল শিগগিরই শুরু হওয়ার কথা রয়েছে।
দেশটিতে চলমান প্রাদুর্ভাবের কেন্দ্রস্থল উত্তর-পূর্বাঞ্চলের ইতুরি প্রদেশ। কঙ্গোতে ইবোলায় মোট মৃত্যুর ৮৩ শতাংশেরও বেশি এই প্রদেশেই ঘটেছে। তবে দেশটির কর্মকর্তাদের মতে, সংঘাতপূর্ণ ও দুর্গম এলাকাগুলোর কারণে প্রকৃত সংক্রমণের চিত্র নিরূপণ করা অত্যন্ত কঠিন।
ইতুরি প্রদেশের সীমান্ত উগান্ডা ও দক্ষিণ সুদানের সঙ্গে যুক্ত। এরই মধ্যে ইবোলার সংক্রমণ পার্শ্ববর্তী উত্তর কিভু ও দক্ষিণ কিভু প্রদেশেও ছড়িয়ে পড়েছে।
ইবোলা কী?
ইবোলা ভাইরাসের বৈজ্ঞানিক নাম অর্থোইবোলাভাইরাস জাইরেন্স। এ পর্যন্ত ভাইরাসটির ছয়টি প্রজাতি শনাক্ত হয়েছে। সেগুলো হলো—জাইর, সুদান, বুন্দিবুগিও, রেস্টন, তাই ফরেস্ট এবং বোম্বালি। ২০১৪ সালের পর সবচেয়ে বেশি সংক্রমণ ঘটিয়েছে জাইর প্রজাতি। তবে বর্তমানে কঙ্গো ও উগান্ডার প্রাদুর্ভাবের জন্য দায়ী বুন্দিবুগিও প্রজাতি।
ইবোলা মূলত মানুষ এবং প্রাইমেট গোত্রের প্রাণী—যেমন শিম্পাঞ্জি, গরিলা ও ওরাংওটাং—আক্রান্ত করে। এটি বাতাসে ছড়ায় না। আক্রান্ত ব্যক্তি বা প্রাণীর রক্ত, লালা, ঘাম, বমি, মল-মূত্র কিংবা অন্যান্য শারীরিক তরলের সরাসরি সংস্পর্শে এলে ভাইরাসটি সংক্রমিত হয়। আক্রান্ত ব্যক্তির ব্যবহৃত সুঁই, কাপড় কিংবা মৃতদেহের সংস্পর্শ থেকেও এটি ছড়াতে পারে।
ফলখেকো বাদুড়কে ইবোলার প্রাকৃতিক বাহক হিসেবে বিবেচনা করা হয়। যদিও বাদুড় নিজে এ রোগে আক্রান্ত হয় না, তবে ভাইরাস বহন করে। এছাড়া বনমানুষ, হরিণ ও সজারুর মতো বন্য প্রাণীর মাধ্যমেও মানুষের মধ্যে ভাইরাসটি ছড়িয়ে পড়তে পারে।
ইবোলার উপসর্গ
ইবোলার প্রধান উপসর্গগুলোর মধ্যে রয়েছে—হঠাৎ তীব্র জ্বর, প্রচণ্ড দুর্বলতা ও ক্লান্তি, মাথাব্যথা, গলাব্যথা, মাংসপেশিতে ব্যথা, ডায়রিয়া, বমি, শরীরে ফুসকুড়ি, লিভার ও কিডনির কার্যকারিতা হ্রাস এবং শেষ পর্যায়ে নাক, মুখ কিংবা মলদ্বার দিয়ে অভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক রক্তক্ষরণ। সাধারণত সংক্রমণের দ্বিতীয় দিন থেকেই এসব উপসর্গ দেখা দিতে শুরু করে।
যদিও ইবোলা বাতাসের মাধ্যমে ছড়ায় না, তবুও এটি অত্যন্ত প্রাণঘাতী একটি রোগ। রোগের শেষ পর্যায়ে ব্যাপক রক্তক্ষরণের কারণে অনেক রোগীর মৃত্যু হয়। এ কারণেই ইবোলাকে ‘হেমোরেজিক ফিভার’ বা রক্তক্ষরণজনিত জ্বর বলা হয়।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) তথ্য অনুযায়ী, ইবোলায় গড় মৃত্যুহার প্রায় ৫০ শতাংশ। তবে কঙ্গোতে সাম্প্রতিক প্রাদুর্ভাবে এই হার ৪০ থেকে ৭০ শতাংশ পর্যন্ত পৌঁছেছে। গত ৫০ বছরে আফ্রিকাজুড়ে ইবোলায় ১৫ হাজারেরও বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছে।
সূত্র: এএফপি, ডব্লিউএইচও।