স্টাফ রিপোর্টার:
সরকারের ঘোষিত দুর্নীতিবিরোধী ‘জিরো টলারেন্স’ নীতির মধ্যেই জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) আওতাধীন কাস্টমস বিভাগের একজন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অবৈধ সম্পদ অর্জন, ঘুষ গ্রহণ, ক্ষমতার অপব্যবহার, শুল্ক ফাঁকি, সোনা চোরাচালান সিন্ডিকেটকে সহায়তা এবং অর্থ পাচারের মতো গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। ঢাকা কাস্টম হাউসের সাবেক ডেপুটি কমিশনার (বিচার) এবং বর্তমানে ন্যাশনাল সিঙ্গেল উইন্ডো (NSW) প্রকল্পের সহকারী প্রকল্প পরিচালক সমরজিৎ দাসের বিরুদ্ধে এসব অভিযোগ এনে সম্প্রতি দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) একটি লিখিত অভিযোগ দাখিল করা হয়েছে।
অভিযোগটি করেছেন এক মানবাধিকার কর্মী ও সাংবাদিক। অভিযোগপত্রের সঙ্গে বিভিন্ন তথ্য, নথি ও সম্পদের বিবরণ সংযুক্ত করা হয়েছে বলেও দাবি করা হয়েছে। তবে এই অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তদন্ত বা যাচাইয়ের ফলাফল এখনো প্রকাশিত হয়নি এবং অভিযুক্ত কর্মকর্তার বক্তব্যও তাৎক্ষণিকভাবে পাওয়া যায়নি।
অভিযোগে বলা হয়েছে, ঢাকা কাস্টম হাউসের বিচার শাখায় দায়িত্ব পালনকালে সমরজিৎ দাস প্রবাসী যাত্রী ও সাধারণ আমদানিকারকদের নানা ধরনের হয়রানির মাধ্যমে একটি শক্তিশালী ঘুষ-নির্ভর সিন্ডিকেট গড়ে তোলেন। কাস্টমস গোডাউনে আটক থাকা শুল্কযোগ্য মালামাল—বিশেষ করে স্বর্ণের বার, স্বর্ণালঙ্কার, মোবাইল ফোন, ল্যাপটপ, ইলেকট্রনিক পণ্যসহ বিভিন্ন মূল্যবান সামগ্রী খালাসের ক্ষেত্রে ইচ্ছাকৃতভাবে জটিলতা সৃষ্টি করা হতো বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
অভিযোগকারীর দাবি, বিচার শাখার ফাইল নিষ্পত্তি এবং ডিটেনশন মেমো ক্লিয়ারেন্সকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠে একটি সংঘবদ্ধ দালালচক্র। এই চক্রের মাধ্যমে সাধারণ যাত্রীদের কাছ থেকে ফাইলপ্রতি ৫০ হাজার টাকা থেকে শুরু করে ২ লাখ টাকা পর্যন্ত ঘুষ আদায় করা হতো। অভিযোগ অনুযায়ী, এসব অর্থের একটি বড় অংশ সরাসরি সমরজিৎ দাসের কাছে পৌঁছাত।
অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, বিচার শাখায় কর্মরত অবস্থায় তিনি এমন একটি পরিবেশ তৈরি করেছিলেন, যেখানে ভুক্তভোগী কোনো যাত্রী বা আমদানিকারক সরাসরি তার সঙ্গে দেখা করতে পারতেন না। কাস্টমস কার্যালয়ের বাইরে অবস্থানকারী দালালদের মাধ্যমেই সব ধরনের যোগাযোগ ও দরকষাকষি সম্পন্ন হতো। ফলে বৈধভাবে পণ্য খালাসের অধিকার থাকা ব্যক্তিরাও বাধ্য হয়ে অতিরিক্ত অর্থ পরিশোধ করতেন বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
শুধু ঘুষ গ্রহণই নয়, সমরজিৎ দাসের বিরুদ্ধে সোনা চোরাচালান সিন্ডিকেটকে সহায়তা করারও অভিযোগ আনা হয়েছে। অভিযোগে দাবি করা হয়েছে, বিমানবন্দরে দায়িত্ব পালনকালে তিনি প্রভাবশালী চোরাচালান চক্রের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তোলেন এবং বিভিন্ন সময় জব্দ হওয়া স্বর্ণ ও অন্যান্য মূল্যবান পণ্য অবৈধভাবে খালাসে সহায়তা করেন।
বিশেষভাবে ২০২৩ সালে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে আলোচিত ‘৫০ কেজি স্বর্ণ চুরি’ ঘটনার প্রসঙ্গও অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। অভিযোগকারীর দাবি, ওই ঘটনার সময় দায়িত্বে থাকা কয়েকজন কর্মকর্তার মধ্যে সমরজিৎ দাসের ভূমিকাও তদন্তের আওতায় আনা প্রয়োজন। যদিও এ বিষয়ে এখন পর্যন্ত কোনো তদন্ত প্রতিবেদনে তার সম্পৃক্ততার বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করা হয়নি।
অভিযোগে বলা হয়েছে, পূর্ববর্তী সরকারের প্রভাবশালী মহলের সঙ্গে সুসম্পর্ক থাকার কারণে দীর্ঘদিন তার বিরুদ্ধে ওঠা বিভিন্ন অভিযোগ প্রশাসনিকভাবে ধামাচাপা দেওয়া হয়। বিচার শাখায় নিজের পছন্দের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পদায়ন করে তিনি একটি প্রভাবশালী নেটওয়ার্ক গড়ে তোলেন, যার মাধ্যমে কোটি কোটি টাকার ঘুষ বাণিজ্য পরিচালিত হতো বলে অভিযোগে দাবি করা হয়েছে।
এছাড়া অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, ঘুষ ও দুর্নীতির মাধ্যমে অর্জিত অর্থের একটি অংশ বিভিন্ন উপায়ে বিদেশে, বিশেষ করে ভারতে পাচার করা হয়েছে বলে সন্দেহ রয়েছে। এজন্য তার ব্যাংক হিসাব, আর্থিক লেনদেন, বৈদেশিক ভ্রমণ, কর নথি এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের আর্থিক কার্যক্রম তদন্তের দাবি জানানো হয়েছে।
অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে, সুনামগঞ্জ জেলার ছাতক উপজেলার মরলহাটি গ্রামের বাসিন্দা মোহিনী কুমার দাসের ছেলে সমরজিৎ দাস বর্তমানে রাজধানীর উত্তরা সেক্টর-৪ এলাকায় একটি বিলাসবহুল ফ্ল্যাটে বসবাস করছেন। সরকারি চাকরিজীবী হিসেবে তার বেতন-ভাতার সঙ্গে বর্তমান জীবনযাত্রার মান এবং অর্জিত সম্পদের সামঞ্জস্য রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখার দাবি জানানো হয়েছে।
অভিযোগকারীর ভাষ্য অনুযায়ী, সমরজিৎ দাস ও তার পরিবারের সদস্যদের নামে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় একাধিক ফ্ল্যাট, জমি, প্লট, ব্যাংক আমানত এবং অন্যান্য স্থাবর-অস্থাবর সম্পদ রয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এসব সম্পদের উৎস অনুসন্ধান করে জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের বিষয়টি তদন্তের আহ্বান জানানো হয়েছে।
অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, কাস্টমস বিভাগের বিচার শাখা দীর্ঘদিন ধরেই নানা অনিয়ম ও দালালচক্রের অভিযোগে আলোচিত হলেও কার্যকর নজরদারির অভাবে এসব কর্মকাণ্ড বন্ধ হয়নি। ফলে সাধারণ প্রবাসী যাত্রী ও ব্যবসায়ীরা প্রতিনিয়ত হয়রানির শিকার হচ্ছেন।
দুদকের কাছে দেওয়া অভিযোগে সমরজিৎ দাসের বিরুদ্ধে অবৈধ সম্পদের হিসাব অনুসন্ধান, ব্যাংক হিসাব জব্দ, সম্পদের তথ্য যাচাই, বিদেশে অর্থ পাচারের অভিযোগ তদন্ত এবং প্রয়োজনীয় আইনি ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানানো হয়েছে।
তবে উল্লেখ্য, এসব অভিযোগ বর্তমানে অভিযোগকারীর লিখিত আবেদনের ভিত্তিতে উত্থাপিত হয়েছে। অভিযোগগুলোর সত্যতা এখনো সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তদন্তে প্রমাণিত হয়নি। এ বিষয়ে সমরজিৎ দাসের বক্তব্য জানা সম্ভব হলে তা প্রকাশ করা হবে।