গাজীপুর বিআরটিএ এডি মাহফুজুর ও মোটরযান পরিদর্শকদের সিন্ডিকেটে জিম্মি সেবাগ্রহীতারা

স্টাফ রিপোর্টার:

গাজীপুর বাংলাদেশ রোড ট্রান্সপোর্ট অথরিটি (বিআরটিএ) সার্কেলে ড্রাইভিং লাইসেন্স, যানবাহনের ফিটনেস সনদ এবং রেজিস্ট্রেশন কার্যক্রমকে কেন্দ্র করে দীর্ঘদিন ধরে ব্যাপক অনিয়ম, ঘুষ বাণিজ্য ও দালালচক্রের দৌরাত্ম্যের অভিযোগ উঠেছে। ভুক্তভোগীদের দাবি, নির্ধারিত সরকারি প্রক্রিয়ায় কোনো কাজ সম্পন্ন করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে। বরং প্রতিটি ধাপে ঘুষ, দালালের মাধ্যমে লেনদেন এবং কর্মকর্তাদের যোগসাজশ ছাড়া সেবা পাওয়া কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে।

অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন গাজীপুর বিআরটিএর সহকারী পরিচালক (ইঞ্জিনিয়ারিং) এস এম মাহফুজুর রহমান এবং কয়েকজন মোটরযান পরিদর্শক। তাদের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ মদদে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট গড়ে উঠেছে, যা প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ অবৈধ অর্থ লেনদেন করছে বলে অভিযোগ করেছেন একাধিক সেবাগ্রহীতা ও সংশ্লিষ্ট সূত্র।

লাইসেন্স শাখায় নিয়মের চেয়ে বেশি কার্যকর ঘুষ

ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, ড্রাইভিং লাইসেন্সের লার্নার থেকে শুরু করে চূড়ান্ত লাইসেন্স পর্যন্ত প্রতিটি ধাপেই রয়েছে ঘুষের অলিখিত নিয়ম। আবেদনকারীরা নির্ধারিত ফি জমা দিয়ে আবেদন করলেও তাদের ফাইল বিভিন্ন অজুহাতে আটকে রাখা হয়। কখনো কাগজপত্রে ত্রুটি, কখনো সার্ভারের সমস্যা, আবার কখনো কর্মকর্তা না থাকার অজুহাতে দিনের পর দিন ঘুরতে হয়।

অন্যদিকে, দালালের মাধ্যমে নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ পরিশোধ করলে সেই একই ফাইল দ্রুত নিষ্পত্তি হয়ে যায় বলে অভিযোগ রয়েছে। এমনকি লার্নার পরীক্ষায় অংশ না নিয়েও কিংবা ড্রাইভিং দক্ষতা যাচাই ছাড়াই কিছু আবেদনকারীকে লাইসেন্স পাইয়ে দেওয়ার অভিযোগও করেছেন কয়েকজন ভুক্তভোগী।

বায়োমেট্রিক তথ্য সংগ্রহ, ছবি তোলা এবং স্মার্ট কার্ড ইস্যুর ক্ষেত্রেও সাধারণ আবেদনকারীদের দীর্ঘদিন অপেক্ষা করতে হলেও দালালের মাধ্যমে অতিরিক্ত অর্থ দিলে অল্প সময়েই কাজ সম্পন্ন হয়ে যায় বলে অভিযোগ উঠেছে।

ফিটনেস সনদে চলছে টেবিল মানির বাণিজ্য

সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগ উঠেছে মোটরযান পরিদর্শকদের বিরুদ্ধে। জানা গেছে, গাড়ির প্রকৃত অবস্থা বিবেচনা না করেই অর্থের বিনিময়ে ফিটনেস সনদ দেওয়া হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ ত্রুটিপূর্ণ, মেয়াদোত্তীর্ণ কিংবা রাস্তায় চলাচলের অযোগ্য যানবাহনও মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে সহজেই ফিটনেস সনদ পেয়ে যাচ্ছে।

অন্যদিকে, নিয়ম মেনে রক্ষণাবেক্ষণ করা নতুন বা ভালো অবস্থার যানবাহনও যদি কোনো ধরনের ঘুষ না দেওয়া হয়, তাহলে বিভিন্ন ছোটখাটো ত্রুটি দেখিয়ে ‘আনফিট’ ঘোষণা করা হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন পরিবহন মালিক ও চালকরা।

সংশ্লিষ্টদের মতে, এই অনিয়ম শুধু সরকারের রাজস্ব ব্যবস্থাকেই প্রশ্নবিদ্ধ করছে না, বরং সড়কে দুর্ঘটনার ঝুঁকিও বহুগুণ বাড়িয়ে দিচ্ছে। কারণ ফিটনেসবিহীন যানবাহন অবাধে সড়কে চলাচলের সুযোগ পাচ্ছে।

দালালচক্রের দখলে বিআরটিএ প্রাঙ্গণ

সরেজমিনে বিভিন্ন সেবাগ্রহীতার সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, গাজীপুর বিআরটিএ কার্যালয়ের আশপাশে সার্বক্ষণিক সক্রিয় থাকে একটি সংঘবদ্ধ দালালচক্র। অফিসে প্রবেশের আগেই আবেদনকারীদের সঙ্গে যোগাযোগ করে তারা। সরকারি নিয়মে কাজ করতে গেলে দীর্ঘসূত্রতা, কিন্তু দালালের মাধ্যমে গেলে কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই কাজ সম্পন্ন হয়ে যায়—এমন অভিযোগ প্রায় সবার।

ভুক্তভোগীদের ভাষ্য, সরাসরি কর্মকর্তাদের কাছে গেলে নানা ধরনের ভুল ও আপত্তি তুলে ফাইল ফেরত দেওয়া হয়। কিন্তু একই ফাইল দালালের মাধ্যমে জমা দিলে অল্প সময়ের মধ্যেই অনুমোদন ও স্বাক্ষর সম্পন্ন হয়ে যায়।

বিআরটিএর অভ্যন্তরীণ একটি সূত্রের দাবি, দালালদের মাধ্যমে আদায়কৃত অর্থের একটি বড় অংশ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে ভাগ-বাটোয়ারা হয়। তবে এই অভিযোগের স্বপক্ষে স্বাধীনভাবে কোনো প্রামাণ্য নথি যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

সেবাগ্রহীতাদের চরম দুর্ভোগ

গাজীপুর বিআরটিএতে প্রতিদিন শত শত মানুষ ড্রাইভিং লাইসেন্স, গাড়ির রেজিস্ট্রেশন ও ফিটনেস সংক্রান্ত সেবা নিতে আসেন। কিন্তু অধিকাংশই ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক লাইসেন্সপ্রার্থী বলেন,
“সরকারি নিয়মে কাজ করতে এসে কয়েক সপ্তাহ ধরে ঘুরছি। প্রতিবারই নতুন কোনো অজুহাত দেখানো হচ্ছে। পরে একজন দালাল এসে নির্দিষ্ট টাকার বিনিময়ে কয়েক দিনের মধ্যেই কাজ করে দেওয়ার প্রস্তাব দেয়। তখন বুঝলাম এখানে টাকা ছাড়া কোনো কাজ হয় না।”

আরেকজন পরিবহন মালিক বলেন,
“আমার গাড়ির সব কাগজ ঠিক ছিল। তারপরও বিভিন্ন ত্রুটি দেখিয়ে ফিটনেস দেওয়া হয়নি। পরে দালালের মাধ্যমে টাকা দেওয়ার পর একই গাড়ি কোনো সমস্যা ছাড়াই পাস হয়ে যায়।”

কর্মকর্তার বক্তব্য

এ বিষয়ে গাজীপুর বিআরটিএর সহকারী পরিচালক (ইঞ্জিনিয়ারিং) এস এম মাহফুজুর রহমানের বক্তব্য জানতে যোগাযোগ করা হলে তিনি সুনির্দিষ্ট তথ্য ও লিখিত অভিযোগ ছাড়া এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। তিনি অভিযোগগুলো অস্বীকার বা স্বীকার না করে বিষয়টি এড়িয়ে যান।

তদন্তের দাবি

স্থানীয় সেবাগ্রহীতা, পরিবহন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি এবং সচেতন নাগরিকদের দাবি, গাজীপুর বিআরটিএতে দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা অনিয়ম, ঘুষ বাণিজ্য ও দালালচক্রের কার্যক্রম নিয়ে নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া প্রয়োজন। তারা দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক), সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগ এবং বিআরটিএর ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে অভিযোগগুলো তদন্ত করে সত্যতা যাচাই এবং প্রমাণ পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।

বিশেষ দ্রষ্টব্য: প্রতিবেদনে উল্লিখিত অভিযোগগুলো অভিযোগকারী ও ভুক্তভোগীদের বক্তব্যের ভিত্তিতে উপস্থাপিত। অভিযোগগুলোর বিষয়ে স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে সত্যতা যাচাই করা প্রয়োজন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *