আন্তর্জাতিক ডেস্ক:
ভারতের বৃহত্তম পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র কুদানকুলাম নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্ল্যান্ট (কেকেএনপি)-এর বিপুল পরিমাণ তথ্য ফাঁসের ঘটনা সামনে এসেছে। আন্তর্জাতিক হ্যাকার গ্রুপ ওয়ার্ল্ড লিকস প্রায় ১৯ হাজার নথি ও তথ্য প্রকাশ করেছে, যার মোট আকার প্রায় ১৪ দশমিক ৩ গিগাবাইট। ঘটনাটি ঘিরে ভারতের পারমাণবিক অবকাঠামোর নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।
ব্রিটিশ বার্তা সংস্থা রয়টার্স বৃহস্পতিবার প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে জানায়, ফাঁস হওয়া তথ্যের মধ্যে বিদ্যুৎকেন্দ্রের বিভিন্ন স্থাপনার নকশা, ব্যবহৃত যন্ত্রপাতির প্রযুক্তিগত বিবরণ, সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের তথ্য এবং নিরাপত্তাসংক্রান্ত স্পর্শকাতর নথিও রয়েছে।
ভারতে বর্তমানে সাতটি পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র রয়েছে। এর মধ্যে তামিলনাড়ুর কুদানকুলামে অবস্থিত কেকেএনপি দেশটির সবচেয়ে বড় পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র।
বিদ্যুৎকেন্দ্রটির অন্যতম ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান রিলায়েন্স গ্রুপ। প্রতিষ্ঠানটির পক্ষ থেকে এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, প্রকল্পের একটি সার্ভারে সংরক্ষিত তথ্যভান্ডারের কিছু অংশ ফাঁস হয়েছে। ওই সার্ভার পরিচালনার দায়িত্বে ছিল ভারতীয় ডেটা পরিষেবা প্রদানকারী স্টার্টআপ প্রতিষ্ঠান ইয়োত্তা। বিষয়টি ইতোমধ্যে কেন্দ্রীয় সরকারকে জানানো হয়েছে বলেও দাবি করেছে রিলায়েন্স।
তবে ঠিক কোন ধরনের তথ্য ফাঁস হয়েছে, সে বিষয়ে বিস্তারিত কিছু জানায়নি প্রতিষ্ঠানটি।
অন্যদিকে রিলায়েন্সের অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে ইয়োত্তা। তাদের দাবি, তথ্য ফাঁস হওয়া সার্ভারটির মালিকানা ও নিরাপত্তার দায়িত্ব ছিল রিলায়েন্সের। ইয়োত্তার ভাষ্য অনুযায়ী, গত ২৯ মে তারা সার্ভারে সন্দেহজনক কার্যকলাপ শনাক্ত করে এবং তাৎক্ষণিকভাবে রিলায়েন্সকে সতর্ক করে। পরবর্তীতে জুনের শেষ দিকে রিলায়েন্স ইনফ্রাস্ট্রাকচার তাদের জানায়, একটি বহিরাগত হ্যাকার গ্রুপ তথ্য ফাঁসের হুমকি দিচ্ছে।
অর্থাৎ ইয়োত্তার দাবি অনুযায়ী, তথ্য চুরির ঘটনা মে-জুন মাসেই ঘটেছিল, আর সম্প্রতি সেগুলো প্রকাশ্যে এসেছে।
রয়টার্সের হাতে আসা ফাঁস হওয়া নথিপত্র পর্যালোচনায় দেখা গেছে, কেকেএনপির সার্ভারে মোট প্রায় ৮ লাখ ৫৮ হাজার তথ্য সংরক্ষিত ছিল। ফাঁস হওয়া ১৯ হাজার নথি সেই বিশাল তথ্যভান্ডারেরই একটি অংশ, যার অনেকগুলোই সংবেদনশীল। এসব তথ্য ২০১৬ সাল থেকে ২০২৫ সালের মাঝামাঝি সময় পর্যন্ত সার্ভারে সংরক্ষিত ছিল।
তবে স্বস্তির বিষয় হলো, ফাঁস হওয়া তথ্যের মধ্যে বিদ্যুৎকেন্দ্রের মূল রিঅ্যাক্টর বা কোর সিস্টেমের নকশা পাওয়া যায়নি। কেকেএনপির কোর প্রযুক্তি সরবরাহ করেছে রাশিয়ার রাষ্ট্রায়ত্ত পারমাণবিক সংস্থা রোসাটম।
মার্কিন অলাভজনক সংস্থা নিউক্লিয়ার থ্রেট ইনিশিয়েটিভ (এনটিআই)-এর জ্যেষ্ঠ পরিচালক নিকোলাস রোথ এ ঘটনাকে অত্যন্ত উদ্বেগজনক বলে মন্তব্য করেছেন। রয়টার্সকে তিনি বলেন, ফাঁস হওয়া তথ্য কোনো সাইবার অপরাধী বা নাশকতাকারী গোষ্ঠীর হাতে পৌঁছালে তারা বিদ্যুৎকেন্দ্রে সম্ভাব্য হামলার পরিকল্পনা আরও নিখুঁতভাবে করতে সক্ষম হতে পারে। কারণ এসব নথিতে স্থাপনার স্পর্শকাতর অংশে প্রবেশ ও নিরাপত্তা কাঠামো সম্পর্কিত গুরুত্বপূর্ণ তথ্য রয়েছে।
ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের একটি সূত্র জানিয়েছে, দেশটির পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর পরিচালনাকারী সংস্থা নিউক্লিয়ার পাওয়ার কর্পোরেশন অব ইন্ডিয়া (এনপিসিআইএল) ইতোমধ্যে রিলায়েন্স গ্রুপের সঙ্গে যোগাযোগ করেছে। পাশাপাশি ভারতের প্রধান সাইবার নিরাপত্তা সংস্থা ইন্ডিয়ান কম্পিউটার ইমার্জেন্সি রেসপন্স টিম (সিইআরটি-ইন) ঘটনাটি তদন্ত করছে এবং তথ্য ফাঁসের উৎস ও সম্ভাব্য ঝুঁকি খতিয়ে দেখছে।
সূত্র: রয়টার্স