পরিচ্ছন্ন নারায়ণগঞ্জ’ গড়তে শুরু হচ্ছে বিশেষ অভিযান: ডিসি রায়হান কবির

মোহাম্মদ হোসেন হ্যাপী:

পরিবেশ দূষণ রোধ, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা উন্নয়ন এবং নারায়ণগঞ্জকে পরিচ্ছন্ন ও বাসযোগ্য নগরী হিসেবে গড়ে তুলতে বিশেষ পরিচ্ছন্নতা কর্মসূচি হাতে নিয়েছে জেলা প্রশাসন। এ উদ্যোগের অংশ হিসেবে জেলার সব সরকারি দপ্তর ও সরকারি আবাসিক ভবনের ছাদ, আঙিনা এবং আশপাশের এলাকা পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখার কার্যক্রম শুরু করার ঘোষণা দিয়েছেন নারায়ণগঞ্জের জেলা প্রশাসক মো. রায়হান কবির।

মঙ্গলবার (২১ জুলাই) সকালে জেলা প্রশাসকের সম্মেলন কক্ষে ‘পরিচ্ছন্ন নারায়ণগঞ্জ’ গড়ার লক্ষ্যে আয়োজিত সমন্বয় সভায় সভাপতির বক্তব্যে তিনি এ ঘোষণা দেন। সভা সঞ্চালনা করেন অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক মো. সিফাত উদ্দীন।

সভায় জেলা প্রশাসক মো. রায়হান কবির বলেন, একটি পরিচ্ছন্ন ও বাসযোগ্য সমাজ গড়ে তোলা একদিনের কাজ নয়। এর জন্য প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, জনসচেতনতা এবং সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টা। পরিচ্ছন্নতার চর্চা শুরু করতে হবে নিজ নিজ কর্মস্থল ও বাসা থেকে।

তিনি বলেন, জেলা, উপজেলা ও অধীনস্থ সব সরকারি দপ্তরে পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম বাস্তবায়ন করতে হবে। সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা নিজেদের জায়গা পরিষ্কার রাখলে সাধারণ মানুষও উৎসাহিত হবে। নারায়ণগঞ্জকে এমন একটি উদাহরণ হিসেবে গড়ে তুলতে হবে, যাতে সারা দেশের মানুষ পরিচ্ছন্নতা ও সচেতনতার ক্ষেত্রে এই জেলাকে অনুসরণ করে।

জেলা প্রশাসক আরও বলেন, “নিজের অফিস, নিজের বাসা থেকেই পরিচ্ছন্নতা শুরু করুন। এই দেশ আমাদের, এই মাটির সন্তান আমরা। শহরকে সুন্দর ও বাসযোগ্য করার দায়িত্ব আমাদের সবার। সরকারের লক্ষ্য একটি পরিচ্ছন্ন, নিরাপদ ও স্বাস্থ্যকর বাংলাদেশ গড়ে তোলা।”

তিনি জানান, সরকারি অফিস, আবাসিক ভবন এবং জনসাধারণের ব্যবহৃত স্থানগুলোতে পরিচ্ছন্নতার সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে। এ ক্ষেত্রে কোনো ধরনের অবহেলা বা গাফিলতি গ্রহণযোগ্য হবে না।

সভা শেষে জেলার সব সরকারি দপ্তর ও উপজেলা প্রশাসনকে বিশেষ পরিচ্ছন্নতা কর্মসূচি বাস্তবায়নে দ্রুত প্রস্তুতি গ্রহণ এবং কার্যক্রম তদারকির নির্দেশ দেওয়া হয়।

সভায় বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, ড্রেন-নালা পরিষ্কার, প্লাস্টিক দূষণ রোধ, শীতলক্ষ্যা নদীসহ জেলার বিভিন্ন খাল-নদী দখল ও দূষণমুক্তকরণ এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধির বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়।

জেলা প্রশাসক বলেন, পরিচ্ছন্ন ও স্বাস্থ্যকর নগরী গড়ে তুলতে সরকার বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। তারই ধারাবাহিকতায় নারায়ণগঞ্জে এই পরিচ্ছন্নতা অভিযান শুরু করা হয়েছে। তবে শুধু প্রশাসনের একার পক্ষে এ কাজ সফল করা সম্ভব নয়। এজন্য সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, জনপ্রতিনিধি, ব্যবসায়ী, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সামাজিক সংগঠন এবং সাধারণ মানুষকে নিজ নিজ অবস্থান থেকে এগিয়ে আসতে হবে।

তিনি বলেন, “পরিচ্ছন্নতা শুরু হবে আমার ঘর থেকে, আমার আঙিনা থেকে। প্রতিটি মানুষ যদি নিজের বাড়ি, দোকান ও প্রতিষ্ঠানের সামনে পরিষ্কার রাখেন, তাহলে পুরো শহরই পরিচ্ছন্ন হয়ে উঠবে। যত্রতত্র ময়লা ফেলার অভ্যাস পরিবর্তন করতে হবে।”

যত্রতত্র ময়লা ফেলা বন্ধে ব্যাপক প্রচারণার পাশাপাশি প্রয়োজনে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও জানান তিনি।

শীতলক্ষ্যা নদী ও জেলার খাল প্রসঙ্গে জেলা প্রশাসক বলেন, শীতলক্ষ্যা নারায়ণগঞ্জের প্রাণ। এই নদী এবং জেলার খালগুলো দখল ও দূষণমুক্ত রাখতে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করা হবে। নদী ও পরিবেশ রক্ষা করা সবার দায়িত্ব।

পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় বৃক্ষরোপণের গুরুত্ব তুলে ধরে তিনি বলেন, গাছের কোনো বিকল্প নেই। পরিবেশ রক্ষায় বেশি বেশি গাছ লাগাতে হবে এবং সেগুলোর যথাযথ পরিচর্যা নিশ্চিত করতে হবে।

সভায় সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, প্রতিটি উপজেলা ও ইউনিয়নে নির্ধারিত সময়ে ময়লা সংগ্রহ নিশ্চিত করা হবে। যত্রতত্র ময়লা ফেলা বন্ধে সচেতনতামূলক কার্যক্রমের পাশাপাশি অভিযান পরিচালনা করা হবে। এছাড়া শীতলক্ষ্যা নদীসহ অন্যান্য নদী ও খাল দূষণমুক্ত রাখতে নিয়মিত কার্যক্রম চালানো হবে এবং জেলাজুড়ে বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি জোরদার করা হবে।

এছাড়া স্কুল-কলেজ, মসজিদ-মন্দির ও বাজার এলাকায় পরিচ্ছন্নতা বিষয়ে জনসচেতনতা তৈরিতে প্রচার কার্যক্রম পরিচালনার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। আগামী এক মাসের মধ্যে জেলার প্রতিটি উপজেলায় অন্তত একটি করে ‘মডেল পরিচ্ছন্ন গ্রাম ওয়ার্ড’ গড়ে তোলার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।

সভায় উপস্থিত ছিলেন নারায়ণগঞ্জ জেলা পরিষদের প্রশাসক অধ্যাপক মামুন মাহমুদ, নারায়ণগঞ্জ নগর উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান মাশুকুল ইসলাম রাজীব, নারায়ণগঞ্জ মহানগর বিএনপির সদস্য সচিব অ্যাডভোকেট আবু আল ইউসুফ খান টিপু, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. শামীম, নারায়ণগঞ্জ চেম্বার অব কমার্সের সহ-সভাপতি মোর্শেদ সারোয়ার সোহেলসহ জেলার বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের কর্মকর্তা, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তারা, রোভার স্কাউট প্রতিনিধি এবং সামাজিক সংগঠনের নেতৃবৃন্দ।

সভা শেষে জেলা প্রশাসক উপস্থিত সবাইকে পরিচ্ছন্নতা ও পরিবেশ রক্ষায় সম্মিলিতভাবে কাজ করার আহ্বান জানান।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *