কামরুল ইসলাম:
চট্টগ্রাম নগরীতে ‘হানি ট্র্যাপ’ চক্রের ফাঁদে ফেলে এক ব্যক্তিকে অপহরণ, মারধর, বিবস্ত্র করে ছবি ধারণ এবং ভয়ভীতি দেখিয়ে চাঁদা আদায়ের অভিযোগে নারীসহ দুজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। কোতোয়ালী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) জায়েদ নুরের নেতৃত্বে পরিচালিত অভিযানে তাদের গ্রেপ্তার করা হয়।
পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, গত ২২ জুলাই ২০২৬ সন্ধ্যায় ভুক্তভোগী মো. আনোয়ার হোসেন বন্ধুদের সঙ্গে দেখা করার উদ্দেশ্যে চট্টগ্রাম নগরের কোতোয়ালী থানাধীন কাজীর দেউরী মোড়ে যান। সেখানে চা খাওয়ার জন্য অবস্থানকালে আসামি নুসরাত ফারিয়া কৌশলে তাকে ‘হানি ট্র্যাপ’-এর ফাঁদে ফেলেন বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
পরে তাকে অপহরণ করে কোতোয়ালী থানাধীন একটি গলির দ্বিতীয় ঘটনাস্থলে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে তাকে আটকে রেখে বিবস্ত্র করে ছবি তোলা হয় এবং এক লাখ টাকা চাঁদা দাবি করা হয় বলে এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে। টাকা না দিলে ছবি ছড়িয়ে দেওয়াসহ বিভিন্নভাবে ভয়ভীতি প্রদর্শন করা হয় বলে অভিযোগ করেন ভুক্তভোগী।
একপর্যায়ে ভুক্তভোগীর কাছ থেকে ৭ হাজার টাকা চাঁদা আদায় করা হয়। এ সময় আসামিরা ও তাদের সঙ্গে থাকা অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিরা আনোয়ার হোসেনকে শারীরিকভাবে নির্যাতন করেন বলে অভিযোগ করা হয়েছে। পরে দাবিকৃত চাঁদার আংশিক টাকা পাওয়ার পর তাকে ঘটনাস্থলের একটি গলিতে রেখে আসামিরা চলে যায় বলে পুলিশ জানিয়েছে।
ঘটনার পর ভুক্তভোগী আনোয়ার হোসেন কোতোয়ালী থানায় গিয়ে লিখিত অভিযোগ দেন। তার অভিযোগের ভিত্তিতে ২৫ জুলাই ২০২৬ তারিখে কোতোয়ালী থানায় মামলা নম্বর-৩৯ দায়ের করা হয়। মামলায় দণ্ডবিধির ৩৪২, ৩২৩, ৩৬৫, ৩৮৫, ৩৮৬, ৫০৬ ও ৩৪ ধারায় অভিযোগ আনা হয়েছে।
পুলিশ জানায়, ভুক্তভোগীর দেওয়া তথ্য ও শনাক্তের ভিত্তিতে মামলার এজাহারনামীয় আসামি মোবারক হোসেন (২৬) ও নুসরাত ফারিয়াকে গ্রেপ্তার করা হয়। তাদের জিজ্ঞাসাবাদে চক্রটির বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া গেছে বলে দাবি পুলিশের।
পুলিশের দাবি, জিজ্ঞাসাবাদে গ্রেপ্তার দুজন স্বীকার করেছেন যে, তারা পরস্পর যোগসাজশে বিভিন্ন মানুষের সরলতার সুযোগ নিয়ে ‘হানি ট্র্যাপ’-এর ফাঁদে ফেলতেন। পরে বিভিন্ন কৌশলে তাদের কাছ থেকে অর্থ ও সম্পদ দাবি করে আদায় করা হতো। এভাবে অনেককে সর্বস্বান্ত করার অভিযোগও পাওয়া গেছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
গ্রেপ্তারকৃত মোবারক হোসেনকে সঙ্গে নিয়ে কোতোয়ালী থানাধীন কাজীর দেউরীর ২ নম্বর গলির ওপরের বাড়ি রাজ্জাক ভিলায় তার কক্ষে অভিযান পরিচালনা করা হয়। পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, অভিযানের সময় মোবারক হোসেনের দেখানো ও উপস্থাপন করা ভুক্তভোগীর মোটরসাইকেলের চাবি উদ্ধার করা হয়।
এ ছাড়া ভুক্তভোগীর শনাক্তমতে পাঁচ ফুট দীর্ঘ একটি প্লাস্টিকের রশি এবং আসামির ব্যবহৃত পুরোনো একটি Samsung Galaxy A14 5G মোবাইল ফোন জব্দ করা হয়। পুলিশের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, মোবাইলটির সামনের গ্লাস ভাঙা এবং এর IMEI নম্বর 350031476803516 (অস্পষ্ট)।
পুলিশ জানায়, ২৫ জুলাই রাত ২টা ১৫ মিনিটের দিকে মামলার দ্বিতীয় ঘটনাস্থল থেকে উপস্থিত সাক্ষীদের সামনে জব্দতালিকা তৈরি করে এসব আলামত জব্দ করা হয়।
গ্রেপ্তারকৃত মোবারক হোসেন (২৬) চট্টগ্রামের কাজীর দেউরীর সমাধর ক্লাব ২ নম্বর গলির বাসিন্দা। তার বাবার নাম আব্দুর রাজ্জাক। অপর আসামি নুসরাত ফারিয়া (২০) নোয়াখালীর বেগমগঞ্জ থানার সেবের হাট কাঁচাবাজার এলাকার নুর নবী চেয়ারম্যানের বাড়ির বাসিন্দা। বর্তমানে তিনি চট্টগ্রামের ডবলমুরিং থানাধীন আগ্রাবাদ চৌমুহনী ছারিয়া পাড়া, মাজার গলির পাশে বসবাস করেন বলে পুলিশ জানিয়েছে।
পুলিশের সিডিএমএস পর্যালোচনার তথ্য অনুযায়ী, গ্রেপ্তারকৃত মোবারক হোসেনের বিরুদ্ধে বিভিন্ন থানায় মারামারি, চাঁদাবাজি ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের অভিযোগে পাঁচটি মামলা রয়েছে।
কোতোয়ালী থানা পুলিশ জানিয়েছে, এ ঘটনায় জড়িত অপর আসামিদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারের জন্য অভিযান অব্যাহত রয়েছে। একই সঙ্গে গ্রেপ্তার দুজনের সঙ্গে আরও কেউ জড়িত কি না, চক্রটি কীভাবে কাজ করত এবং এ ধরনের ঘটনায় আরও ভুক্তভোগী রয়েছে কি না—এসব বিষয় তদন্ত করে দেখা হচ্ছে।
পুলিশের পক্ষ থেকে নগরবাসীকে অপরিচিত ব্যক্তির সঙ্গে অনলাইনে বা সরাসরি যোগাযোগের ক্ষেত্রে সতর্ক থাকার আহ্বান জানানো হয়েছে। বিশেষ করে পরিচয়ের পর ব্যক্তিগত স্থানে যাওয়ার আগে যাচাই-বাছাই এবং ব্যক্তিগত ছবি, ভিডিও বা গুরুত্বপূর্ণ তথ্য অপরিচিত কারও কাছে না দেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।