ঢাকা রেশনিং দোকান সেলে ডিলার দুলাল মিয়ার বিরুদ্ধে চাল-আটা কালোবাজারির অভিযোগ

স্টাফ রিপোর্টার:

রাজধানীর দারুস সালাম এলাকায় ঢাকা রেশনিং দোকান সেলের আওতাধীন সরকারি চাল ও আটা বিক্রিতে অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। সরকারি নির্ধারিত মূল্যে এবং নিয়ম অনুযায়ী প্রকৃত ভোক্তাদের কাছে খাদ্যপণ্য বিক্রির কথা থাকলেও বাস্তবে বিক্রয় কার্যক্রম নিয়ে নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। বরাদ্দের চাল ও আটার একটি অংশ প্রকৃত ভোক্তাদের কাছে না পৌঁছে বেশি দামে কালোবাজারে বিক্রি করে দেওয়ার অভিযোগও করেছেন স্থানীয়রা।

অভিযোগ রয়েছে, রেশনিং দোকানে সরকারি বরাদ্দের চাল ও আটা আসার পর তা নির্ধারিত নিয়মে বিক্রি করার কথা থাকলেও বিক্রয় প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতার ঘাটতি রয়েছে। কত পরিমাণ চাল ও আটা বরাদ্দ পাওয়া যাচ্ছে, কতটুকু দোকানে মজুত থাকছে, কতটুকু প্রকৃত ভোক্তাদের কাছে বিক্রি হচ্ছে এবং অবশিষ্ট পণ্য কোথায় যাচ্ছে—এসব বিষয়ে স্থানীয় ভোক্তাদের মধ্যে নানা প্রশ্ন রয়েছে।

বিশেষ করে নির্ধারিত সময়ে দোকানে গিয়ে সরকারি মূল্যে চাল ও আটা কিনতে চাওয়া অনেক ভোক্তার অভিযোগ, তারা প্রয়োজনীয় পণ্য পাচ্ছেন না। কখনো পণ্য শেষ হয়ে যাওয়ার কথা বলা হচ্ছে, আবার কখনো বিক্রয় কার্যক্রম নিয়ে তাদের বিভিন্ন ধরনের সমস্যার মুখোমুখি হতে হচ্ছে। অথচ একই সময়ে সরকারি বরাদ্দের পণ্য বাইরে বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে কি না, তা নিয়ে সন্দেহ তৈরি হয়েছে।

গোপন ক্যামেরায় বক্তব্য নেওয়ার চেষ্টা

বিষয়টি নিয়ে অভিযোগের সত্যতা যাচাই করতে সাংবাদিকদের প্রতিনিধিরা সরেজমিনে গিয়ে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলেন। তথ্য সংগ্রহের সময় গোপন ক্যামেরার মাধ্যমে বক্তব্য নেওয়ার চেষ্টা করা হয়। এ সময় সরকারি রেশনিং দোকানের ডিলার মো. দুলাল মিয়া, ঠিকানা—১০, গৈদরটেক, দারুস সালাম, ঢাকা-১২১৬—এর কাছে চাল ও আটা বিক্রির প্রক্রিয়া, বরাদ্দ এবং অনিয়মের অভিযোগ সম্পর্কে জানতে চাওয়া হয়।

সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাবে ডিলার মো. দুলাল মিয়া বলেন, “এত প্রশ্নের উত্তর আমরা আপনাদের দিতে পারব না।”

তাঁর এই বক্তব্যের পর সরকারি বরাদ্দের খাদ্যপণ্য বিক্রির হিসাব ও প্রক্রিয়া নিয়ে আরও প্রশ্ন দেখা দিয়েছে বলে স্থানীয়দের দাবি।

তদারককারীর বক্তব্য নিয়েও প্রশ্ন

রেশনিং দোকানটির তদারকির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট রায়হান ইবনে হোসেনের কাছেও বিষয়টি নিয়ে জানতে চান সাংবাদিকরা। চাল ও আটা বিক্রির নিয়ম, অভিযোগ এবং তদারকির বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি সাংবাদিকদের উদ্দেশে বলেন, “আপনাদের সাংবাদিকদের এত কাজ কী?”

তদারকির দায়িত্বে থাকা একজন ব্যক্তির কাছ থেকে এমন মন্তব্য আসায় স্থানীয়দের মধ্যে নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। তাদের প্রশ্ন—সরকারি খাদ্যপণ্য বিক্রির মতো গুরুত্বপূর্ণ একটি কার্যক্রমে সাংবাদিকরা অনিয়মের অভিযোগ নিয়ে জানতে চাইলে তাতে আপত্তির কারণ কী?

এ.আর.ওর বক্তব্যেও অসন্তোষ

অভিযোগের বিষয়ে এ.আর.ও ডি-৭ মো. আনোয়ার হোসেনের বক্তব্য জানতে যোগাযোগ করা হলে তিনিও সাংবাদিকদের উদ্দেশে বলেন, “আপনাদের জন্যই সব সমস্যা হয়।”

পরে তিনি বিষয়টি দেখবেন বলে জানান।

তবে সংশ্লিষ্টদের এমন বক্তব্যের পরও মূল অভিযোগের বিষয়ে সুনির্দিষ্ট কোনো ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি বলে দাবি সাংবাদিকদের। সরকারি বরাদ্দের চাল ও আটা বিক্রির হিসাব, মজুত এবং প্রকৃত ভোক্তাদের কাছে বিতরণের বিষয়ে স্বচ্ছ তথ্য প্রকাশ করা হলে অভিযোগের সত্যতা সহজেই যাচাই করা সম্ভব বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।

কালোবাজারে বিক্রির অভিযোগ

স্থানীয়দের সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগ হচ্ছে—সরকারি রেশনিং দোকানের মাধ্যমে বিক্রির জন্য বরাদ্দ করা চাল ও আটার একটি অংশ প্রকৃত ভোক্তাদের কাছে বিক্রি না করে একটি চক্রের মাধ্যমে বেশি দামে বাইরে বিক্রি করে দেওয়া হচ্ছে।

অভিযোগকারীদের দাবি, সরকারি মূল্যে বিক্রি করলে যে অর্থ পাওয়া যায়, তার চেয়ে বাজারদরে বেশি দামে বিক্রি করলে অতিরিক্ত লাভের সুযোগ তৈরি হয়। এ কারণেই সরকারি বরাদ্দের পণ্য নির্ধারিত তালিকার সুবিধাভোগীদের কাছে না দিয়ে কালোবাজারে সরিয়ে দেওয়া হচ্ছে কি না, তা তদন্ত করে দেখা প্রয়োজন।

তবে এসব অভিযোগের সত্যতা এখনো স্বাধীনভাবে নিশ্চিত হওয়া যায়নি। অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সরেজমিন তদন্ত, দোকানের মজুত ও বিক্রয় রেজিস্টার পরীক্ষা এবং সুবিধাভোগীদের বক্তব্য নেওয়া জরুরি।

তদারকি ব্যবস্থা কতটা কার্যকর?

সরকারি রেশনিং দোকানের পণ্য বিতরণে তদারকি ব্যবস্থা থাকার পরও যদি বরাদ্দের চাল ও আটা কালোবাজারে যাওয়ার অভিযোগ ওঠে, তাহলে তদারকির কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক।

স্থানীয়দের অভিযোগ, নিয়মিত ও কার্যকর তদারকি থাকলে দোকানে কী পরিমাণ চাল-আটা এসেছে, কতটুকু বিক্রি হয়েছে এবং কতটুকু অবশিষ্ট রয়েছে—এসব হিসাব যাচাই করা সম্ভব। একই সঙ্গে যাদের কাছে পণ্য বিক্রি করা হচ্ছে, তারা প্রকৃত সুবিধাভোগী কি না, সেটিও যাচাই করা যায়।

এ কারণে স্থানীয়রা মনে করছেন, শুধু ডিলারের বক্তব্যের ওপর নির্ভর না করে পুরো বিক্রয় প্রক্রিয়ার নথিপত্র পরীক্ষা করা দরকার। পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট তদারকি কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের দায়িত্ব পালনের বিষয়টিও খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।

আর্থিক সুবিধা নেওয়ার অভিযোগও তদন্তের দাবি

এদিকে স্থানীয় পর্যায়ে আরও একটি অভিযোগ রয়েছে—তদারকির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা অনিয়মের বিষয়ে জেনেও নীরব থাকছেন এবং এর পেছনে কোনো ধরনের আর্থিক সুবিধা বা অন্য কোনো স্বার্থ কাজ করছে কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।

কেউ কেউ অভিযোগ করছেন, তদারকির নামে আর্থিক সুবিধা নেওয়ার কারণে অনিয়মের বিষয়ে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না। তবে এ ধরনের আর্থিক লেনদেনের অভিযোগের পক্ষে এই প্রতিবেদনের হাতে কোনো নির্ভরযোগ্য নথি, লেনদেনের প্রমাণ বা প্রত্যক্ষ প্রমাণ পাওয়া যায়নি। ফলে বিষয়টি নিশ্চিত করার আগে যথাযথ তদন্ত প্রয়োজন।

যদি তদন্তে কোনো ধরনের আর্থিক লেনদেন, দায়িত্বে গাফিলতি বা অনিয়মের প্রমাণ পাওয়া যায়, তাহলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।

হিসাব যাচাই করলেই বেরিয়ে আসতে পারে প্রকৃত চিত্র

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, অভিযোগের সত্যতা যাচাই খুব কঠিন নয়। এজন্য ঢাকা রেশনিং দোকান সেলের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে কয়েকটি বিষয় খতিয়ে দেখতে হবে।

এর মধ্যে রয়েছে—দোকানের বরাদ্দপত্র, চাল ও আটার মজুত রেজিস্টার, দৈনিক বিক্রয় রেজিস্টার, সুবিধাভোগীদের তালিকা, বিক্রয়ের সময় ও পরিমাণ, অবশিষ্ট মজুত এবং সংশ্লিষ্ট ডিলারের কাছে সরকারি পণ্য সরবরাহের হিসাব।

একই সঙ্গে সুবিধাভোগীদের সঙ্গে কথা বললে নির্ধারিত মূল্যে তারা নিয়মিত চাল ও আটা পাচ্ছেন কি না, সে বিষয়টিও পরিষ্কার হবে। দোকানের রেজিস্টারে যে পরিমাণ পণ্য বিক্রির হিসাব দেখানো হয়েছে, বাস্তবে তার সঙ্গে মজুত ও বিক্রয়ের মিল রয়েছে কি না—সেটিও যাচাই করা প্রয়োজন।

স্থানীয়দের দাবি তদন্তের

স্থানীয়দের দাবি, সরকারি খাদ্যপণ্য নিয়ে কোনো ধরনের অনিয়ম হয়ে থাকলে তা দ্রুত বন্ধ করতে হবে। শুধু অভিযোগের ভিত্তিতে কাউকে দায়ী না করে নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা বের করে আনার দাবি জানিয়েছেন তারা।

তাদের মতে, সরকারি রেশনিং ব্যবস্থার উদ্দেশ্য হলো সাধারণ মানুষের কাছে নির্ধারিত মূল্যে খাদ্যপণ্য পৌঁছে দেওয়া। সেই পণ্য যদি প্রকৃত সুবিধাভোগীর হাতে না গিয়ে কালোবাজারে চলে যায়, তাহলে সরকারি কর্মসূচির মূল উদ্দেশ্যই ব্যাহত হবে।

একই সঙ্গে তদারকির দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিরা যদি যথাযথভাবে দায়িত্ব পালন না করেন, তাহলে অনিয়মের সুযোগ আরও বাড়তে পারে। তাই ডিলারের পাশাপাশি তদারকি ব্যবস্থারও জবাবদিহি নিশ্চিত করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।

কর্তৃপক্ষের নজরদারি জরুরি

ঢাকা রেশনিং দোকান সেলের আওতাধীন সরকারি খাদ্যপণ্য বিক্রির ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নিয়মিত পরিদর্শন ও আকস্মিক তদারকি জোরদার করার দাবি উঠেছে।

বিশেষ করে সরকারি বরাদ্দের চাল ও আটা দোকানে পৌঁছানোর পর তা কীভাবে সংরক্ষণ করা হচ্ছে, কোন প্রক্রিয়ায় বিক্রি হচ্ছে এবং প্রতিদিনের বিক্রয় শেষে কতটুকু পণ্য অবশিষ্ট থাকছে—এসব তথ্য নিয়মিত যাচাই করা হলে অনিয়মের সুযোগ অনেকটাই কমে আসবে।

এ বিষয়ে স্থানীয়রা দ্রুত তদন্ত করে অভিযোগের সত্যতা যাচাই এবং অনিয়ম প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।

তবে সরকারি চাল-আটা কালোবাজারে বিক্রি এবং তদারকির নামে আর্থিক সুবিধা নেওয়ার অভিযোগগুলো এখনো অভিযোগের পর্যায়ে রয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তদন্ত ও নথিপত্র যাচাই ছাড়া এসব অভিযোগকে চূড়ান্ত সত্য হিসেবে বিবেচনা করার সুযোগ নেই।

এখন দেখার বিষয়, ঢাকা রেশনিং দোকান সেলের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ অভিযোগগুলো কতটা গুরুত্বের সঙ্গে নেয় এবং সরকারি বরাদ্দের চাল-আটা প্রকৃত সুবিধাভোগীদের কাছে সঠিকভাবে পৌঁছাচ্ছে কি না, তা নিশ্চিত করতে কী ধরনের পদক্ষেপ গ্রহণ করে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *