স্টাফ রিপোর্টার:
চট্টগ্রামের সাতকানিয়া উপজেলায় বন্যাদুর্গত মানুষের জন্য প্রস্তুত করা ত্রাণের চালের বস্তায় বিভিন্ন বছরের পুরোনো সিল ও লেখা থাকার অভিযোগ উঠেছে। একই সঙ্গে এসব বস্তার ছবি ও ভিডিও ধারণ করতে গেলে উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও) মো. আলমগীর সাংবাদিককে বাধা ও ধাক্কা দেওয়ার চেষ্টা করেছেন বলেও অভিযোগ পাওয়া গেছে। ঘটনাটি নিয়ে স্থানীয় সাংবাদিক ও সচেতন মহলে নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
অভিযোগ রয়েছে, ত্রাণের জন্য প্রস্তুত করা কয়েকটি চালের বস্তায় ২০২২, ২০২৪ ও ২০২৫ সালের বিভিন্ন তারিখের সিল দেখা যায়। কিছু বস্তায় ‘শেখ হাসিনার বাংলাদেশ, ক্ষুধা হবে নিরুদ্দেশ’ লেখা রয়েছে। পাশাপাশি কোনো কোনো বস্তায় পুরোনো সিলের ওপর নতুন করে আরেকটি সিল দেওয়ার চিহ্নও দেখা গেছে। এ অবস্থায় দীর্ঘদিন আগের চাল কীভাবে ২০২৬ সালের বন্যাদুর্গত মানুষের জন্য ত্রাণ হিসেবে বিতরণের প্রক্রিয়ায় এলো, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
ঘটনাটি ঘটে গত ১২ জুলাই। পরদিন ১৩ জুলাই বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিতের সাতকানিয়ার ভয়াবহ বন্যাকবলিত এলাকা পরিদর্শন এবং কেঁওচিয়া, বাজালিয়া ও ধর্মপুর এলাকায় ত্রাণসামগ্রী বিতরণের কর্মসূচি থাকায় আগের দিন রাস্তার মাথা মডেল মসজিদের নিচতলায় ত্রাণসামগ্রী প্রস্তুতের কাজ চলছিল।
সেখানে শত শত চালের বস্তা এনে স্বেচ্ছাসেবকদের সহযোগিতায় ১০ কেজি করে ত্রাণের প্যাকেট প্রস্তুত করা হচ্ছিল বলে জানা গেছে। এ সময় সাতকানিয়া উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও) মো. আলমগীরও সেখানে উপস্থিত ছিলেন এবং ত্রাণ প্যাকেট প্রস্তুতের কার্যক্রম তদারকি করছিলেন বলে প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান।
ত্রাণসামগ্রী প্রস্তুতের সময় দৈনিক স্বাধীন সংবাদের প্রতিনিধির নজরে আসে কয়েকটি চালের বস্তা। ওই বস্তাগুলোর গায়ে বিভিন্ন বছর ও তারিখের সিল রয়েছে বলে অভিযোগ করা হয়। বিশেষ করে একটি বস্তায় জানুয়ারি ২০২৪ সালের সিল থাকার পাশাপাশি তার ওপর ২০২৫ সালের সিল দেওয়ার চিহ্ন দেখা যায়। আবার অন্য কয়েকটি বস্তায় ২০২২, ২০২৪ ও ২০২৫ সালের বিভিন্ন মাস ও বছরের উল্লেখ রয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে।
এসব বিষয় সাংবাদিকের নজরে আসার পর তিনি ঘটনার তথ্য-প্রমাণ সংরক্ষণের জন্য চালের বস্তাগুলোর ছবি ও ভিডিও ধারণ করতে থাকেন। অভিযোগ রয়েছে, ছবি ও ভিডিও ধারণের শেষ পর্যায়ে উপজেলা পিআইও মো. আলমগীর সেখানে এসে সাংবাদিককে বাধা দেওয়ার চেষ্টা করেন। একপর্যায়ে তিনি সাংবাদিকের গায়ে হাত দিয়ে ধাক্কা দিয়েছেন বলেও অভিযোগ করা হয়েছে।
ঘটনার সময় উপস্থিত কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, চালের বস্তাগুলোর ছবি ও ভিডিও ধারণের বিষয়টি নিয়ে পিআইওর সঙ্গে সাংবাদিকের কথা কাটাকাটি হয়। সাংবাদিক কেন ছবি ও ভিডিও করতে বাধা দেওয়া হচ্ছে এবং কেন তাকে ধাক্কা দেওয়া হয়েছে—এ বিষয়ে জানতে চাইলে পিআইও মো. আলমগীর কোনো স্পষ্ট ব্যাখ্যা না দিয়ে নীরব থাকেন বলে অভিযোগ।
এ সময় সাংবাদিকের পক্ষ থেকে জানতে চাওয়া হয়, ২০২২, ২০২৪ কিংবা ২০২৫ সালের লেখা ও সিলযুক্ত চালের বস্তা যদি দীর্ঘদিন ধরে সংরক্ষিত হয়ে থাকে, তাহলে সেগুলো ২০২৬ সালের বন্যাদুর্গত মানুষের জন্য ত্রাণ হিসেবে বিতরণের আগে চালের গুণগত মান ও মেয়াদ যাচাই করা হয়েছে কি না। একই সঙ্গে পুরোনো বস্তার ওপর নতুন সিল দেওয়ার কারণ সম্পর্কেও প্রশ্ন তোলা হয়।
জবাবে পিআইও মো. আলমগীর বলেন, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) স্বাক্ষর ও অনুমোদনের ভিত্তিতেই ত্রাণসামগ্রী বিভাজন ও বিতরণ করা হয়ে থাকে বলে তিনি জানান।
তবে প্রশ্ন উঠেছে, কোনো চাল পুরোনো অর্থবছরের বরাদ্দের হলে তা দীর্ঘ সময় ধরে সরকারি স্টকে পড়ে থাকার কারণ কী এবং ওই চালের গুণগত মান পরীক্ষা করা হয়েছিল কি না। পাশাপাশি পুরোনো বস্তায় নতুন সিল দেওয়ার বিষয়টিও তদন্তের দাবি রাখে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
জানা গেছে, ঘটনাস্থলে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও), সহকারী কমিশনার (ভূমি), উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও) মো. আলমগীর, আনসার সদস্য ও স্বেচ্ছাসেবকসহ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা উপস্থিত ছিলেন।
সরকারি ত্রাণ ব্যবস্থাপনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, দুর্যোগের সময় সরকারিভাবে বরাদ্দ করা খাদ্যশস্য সাধারণত নির্ধারিত বরাদ্দ, চালান, স্টক রেজিস্টার ও বিতরণ রেজিস্টারের মাধ্যমে হিসাবভুক্ত করে বিতরণ করা হয়। কোনো পুরোনো মজুত খাদ্যশস্য পরবর্তী সময়ে বিতরণ করতে হলে তার সংরক্ষণ, গুণগত মান, মেয়াদ, মজুতের হিসাব এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমোদনের বিষয়গুলো যথাযথভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।
ওই কর্মকর্তা আরও বলেন, সরকারি খাদ্যশস্যের স্টক দীর্ঘদিন ধরে পড়ে থাকলে সেটি বিতরণের আগে গুণগত মান পরীক্ষা এবং সংশ্লিষ্ট নথিপত্র যাচাই করা জরুরি। পুরোনো চাল নতুন বরাদ্দের সঙ্গে কীভাবে সমন্বয় করা হয়েছে, তা স্টক রেজিস্টার, চালান ও বিতরণ রেজিস্টার পর্যালোচনা করলেই পরিষ্কার হবে।
এদিকে স্থানীয় পর্যায়ে প্রশ্ন উঠেছে, ২০২২, ২০২৪ ও ২০২৫ সালের সিলযুক্ত বস্তা যদি সত্যিই ২০২৬ সালের বন্যাদুর্গত মানুষের মধ্যে বিতরণ করা হয়ে থাকে, তাহলে সেগুলোর প্রকৃত বরাদ্দের বছর, মজুতের সময়কাল এবং বিতরণের অনুমোদন কী ছিল—তা তদন্ত করা প্রয়োজন। বিশেষ করে বস্তার গায়ে একাধিক বছরের সিল থাকার বিষয়টি স্বচ্ছভাবে ব্যাখ্যা করার দাবি উঠেছে।
অন্যদিকে ত্রাণের চালের বস্তার ছবি ও ভিডিও ধারণে সাংবাদিককে বাধা দেওয়ার অভিযোগ নিয়েও ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন স্থানীয় সাংবাদিকরা। তাদের বক্তব্য, সরকারি ত্রাণ কার্যক্রম জনস্বার্থের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত। তাই ত্রাণসামগ্রী, বস্তার সিল, বরাদ্দ ও বিতরণ প্রক্রিয়া সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহে সাংবাদিকদের বাধা দেওয়া হলে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়।
তবে পুরো বিষয়টি নিয়ে পিআইও মো. আলমগীরের বক্তব্যের পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট উপজেলা প্রশাসনের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য জানা জরুরি। পুরোনো বস্তার চাল কেন বিতরণ করা হয়েছে, কোন অর্থবছরের বরাদ্দ থেকে চালগুলো এসেছে, কতদিন ধরে সেগুলো মজুত ছিল, গুণগত মান পরীক্ষা করা হয়েছিল কি না এবং একাধিক বছরের সিল থাকার কারণ কী—এসব বিষয়ে প্রশাসনিক তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত তথ্য বেরিয়ে আসতে পারে।
সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, বন্যার মতো দুর্যোগপূর্ণ সময়ে ত্রাণের চাল নিয়ে কোনো ধরনের অনিয়ম, অব্যবস্থাপনা কিংবা হিসাবের অসঙ্গতি থাকলে তা দ্রুত তদন্ত করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে ত্রাণসামগ্রীর গুণগত মান নিশ্চিত করে প্রকৃত বন্যাদুর্গত মানুষের কাছে নিরাপদ খাদ্য পৌঁছে দেওয়ার বিষয়টি সর্বোচ্চ গুরুত্ব পাওয়া উচিত।
এ ঘটনায় ত্রাণের চালের বস্তার সিল ও তারিখ, স্টক রেজিস্টার, বরাদ্দপত্র, চালান, বিতরণ তালিকা এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের নথিপত্র যাচাই করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় সচেতন মহল। পাশাপাশি সাংবাদিককে ছবি ও ভিডিও ধারণে বাধা এবং ধাক্কা দেওয়ার অভিযোগেরও নিরপেক্ষ তদন্ত দাবি করা হয়েছে।