এসেনশিয়াল ড্রাগসে অস্থিরতার অভিযোগ: গোপন বৈঠক ও সরকারবিরোধী ষড়যন্ত্রের দাবি; তদন্তে প্রশাসনের হস্তক্ষেপ চাইলেন সংশ্লিষ্টরা

স্টাফ রিপোর্টার:

রাষ্ট্রায়ত্ত ও জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ ওষুধ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান এসেনশিয়াল ড্রাগস কোম্পানি লিমিটেড (ইডিসিএল)-কে ঘিরে নতুন করে নানা অভিযোগ সামনে এসেছে। অভিযোগকারীদের দাবি, প্রতিষ্ঠানের ভেতরে ও বাইরে একটি সংঘবদ্ধ চক্র পরিকল্পিতভাবে অস্থিরতা সৃষ্টি, কর্মপরিবেশ নষ্ট এবং প্রতিষ্ঠানকে বিতর্কের মুখে ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা করছে। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, এসব কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে বর্তমান সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করারও অপচেষ্টা চলছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, বিষয়টি জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তা ও কার্যক্রমের সঙ্গে সম্পৃক্ত হওয়ায় দ্রুত তদন্ত হওয়া প্রয়োজন।

সরকারবিরোধী ষড়যন্ত্রের অভিযোগ

অভিযোগকারীদের দাবি, আওয়ামী লীগপন্থী সাবেক ও বর্তমান কয়েকজন কর্মচারী এবং কিছু সুবিধাবাদী ব্যক্তি নিজেদের স্বার্থ রক্ষায় একত্রিত হয়ে প্রতিষ্ঠানে অস্থিতিশীল পরিবেশ তৈরির চেষ্টা করছেন। তাদের অভিযোগ, কর্মচারীদের মধ্যে বিভাজন সৃষ্টি, উৎপাদন কার্যক্রমে প্রভাব বিস্তার এবং প্রশাসনকে চাপে ফেলার মাধ্যমে সরকারকে বিব্রত করার একটি পরিকল্পনা বাস্তবায়নের চেষ্টা চলছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রের ভাষ্য, দেশের সরকারি হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যসেবা খাতে ওষুধ সরবরাহে এসেনশিয়াল ড্রাগস গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ফলে এখানে যেকোনো ধরনের অস্থিরতা সৃষ্টি হলে তা সরাসরি জাতীয় স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থার ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।

অভিযোগে বলা হয়েছে, আবু নসের নামে এক ব্যক্তি নিজেকে শ্রমিক দলের নেতা পরিচয় দিয়ে প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরে একটি কমিটি গঠন করেছেন। অভিযোগকারীদের দাবি, শ্রমিক দলের সমন্বয় কমিটি গঠনের জন্য এসেনশিয়াল ড্রাগস কোম্পানি লিমিটেডের রেজিস্ট্রেশন নম্বর বি-১৯২৯ উল্লেখ করা হয়েছে। তবে শ্রম অধিদপ্তরের কোনো অনুমোদিত কমিটি বা পরিচালনার জন্য শ্রম অধিদপ্তর থেকে কোনো নির্দেশনা দেওয়া হয়নি বলে অভিযোগকারীরা দাবি করেছেন।

তবুও তিনি বিভিন্ন কর্মচারীর ওপর প্রভাব বিস্তার এবং প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরে নিজস্ব বলয় তৈরির চেষ্টা করছেন বলে অভিযোগ করা হয়েছে।

অভিযোগকারীদের মতে, এই কমিটির মাধ্যমে প্রশাসনের ওপর চাপ সৃষ্টি এবং প্রতিষ্ঠানের স্বাভাবিক কার্যক্রমে প্রভাব বিস্তারেরও চেষ্টা চলছে।

অভিযোগকারীদের দাবি, আবু নসেরের বিরুদ্ধে অতীতেও প্রতারণা-সংশ্লিষ্ট একটি অভিযোগ রয়েছে। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, বগুড়া গোয়েন্দা পুলিশের একটি বিশেষ অভিযানে বিপুল পরিমাণ প্রাচীন ধাতব মুদ্রা, তিনটি কথিত নকল ধাতব মেটালসহ আন্তর্জাতিক প্রতারক চক্রের সদস্যদের গ্রেপ্তারের ঘটনায় তার নামও উঠে আসে।

কয়েকজন বিতর্কিত ব্যক্তির সম্পৃক্ততার অভিযোগ

সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, এই কর্মকাণ্ডে কাওসার ও প্রচার-প্রকাশন সম্পাদক, সাবেক শ্রমিক লীগ নেতা সেলিম উজ্জামান (বগুড়া) দায়িত্ব পালন করেছেন। এছাড়া হারুনসহ আরও কয়েকজন বহিষ্কৃত বা বিতর্কিত ব্যক্তি যুক্ত রয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

অভিযোগকারীদের ভাষ্য, এসব ব্যক্তি নিয়মিত যোগাযোগের মাধ্যমে বিভিন্ন পরিকল্পনা গ্রহণ করছেন। তবে এই অভিযোগগুলোর স্বাধীন সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি এবং সংশ্লিষ্টদের বক্তব্যও পাওয়া যায়নি।

গোপন বৈঠক ও কথিত অডিও নিয়ে আলোচনা

অভিযোগকারীরা দাবি করেছেন, সম্প্রতি একাধিক গোপন বৈঠকে প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে বিভিন্ন কর্মসূচি এবং অস্থিরতা তৈরির পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা হয়েছে।

তাদের দাবি, এসব বৈঠকের একটি কথিত অডিও রেকর্ড ইতোমধ্যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও সংশ্লিষ্ট মহলে ছড়িয়ে পড়েছে। ওই অডিওতে লিফলেট বিতরণ, বিভিন্ন কৌশল গ্রহণ এবং প্রতিষ্ঠানবিরোধী কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা রয়েছে বলে অভিযোগ করা হয়েছে।

তবে এই প্রতিবেদনের জন্য ওই অডিওর উৎস বা সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

পুরোনো অভিযোগও সামনে

অভিযোগকারীদের দাবি, এই চক্রের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট এক সাবেক শ্রমিক নেতার বিরুদ্ধে অতীতেও অবৈধ নিয়োগ, বদলি-বাণিজ্য এবং আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ উঠেছিল।

এছাড়া তার ও পরিবারের সদস্যদের নামে রাজধানীর মগবাজার ও মধুবাগ এলাকায় আবাসিক সম্পদ, মোহাম্মদপুরের বসিলা এলাকায় জমিসহ বগুড়ার শাহজাহানপুর উপজেলায় বিপুল পরিমাণ সম্পদের মালিকানার অভিযোগও করা হয়েছে।

অভিযোগকারীদের আরও দাবি, রাজধানীর মগবাজার-মধুবাগ এলাকায় ‘সিনহা রেন্ট এ কার’ নামে একটি ব্যবসার সঙ্গেও তার সম্পৃক্ততা রয়েছে।

গোপন বৈঠকের স্থান নিয়েও দাবি

সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, রাজধানীর মধুবাগ এলাকায় অবস্থিত একটি কার্যালয়ে নিয়মিত বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। অভিযোগকারীদের মতে, এসব বৈঠকে কয়েকজন সাবেক ও বর্তমান কর্মচারী অংশ নেন এবং প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে বিভিন্ন কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা করেন।

প্রশাসনের নজরদারি ও তদন্তের দাবি

অভিযোগকারীদের মতে, এসেনশিয়াল ড্রাগস দেশের স্বাস্থ্যখাতের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রতিষ্ঠান। তাই প্রতিষ্ঠানের উৎপাদন কার্যক্রম ব্যাহত করার যেকোনো প্রচেষ্টা প্রতিরোধে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।

তারা র‍্যাব, পুলিশ, ডিবি, সংশ্লিষ্ট গোয়েন্দা সংস্থা এবং স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের প্রতি অভিযোগগুলো নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করার আহ্বান জানিয়েছেন। তাদের দাবি, কথিত অডিও, নথিপত্র ও অন্যান্য তথ্যপ্রমাণ থাকলে সেগুলো ফরেনসিক পরীক্ষার মাধ্যমে যাচাই করে প্রকৃত ঘটনা উদঘাটন করা উচিত।

এছাড়া আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নিয়মিত নজরদারি জোরদার করে জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ এই প্রতিষ্ঠানের স্বাভাবিক উৎপাদন ও কার্যক্রম অব্যাহত রাখতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ারও দাবি জানানো হয়েছে।

এ ব্যাপারে অভিযুক্ত আবু নসের ও সেলিম উজ্জামানকে একাধিকবার ফোন করা হলেও তারা ফোন রিসিভ করেননি। পরে খুদে বার্তা পাঠানো হলেও তারা কোনো জবাব দেননি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *