স্টাফ রিপোর্টার:
রাজধানীর মোহাম্মদপুর এলাকায় নিম্নআয়ের ও অসহায় মানুষের জন্য বরাদ্দকৃত চাল ও আটা বিতরণে অনিয়মের আশঙ্কা এবং সাংবাদিকদের হুমকি দেওয়ার অভিযোগকে কেন্দ্র করে চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। সংশ্লিষ্ট বিক্রয়কেন্দ্রগুলোর তদারককারী কর্মকর্তাদের সতর্ক করার পরপরই অভিযুক্ত ডিলারদের পক্ষ থেকে সাংবাদিকদের হুমকি দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। এতে পুরো বিষয়টি নিয়ে সংশ্লিষ্ট তদারককারী কর্মকর্তাদের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, মোঃ আইয়ুব মন্ডল নামে এক ডিলারের বিক্রয়স্থল জাপান গার্ডেন সিটির উত্তর পাশে অবস্থিত। ওই বিক্রয়স্থলের তদারককারী কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন তহমিনা আক্তার। অন্যদিকে, ডিলার জুবায়েদ হোসেনের বিক্রয়স্থল বসিলা ৪০ ফুট রাস্তার সামনে, মোহাম্মদপুর এলাকায়। সেখানে তদারককারী কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্বে রয়েছেন তাহমিনা আবেদীন।
স্থানীয় পর্যায়ে সরকারি খাদ্য সহায়তার আওতায় দরিদ্র ও নিম্নআয়ের মানুষের জন্য বরাদ্দকৃত চাল ও আটা যথাযথভাবে বিতরণ হচ্ছে কি না, তা নিয়ে বিভিন্ন সময় নানা অভিযোগ ওঠে। এ ধরনের অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে সাংবাদিকরা সংশ্লিষ্ট বিক্রয়কেন্দ্রগুলোর কার্যক্রমের বিষয়ে খোঁজ নিতে গিয়ে সম্ভাব্য অনিয়ম ও খাদ্যসামগ্রী আত্মসাৎ বা চুরির আশঙ্কার বিষয়টি তদারককারী কর্মকর্তাদের অবহিত করেন বলে দাবি করেছেন।
সাংবাদিকদের ভাষ্য, তারা সংশ্লিষ্ট তদারককারী কর্মকর্তাদের সরাসরি সতর্ক করে বলেন, বিক্রয়কেন্দ্রগুলোতে দরিদ্র মানুষের জন্য বরাদ্দকৃত চাল ও আটা যাতে কোনোভাবেই অন্যত্র সরিয়ে নেওয়া, আত্মসাৎ কিংবা চুরি না হয়, সে বিষয়ে কঠোর নজরদারি প্রয়োজন। একই সঙ্গে বরাদ্দ, মজুত, বিক্রয় ও বিতরণের হিসাব যথাযথভাবে সংরক্ষণ এবং প্রকৃত উপকারভোগীদের কাছে খাদ্যসামগ্রী পৌঁছাচ্ছে কি না, তা নিশ্চিত করার কথাও বলা হয়।
কিন্তু সাংবাদিকদের অভিযোগ, তদারককারী কর্মকর্তাদের বিষয়টি জানানোর কিছুক্ষণ পরই সংশ্লিষ্ট ডিলারদের পক্ষ থেকে সাংবাদিকদের ফোন করে ও বিভিন্নভাবে হুমকি দেওয়া শুরু হয়। সাংবাদিকদের দাবি, তদারককারীদের সতর্ক করার বিষয়টি যদি ডিলারদের কাছে পৌঁছেই না থাকে, তাহলে এত অল্প সময়ের মধ্যে অভিযুক্ত ডিলাররা কীভাবে সাংবাদিকদের বিষয়ে জানতে পারলেন—এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজে দেখা প্রয়োজন।
এ ঘটনায় সাংবাদিকদের মধ্যে সন্দেহ তৈরি হয়েছে যে, তদারককারী কর্মকর্তাদের সঙ্গে বিষয়টি জানানোর পর সেই তথ্য সংশ্লিষ্ট ডিলারদের কাছে পৌঁছে দেওয়া হয়েছে কি না। আর যদি সত্যিই তদারককারী কর্মকর্তাদের কেউ সাংবাদিকদের পরিচয় বা তাদের দেওয়া তথ্য ডিলারদের কাছে প্রকাশ করে থাকেন, তাহলে সরকারি খাদ্য বিতরণ কার্যক্রমের নিরপেক্ষ তদারকি নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
সাংবাদিকদের অভিযোগ, কোনো সরকারি খাদ্য কর্মসূচির বিক্রয়কেন্দ্রে অনিয়মের আশঙ্কা দেখা দিলে তা যাচাই-বাছাই করে দেখা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব। সাংবাদিকরা কোনো অনিয়মের তথ্য পেলে সেটি সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের অবহিত করতে পারেন। কিন্তু অভিযোগ জানানোর পর যদি সেই তথ্য অভিযুক্তদের কাছে পৌঁছে যায় এবং পরবর্তীতে সাংবাদিকদের হুমকি বা ভয়ভীতি প্রদর্শনের ঘটনা ঘটে, তাহলে বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা প্রয়োজন।
সাংবাদিকদের আরও অভিযোগ, দরিদ্র মানুষের জন্য বরাদ্দকৃত চাল ও আটা নিয়ে কোনো ধরনের অনিয়ম বা আত্মসাতের সুযোগ থাকলে তার সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হবে প্রকৃত উপকারভোগীদের। যারা সরকারি খাদ্য সহায়তার ওপর নির্ভরশীল, তাদের প্রাপ্য খাদ্যসামগ্রী অন্যত্র চলে গেলে তারা সরাসরি বঞ্চিত হবেন। ফলে এসব বিক্রয়কেন্দ্রে খাদ্যসামগ্রীর মজুত, বিতরণ পদ্ধতি, উপকারভোগীদের তালিকা, বরাদ্দের পরিমাণ এবং বিক্রয়সংক্রান্ত হিসাব নিয়মিত যাচাই করা জরুরি।
এদিকে সাংবাদিকদের হুমকি দেওয়ার অভিযোগও বিষয়টিকে আরও গুরুতর করে তুলেছে। সাংবাদিকরা বলছেন, কোনো অনিয়মের অভিযোগের সত্যতা যাচাই করা এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বক্তব্য নেওয়া সাংবাদিকতার স্বাভাবিক দায়িত্বের অংশ। এ কারণে কোনো সাংবাদিককে ভয়ভীতি বা হুমকি দিয়ে সংবাদ প্রকাশ থেকে বিরত রাখার চেষ্টা করা হলে তা স্বাধীন সাংবাদিকতার পরিবেশকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, অভিযোগের সত্যতা যাচাই করতে হলে সংশ্লিষ্ট ডিলারদের বিক্রয়কেন্দ্রে সরেজমিন তদন্ত করা প্রয়োজন। পাশাপাশি নির্ধারিত বরাদ্দ অনুযায়ী কত পরিমাণ চাল ও আটা এসেছে, কতটুকু বিতরণ করা হয়েছে, কতটুকু মজুত রয়েছে এবং কারা কারা খাদ্যসামগ্রী পেয়েছেন—এসব তথ্য যাচাই করা দরকার। একই সঙ্গে বিক্রয় রেজিস্টার, মজুত খাতা, উপকারভোগীদের তালিকা ও বিতরণসংক্রান্ত নথিপত্র পরীক্ষা করলেই প্রকৃত চিত্র বেরিয়ে আসতে পারে বলে মনে করছেন সাংবাদিকরা।
এছাড়া তদারককারী কর্মকর্তা তহমিনা আক্তার ও তাহমিনা আবেদীন সংশ্লিষ্ট বিক্রয়কেন্দ্রগুলোর কার্যক্রম কীভাবে পর্যবেক্ষণ করছেন, নিয়মিত পরিদর্শন করছেন কি না এবং কোনো অনিয়ম ধরা পড়লে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে—এসব বিষয়ও খতিয়ে দেখার দাবি উঠেছে।
সাংবাদিকদের দাবি, তারা কোনো ডিলারকে আগে থেকেই অভিযুক্ত করছেন না; বরং দরিদ্র মানুষের জন্য বরাদ্দকৃত খাদ্যসামগ্রী সঠিকভাবে বিতরণ হচ্ছে কি না, সেটি নিশ্চিত করার স্বার্থেই বিষয়টি সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের নজরে আনা হয়েছে। অভিযোগের সত্যতা থাকলে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া এবং অভিযোগ ভিত্তিহীন হলে তদন্তের মাধ্যমে তা পরিষ্কার করা—দুটিই প্রশাসনের দায়িত্ব।
এ ঘটনায় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে দ্রুত তদন্ত করে প্রকৃত ঘটনা উদঘাটনের দাবি জানিয়েছেন সাংবাদিকরা। পাশাপাশি সাংবাদিকদের হুমকি দেওয়ার অভিযোগেরও তদন্ত করে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানানো হয়েছে।
তবে মোঃ আইয়ুব মন্ডল, জুবায়েদ হোসেন এবং তদারককারী কর্মকর্তা তহমিনা আক্তার ও তাহমিনা আবেদীনের বক্তব্য তাৎক্ষণিকভাবে পাওয়া যায়নি। তাদের বক্তব্য পাওয়া গেলে তা গুরুত্বসহকারে পরবর্তী প্রতিবেদনে প্রকাশ করা হবে।