“জুলাইয়ের ঐক্যই বদলে দিয়েছে বাংলাদেশের ইতিহাস, শহীদদের স্বপ্ন পূরণে সহনশীল গণতন্ত্রের বিকল্প নেই” : রাশেদ খাঁন

মোঃআনজার শাহ

আজ ৫ আগস্ট (বুধবার) রাজধানীর চীন মৈত্রী আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থান দিবস-২০২৬’ উপলক্ষে আয়োজিত রাষ্ট্রীয় আলোচনা সভা ও সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক সহকারী রাশেদ খাঁন বলেছেন, “জুলাই ছিল জাতির ঐক্যের বিজয়। এই ঐক্যের শক্তিতেই স্বৈরশাসনের অবসান ঘটেছে। এখন শহীদদের স্বপ্নের বাংলাদেশ গড়তে সহনশীলতা, গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি ও জাতীয় সংহতির কোনো বিকল্প নেই।”

জুলাই গণঅভ্যুত্থানের শহীদ ও যোদ্ধাদের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি প্রদানের এ আয়োজনে মহামান্য রাষ্ট্রপতি হাফিজউদ্দিন আহমেদ, বীর বিক্রম, সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি), বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী, জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)-সহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের শীর্ষ নেতৃবৃন্দ, জুলাই যোদ্ধা, শহীদ পরিবারের সদস্য এবং দেশের বিশিষ্ট ব্যক্তিরা উপস্থিত ছিলেন।

বক্তব্যের শুরুতেই রাশেদ খাঁন উপস্থিত অতিথিদের শুভেচ্ছা জানিয়ে বলেন, জুলাইয়ের শহীদ ও যোদ্ধাদের আত্মত্যাগকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় সম্মান জানানো জাতির নৈতিক দায়িত্ব। তিনি বলেন, এটি কোনো দলীয় আয়োজন নয়; বরং রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তানদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদনের একটি সর্বজনীন অনুষ্ঠান। তাই এ ধরনের আয়োজনে রাজনৈতিক বিতর্ক নয়, জাতীয় ঐক্য ও কৃতজ্ঞতার বার্তাই প্রধান হয়ে উঠা উচিত।

অনুষ্ঠানের শুরুতে উপস্থিত কিছু মানুষের প্রতিক্রিয়া ও মতপার্থক্যের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে ভিন্নমত প্রকাশের অধিকারই সবচেয়ে বড় অর্জন। মানুষের কণ্ঠ রুদ্ধ না হয়ে স্বাধীনভাবে উচ্চারিত হওয়াই নতুন বাংলাদেশের শক্তি। তিনি বলেন, “মানুষ আজ নিজের কথা বলতে পারছে, মতামত প্রকাশ করতে পারছে। এই বাকস্বাধীনতাই আমাদের গণতান্ত্রিক অভিযাত্রার সবচেয়ে বড় অর্জন।”

মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রীর দুঃখ প্রকাশের বিষয়টি উল্লেখ করে রাশেদ খাঁন বলেন, ভুল হলে তা স্বীকার করে সংশোধনের যে রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ে উঠছে, সেটিই নতুন বাংলাদেশের ইতিবাচক পরিবর্তনের প্রতীক। আত্মসমালোচনার এই চর্চা গণতন্ত্রকে আরও পরিণত ও শক্তিশালী করবে বলেও তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।

জুলাই শহীদ পরিবার ও যোদ্ধাদের উদ্দেশে তিনি বলেন, তাঁদের অনেক প্রত্যাশা, বেদনা, ক্ষোভ ও অভিমান রয়েছে, যা সম্পূর্ণ যৌক্তিক। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় সব প্রত্যাশা পূরণ সম্ভব হয়নি। তবে বর্তমান সরকার জনগণের প্রত্যাশা পূরণে আন্তরিকভাবে কাজ করছে। তিনি আশা প্রকাশ করেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে শহীদ পরিবার, জুলাই যোদ্ধা এবং দেশের মানুষের ন্যায্য দাবিগুলো পর্যায়ক্রমে বাস্তবায়িত হবে।

জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পটভূমি তুলে ধরে রাশেদ খাঁন বলেন, আন্দোলনের নেপথ্যে ছাত্রসমাজ, রাজনৈতিক দল এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে নিবিড় সমন্বয় ছিল। তিনি দাবি করেন, নির্বাসনে অবস্থান করেও বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান আন্দোলনের রাজনৈতিক দিকনির্দেশনা ও সমন্বয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন।

তিনি আরও বলেন, বর্তমান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীও সে সময় বিভিন্ন রাজনৈতিক শক্তির সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ ও সমন্বয়ের দায়িত্ব পালন করেন। এনসিপির সদস্যসচিব আখতার হোসেন, জামায়াতে ইসলামীর নেতা আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ তাহেরসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক নেতৃত্বের সঙ্গে সমন্বয়ের বিষয়টিও তিনি বক্তব্যে তুলে ধরেন। একই সময়ে হেফাজতে ইসলামের সঙ্গেও প্রয়োজনীয় যোগাযোগ রক্ষা করা হয়েছিল বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

রাশেদ খাঁন বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থান কোনো ব্যক্তি বা একক রাজনৈতিক দলের কৃতিত্ব নয়; এটি ছিল সমগ্র জাতির সম্মিলিত সংগ্রাম। আন্দোলনের পর রাজনৈতিক বাস্তবতায় মত ও পথ ভিন্ন হতে পারে, কিন্তু রাষ্ট্র ও জনগণের স্বার্থে পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ, সহনশীলতা এবং গণতান্ত্রিক আচরণ বজায় রাখাই সময়ের দাবি।

তিনি বলেন, “গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে সরকার থাকবে, বিরোধী দলও থাকবে। মতের ভিন্নতা থাকবে, কিন্তু জাতীয় স্বার্থে সহনশীলতার সংস্কৃতি হারিয়ে গেলে গণতন্ত্রের সৌন্দর্যও ম্লান হয়ে যাবে।”

জুলাই শহীদদের স্মরণ করে তিনি বলেন, “যেভাবে ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের বীর শহীদ ও মুক্তিযোদ্ধাদের ইতিহাসের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে স্মরণ করা হয়, ঠিক একইভাবে ২০২৪ সালের জুলাইয়ের শহীদ ও যোদ্ধাদেরও রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় স্মরণ করতে হবে। তাঁদের আত্মত্যাগই নতুন বাংলাদেশের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছে।”

বক্তব্যের শেষাংশে রাশেদ খাঁন গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে জুলাই শহীদ পরিবার ও জুলাই যোদ্ধাদের স্মরণ করেন। তিনি বলেন, তাঁদের আত্মত্যাগের বিনিময়েই বাংলাদেশ একটি নতুন সম্ভাবনার দ্বারপ্রান্তে পৌঁছেছে। শহীদদের স্বপ্নের ন্যায়ভিত্তিক, মানবিক ও গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ গড়ে তোলাই হবে তাঁদের প্রতি জাতির সর্বোচ্চ শ্রদ্ধাঞ্জলি।

জাতীয় ঐক্য, সামাজিক সম্প্রীতি এবং গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ সমুন্নত রাখার আহ্বান জানিয়ে তিনি তাঁর বক্তব্য শেষ করেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *