মোহাম্মদ হোসেন হ্যাপী:
নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজারে আলোচিত মিশুকচালক ওয়ালি উল্লাহ (২০) হত্যাকাণ্ডের মূল রহস্য উদঘাটনের দাবি করেছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। এ ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে দুই আসামিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে ছিনতাই হওয়া মিশুক ও নিহতের ব্যবহৃত মোবাইল ফোন উদ্ধার করা হয়েছে। এ ছাড়া গ্রেপ্তার দুই আসামির একজন আদালতে হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করে জবানবন্দি দিয়েছেন।
রোববার (৯ আগস্ট) দুপুর ১২টায় পিবিআই নারায়ণগঞ্জ জেলা কার্যালয়ে আয়োজিত এক প্রেস ব্রিফিংয়ে এসব তথ্য জানানো হয়।
পিবিআই সূত্রে জানা গেছে, নিহত ওয়ালি উল্লাহ নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁও এলাকার বাসিন্দা। তার বাবা অসুস্থ থাকায় গত ৫ জুলাই ২০২৬ দুপুর আনুমানিক ২টার দিকে বাবার অটোরিকশা (মিশুক) নিয়ে চালানোর উদ্দেশ্যে বাড়ি থেকে বের হন তিনি। এরপর তার মোবাইল ফোন বন্ধ পাওয়া যায়। বিভিন্ন স্থানে খোঁজ করেও তাকে না পেয়ে পরদিন ৬ জুলাই সকালে তার স্বজন সোনারগাঁও থানায় নিখোঁজের অভিযোগ করেন।
ওই দিন বিকেলে নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজার উপজেলার উচিতপুরা ইউনিয়নের গ্রুপদী গ্রামের একটি নির্জন স্থানে লাশ পড়ে থাকার খবর পাওয়া যায়। খবর পেয়ে পরিবারের সদস্যরা ঘটনাস্থলে গিয়ে লাশটি ওয়ালি উল্লাহর বলে শনাক্ত করেন।
পিবিআইয়ের তথ্য অনুযায়ী, নিহতের গলার বাম পাশে, কানের নিচে গভীর রক্তাক্ত জখম ছিল। তার বাম চোখ উপড়ে ফেলার চিহ্ন এবং পেটের ওপরের অংশে ধারালো অস্ত্রের আঘাত ছিল। পিঠের কোমরের ওপরের অংশেও গভীর ক্ষত পাওয়া যায়।
এ ঘটনায় নিহতের বাবা মো. হারুন রশিদ (৫৯) বাদী হয়ে অজ্ঞাতনামা ৫-৬ জনের বিরুদ্ধে আড়াইহাজার থানায় মামলা করেন। মামলাটির নম্বর-১২, তারিখ ৭ জুলাই ২০২৬। এতে দণ্ডবিধির ৩০২, ২০১ ও ৩৪ ধারায় মামলা করা হয়।
পিবিআইয়ের ছায়া তদন্ত শুরু
মামলার পর পিবিআই নারায়ণগঞ্জের ক্রাইম সিন টিম-৬ হত্যাকাণ্ডের ছায়া তদন্ত শুরু করে। পরবর্তী সময়ে মামলাটি পিবিআইয়ের তফসিলভুক্ত হওয়ায় ৩ আগস্ট ২০২৬ তারিখে পিবিআই নারায়ণগঞ্জ স্ব-উদ্যোগে মামলাটি অধিগ্রহণ করে। এসআই (নিঃ) পুলক সরকারকে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়।
পিবিআই প্রধান অ্যাডিশনাল আইজিপি মো. মোস্তফা কামালের তত্ত্বাবধান ও দিকনির্দেশনায় এবং পিবিআই নারায়ণগঞ্জ জেলার ইউনিট ইনচার্জ পুলিশ সুপার মো. মোস্তফা কামাল রাশেদ (বিপিএম)-এর প্রত্যক্ষ ও সার্বিক সহযোগিতায় তদন্ত কার্যক্রম পরিচালিত হয়।
তদন্ত কর্মকর্তা এসআই (নিঃ) পুলক সরকারের নেতৃত্বে পিবিআইয়ের একটি দল তথ্যপ্রযুক্তিগত বিশ্লেষণ, সিসিটিভি ফুটেজ পর্যালোচনা, হত্যাকাণ্ডের ঘটনাস্থল এবং সেখানে যাতায়াতের বিভিন্ন রুট বিশ্লেষণ ও গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে সন্দেহভাজনদের শনাক্ত করে।
যেভাবে গ্রেপ্তার দুই আসামি
পিবিআই জানায়, হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার সন্দেহে মো. আওলাদ হোসেন (২৬), পিতা মো. আব্দুল লতিফ, মাতা আনোয়ারা, সাং-বড় আলমদী, পোস্ট-বারদী, থানা-সোনারগাঁও, জেলা-নারায়ণগঞ্জকে গত ২ আগস্ট রাত ১০টার দিকে তার নিজ বাড়ি থেকে গ্রেপ্তার করা হয়।
তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে সোনারগাঁও থানার বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালিয়ে একই ঘটনায় জড়িত সন্দেহে মো. শাহিন (৩১), পিতা মৃত আব্দুস ছোবহান, মাতা মোছা. ছানোয়ারা বেগম, সাং-চরভুলুয়া (আলমনী), থানা-সোনারগাঁও, জেলা-নারায়ণগঞ্জকে ২ আগস্ট রাত ১০টা ৫০ মিনিটে আলমদী এলাকার তার নিজ বাড়ি থেকে গ্রেপ্তার করা হয়।
গ্রেপ্তারের পর আসামিদের প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদ শেষে ৩ আগস্ট আদালতে হাজির করে সাত দিনের পুলিশ রিমান্ডের আবেদন করা হয়। আদালত পাঁচ দিনের পুলিশ রিমান্ড মঞ্জুর করেন।
রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদে আসামিরা হত্যাকাণ্ড সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দেয় বলে জানিয়েছে পিবিআই।
উদ্ধার নিহতের মোবাইল ও মিশুক
পিবিআই জানায়, গ্রেপ্তার আসামিদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে গত ৬ আগস্ট বিকেল ৫টার দিকে শাহিনের নিজ বসতঘর থেকে নিহত ওয়ালি উল্লাহর ব্যবহৃত স্যামসাং মোবাইল ফোন ও একটি বাংলালিংক সিম উদ্ধার করা হয়।
পরবর্তী সময়ে আসামিদের আরও জিজ্ঞাসাবাদ করা হলে তাদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে গত ৭ আগস্ট রাত ১০টার দিকে মুন্সীগঞ্জ জেলার গজারিয়া থানাধীন ভবেরচর এলাকা থেকে নিহতের ছিনতাই হওয়া মিশুকটি উদ্ধার করা হয়।
পিবিআইয়ের ভাষ্যে হত্যার কারণ
পিবিআইয়ের তদন্তে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, গ্রেপ্তার দুই আসামিসহ আরও ৪-৫ জন অজ্ঞাতনামা ব্যক্তি পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ী ওয়ালি উল্লাহর মিশুক ছিনতাই করার পরিকল্পনা করে।
পরিকল্পনা অনুযায়ী তারা নারায়ণগঞ্জের বারদী অটোস্ট্যান্ড থেকে আড়াইহাজার থানাধীন সুলতানশাদী বাজারে যাওয়ার জন্য ওয়ালি উল্লাহর মিশুক ভাড়া করে। মিশুকটি নিয়ে তারা সুলতানশাদী বাজারে যায়। পরে ফেরার পথে সন্ধ্যার সময় তারা ওয়ালি উল্লাহকে আড়াইহাজার উপজেলার উচিতপুরা ইউনিয়নের গ্রুপদী গ্রামের একটি নির্জন স্থানে নিয়ে যায় বলে পিবিআই জানিয়েছে।
সেখানে তাকে ছুরিকাঘাত করে গুরুতর জখম করা হয়। পরে তার মৃত্যু নিশ্চিত হওয়ার পর মিশুক ও ব্যবহৃত স্যামসাং মোবাইল ফোন নিয়ে যায় আসামিরা। এরপর মিশুকটি মুন্সীগঞ্জের গজারিয়া উপজেলার ভবেরচর এলাকায় নিয়ে গিয়ে বিক্রি করে দেওয়া হয় বলে তদন্তে উঠে এসেছে।
আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি
পাঁচ দিনের পুলিশ রিমান্ড শেষে গত ৮ আগস্ট সকালে গ্রেপ্তার দুই আসামিকে আদালতে হাজির করা হয়। এ সময় আসামি মো. শাহিন (৩১) হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় আদালতে স্বেচ্ছায় দোষ স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন বলে জানিয়েছে পিবিআই।
তবে হত্যাকাণ্ডে জড়িত অন্য ব্যক্তিদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে। একই সঙ্গে মামলার তদন্ত কার্যক্রমও চলমান রয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) নারায়ণগঞ্জ জেলা।