বাংলাদেশের প্রত্যন্ত জনপদের সাংবাদিকতার ইতিহাসে কালিয়া প্রেসক্লাব, নড়াইল একটি অনন্য নাম। নবগঙ্গা নদীর তীরে গড়ে ওঠা এই প্রতিষ্ঠান শুধু একটি সাংবাদিক সংগঠন নয়; এটি সত্য, সাহস, দায়িত্বশীলতা ও জনস্বার্থে সাংবাদিকতার এক উজ্জ্বল প্রতীক। তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে কালিয়া প্রেসক্লাব স্থানীয় সাংবাদিকদের পেশাগত বিকাশ, গণমানুষের অধিকার রক্ষা, সামাজিক সচেতনতা সৃষ্টি এবং গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে।
নদী যেমন একটি জনপদের জীবন, সংস্কৃতি ও অর্থনীতিকে বহন করে, তেমনি একটি প্রেসক্লাব বহন করে সেই জনপদের স্মৃতি, সংগ্রাম ও বিবেককে। নবগঙ্গার জলের মতোই কালিয়া প্রেসক্লাবের ইতিহাস প্রবহমান—কখনো শান্ত, কখনো উত্তাল, কিন্তু কখনো থেমে যায়নি। এই প্রতিষ্ঠানের প্রতিটি বছর, প্রতিটি সংবাদ, প্রতিটি প্রতিবাদ এবং প্রতিটি উদ্যোগ কালিয়ার জনজীবনের সঙ্গে নিবিড়ভাবে যুক্ত।
১৯৯৩ সালে যখন কালিয়া প্রেসক্লাব প্রতিষ্ঠিত হয়, তখন উপজেলা পর্যায়ে সাংবাদিকদের সংগঠিত হওয়ার সুযোগ ছিল সীমিত। তথ্যপ্রযুক্তির প্রসার ছিল না, সংবাদ সংগ্রহ ও প্রেরণের ব্যবস্থাও ছিল অত্যন্ত কষ্টসাধ্য। হাতে লেখা সংবাদ, ডাকযোগে প্রতিবেদন পাঠানো, সীমিত যোগাযোগব্যবস্থা এবং নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও সাংবাদিকরা দায়িত্ব পালন করতেন। সেই কঠিন সময়ে কিছু দূরদর্শী ও সাহসী সাংবাদিকের উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত হয় কালিয়া প্রেসক্লাব। মরহুম মশিউল হক মিঠু এবং কালিয়া পৌরসভার তৎকালীন কমিশনার মো. শহীদুল ইসলাম শাহীসহ প্রতিষ্ঠাতাদের স্বপ্ন ছিল—কালিয়ার সাংবাদিকদের জন্য একটি পেশাদার, মর্যাদাপূর্ণ ও ঐক্যবদ্ধ প্ল্যাটফর্ম গড়ে তোলা। আজ ৩৩ বছর পর সেই স্বপ্ন একটি সুদৃঢ় ও সম্মানিত প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে।
কালিয়া প্রেসক্লাবের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো এর ঐতিহ্য ও ধারাবাহিকতা। সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে সাংবাদিকতার ধরন পাল্টেছে, প্রযুক্তির ব্যবহার বেড়েছে, সংবাদ পরিবেশনের গতি বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে; কিন্তু সত্য অনুসন্ধান ও জনস্বার্থে কাজ করার যে অঙ্গীকার, তা অটুট রয়েছে। এই প্রতিষ্ঠান বহু প্রজন্মের সাংবাদিক তৈরি করেছে, যারা স্থানীয় সংবাদকে জেলা বা উপজেলা প্রতিনিধি হিসেবে জাতীয় পরিসরে পৌঁছে দিয়েছেন এবং এলাকার নানা সমস্যা, সম্ভাবনা, উন্নয়ন ও সংকটকে দেশের সামনে তুলে ধরেছেন।
গ্রামীণ সাংবাদিকতার গুরুত্ব অনেক সময় যথাযথভাবে মূল্যায়িত হয় না। অথচ একটি গ্রামের রাস্তা, একটি বিদ্যালয়ের সংকট, একটি নদীভাঙন, একটি কৃষকের দুর্দশা, একটি হাসপাতালের অব্যবস্থা কিংবা একটি সামাজিক অন্যায়ের খবরই জাতীয় নীতিনির্ধারণে প্রভাব ফেলতে পারে। কালিয়া প্রেসক্লাবের সদস্যরা সেই দায়িত্ব পালন করেছেন নীরবে, নিরলসভাবে। তাঁদের প্রতিবেদন বহু মানুষের অধিকার আদায়ে সহায়ক হয়েছে, উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে গতি এনেছে এবং প্রশাসনের জবাবদিহি নিশ্চিত করতে ভূমিকা রেখেছে।
কালিয়া উপজেলার শিক্ষা, কৃষি, নদীভাঙন, যোগাযোগব্যবস্থা, স্বাস্থ্যসেবা, পরিবেশ, সংস্কৃতি, মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস এবং জনজীবনের অসংখ্য বিষয় গণমাধ্যমে গুরুত্ব পেয়েছে প্রেসক্লাবের সদস্যদের আন্তরিক প্রচেষ্টায়। অনেক সময় ক্ষমতাবানদের চাপ, হুমকি, সামাজিক প্রতিকূলতা কিংবা আর্থিক সীমাবদ্ধতার মধ্যেও সাংবাদিকরা দায়িত্ব পালন করেছেন। এই সাহসী ভূমিকা কালিয়া প্রেসক্লাবকে মানুষের আস্থার প্রতিষ্ঠানে পরিণত করেছে।
সাংবাদিকতা কেবল সংবাদ প্রকাশের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; এটি সমাজ পরিবর্তনেরও একটি শক্তিশালী মাধ্যম। কালিয়া প্রেসক্লাব সেই দায়িত্বও পালন করেছে নিষ্ঠার সঙ্গে। প্রাকৃতিক দুর্যোগে ত্রাণ কার্যক্রম, অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানো, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের উদ্যোগে সহযোগিতা, বিভিন্ন সামাজিক ইস্যুতে জনমত গঠন—এসব ক্ষেত্রেও প্রেসক্লাবের ভূমিকা প্রশংসনীয়। ফলে এটি স্থানীয় সমাজজীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান হিসেবে প্রতিষ্ঠা পেয়েছে।
একটি প্রেসক্লাবের প্রকৃত পরিচয় কেবল তার ভবন বা সাংগঠনিক কাঠামোয় নয়; তার নৈতিক অবস্থানে। সংবাদপেশার মূল ভিত্তি হলো বিশ্বাসযোগ্যতা। একটি ভুল সংবাদ যেমন মানুষের জীবনকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে, তেমনি একটি সত্য সংবাদ অন্যায়ের বিরুদ্ধে সমাজকে জাগিয়ে তুলতে পারে। কালিয়া প্রেসক্লাবের দীর্ঘ যাত্রাপথে নৈতিক সাংবাদিকতার যে চর্চা গড়ে উঠেছে, সেটিই তার সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ।
আজকের বিশ্বে সাংবাদিকতা আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি ঝুঁকিপূর্ণ। ভুয়া তথ্য, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অপব্যবহার, রাজনৈতিক ও সামাজিক উত্তেজনা, ডিজিটাল নজরদারি, অনলাইন হুমকি এবং মাঠপর্যায়ে নিরাপত্তাহীনতা—সব মিলিয়ে সাংবাদিকদের দায়িত্ব যেমন বেড়েছে, তেমনি বেড়েছে চ্যালেঞ্জও। এই প্রেক্ষাপটে সাংবাদিকদের নিরাপত্তা ও পেশাগত সক্ষমতা বৃদ্ধির বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সম্প্রতি বাংলাদেশ জার্নালিস্ট প্রটেক্ট কমিটির উদ্যোগে সাংবাদিকদের মধ্যে বুলেটপ্রুফ জ্যাকেট, হেলমেটসহ নিরাপত্তা সরঞ্জাম বিতরণ একটি ইতিবাচক বার্তা বহন করে। কালিয়া প্রেসক্লাবও তার সদস্যদের নিরাপত্তা, প্রশিক্ষণ, আইনি সহায়তা এবং পেশাগত উন্নয়নের বিষয়ে আরও কার্যকর ও প্রাতিষ্ঠানিক ভূমিকা রাখতে পারে।
প্রযুক্তির এই যুগে সাংবাদিকতার ভাষাও বদলে যাচ্ছে। সংবাদপত্রের পাশাপাশি অনলাইন পোর্টাল, ভিডিও স্টোরি, মোবাইল জার্নালিজম, ডেটা জার্নালিজম এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা-সহায়ক তথ্য বিশ্লেষণ নতুন বাস্তবতা তৈরি করেছে। আগামী দিনের সাংবাদিককে শুধু লেখক হলেই চলবে না; তাঁকে হতে হবে তথ্যযোদ্ধা, বিশ্লেষক, তথ্য-যাচাইকারী এবং ডিজিটাল কনটেন্ট নির্মাতা। কালিয়া প্রেসক্লাব এই পরিবর্তনের নেতৃত্ব দিতে পারে।
৩৩ বছরের এই যাত্রা আমাদের গর্বিত করে, কিন্তু সামনে পথ আরও দীর্ঘ। আগামী দিনের কালিয়া প্রেসক্লাব হতে পারে একটি আধুনিক মিডিয়া রিসোর্স সেন্টার—যেখানে থাকবে সাংবাদিক প্রশিক্ষণ, ডিজিটাল সাংবাদিকতা, অনুসন্ধানী প্রতিবেদন, তথ্য যাচাই (ফ্যাক্ট-চেকিং), মাল্টিমিডিয়া কনটেন্ট নির্মাণ, দুর্যোগ সাংবাদিকতা, নিরাপত্তা প্রশিক্ষণ এবং তরুণ সাংবাদিকদের দক্ষতা উন্নয়নের সুযোগ। একই সঙ্গে প্রেসক্লাবের একটি সমৃদ্ধ ডিজিটাল আর্কাইভ গড়ে তোলা প্রয়োজন, যেখানে সংরক্ষিত থাকবে কালিয়ার ইতিহাস, মুক্তিযুদ্ধ, সংস্কৃতি, বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব, পুরোনো সংবাদপত্র, আলোকচিত্র এবং স্থানীয় সাংবাদিকতার গুরুত্বপূর্ণ দলিল।
আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো নারী সাংবাদিকদের অংশগ্রহণ। স্থানীয় সাংবাদিকতায় নারীদের উপস্থিতি বাড়ানো, তাঁদের নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করা এবং নেতৃত্ব বিকাশে উৎসাহ দেওয়া সময়ের দাবি। একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক সাংবাদিক সমাজই গণতান্ত্রিক সমাজকে আরও শক্তিশালী করে।
কালিয়া প্রেসক্লাবের আরেকটি বড় অর্জন হলো সাংগঠনিক ঐক্য। মতপার্থক্য থাকলেও পেশাগত স্বার্থে একসঙ্গে কাজ করার সংস্কৃতি এই প্রতিষ্ঠানের অন্যতম শক্তি। একটি সাংবাদিক সংগঠনের প্রকৃত সাফল্য তার সদস্যদের পারস্পরিক সহযোগিতা, নৈতিক অবস্থান এবং পেশাগত মর্যাদা রক্ষার সক্ষমতার ওপর নির্ভর করে। এই ক্ষেত্রে কালিয়া প্রেসক্লাবের অভিজ্ঞতা আগামী প্রজন্মের জন্য মূল্যবান দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে।
‘নবগঙ্গা’ স্মরণিকার প্রকাশনা নিজেই একটি তাৎপর্যপূর্ণ উদ্যোগ। একটি প্রতিষ্ঠানের ইতিহাস, স্মৃতি, সংগ্রাম, সাফল্য ও স্বপ্নকে লিপিবদ্ধ করার মাধ্যমে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি মূল্যবান দলিল তৈরি হয়। ইতিহাস লিখিত না হলে হারিয়ে যায়; স্মৃতি সংরক্ষিত না হলে উত্তরাধিকার ভেঙে যায়। এই স্মরণিকা সেই উত্তরাধিকারের ধারক।
কালিয়া প্রেসক্লাবের ৩৩ বছরের পথচলা শুধু স্মৃতিচারণের বিষয় নয়; এটি একটি চলমান ইতিহাস, যা নতুন প্রজন্মকে দায়িত্বশীল সাংবাদিকতা, মানবিকতা এবং সামাজিক দায়বদ্ধতার শিক্ষা দেয়। যারা আজ সাংবাদিকতার পথে পা রাখছে, তারা এই ইতিহাস থেকে শিখতে পারে—সাংবাদিকতার শক্তি ক্ষমতার কাছাকাছি থাকার মধ্যে নয়; সত্যের কাছাকাছি থাকার মধ্যে।
এই প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে আমরা গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করি প্রয়াত সাংবাদিক ও সংগঠকদের, যাঁদের ত্যাগ, শ্রম, সততা ও দূরদর্শিতার ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে আজকের কালিয়া প্রেসক্লাব। একই সঙ্গে অভিনন্দন জানাই বর্তমান ও সাবেক সকল সদস্যকে, যাঁদের নিষ্ঠা, সাহস ও পেশাগত সততা এই প্রতিষ্ঠানকে সমৃদ্ধ করেছে। তাঁদের প্রত্যেকেই এই ইতিহাসের সহ-নির্মাতা।
নবগঙ্গার মতোই কালিয়া প্রেসক্লাবের প্রবাহ অবিরাম হোক। সত্যের পক্ষে, মানুষের পক্ষে এবং ন্যায়বিচারের পক্ষে এই প্রতিষ্ঠান আরও শক্তিশালী হয়ে উঠুক। আগামী দিনের সাংবাদিকরা যেন এই আলোকবর্তিকার আলোয় পথ খুঁজে পান—এই হোক ৩৩তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর প্রত্যাশা।
কালিয়া প্রেসক্লাবের গৌরবময় ৩৩ বছর—সত্যের পথে, মানুষের পাশে, আগামীর প্রত্যয়ে।
লেখক: শাহ মো. সোহরাব হোসেন
সদস্য, কালিয়া প্রেসক্লাব