স্পোর্টস ডেস্ক:
২০২৪ সালের ১২ আগস্ট ছয় বছরের চুক্তিতে ম্যানচেস্টার সিটি থেকে অ্যাতলেটিকো মাদ্রিদে যোগ দেন আর্জেন্টাইন তারকা হুলিয়ান আলভারেজ। তবে দুই মৌসুম না পেরোতেই ফিফা বিশ্বকাপের মাঝপথে ক্লাব ছাড়ার ইচ্ছা প্রকাশ করায় শুরু হয় নতুন নাটকীয়তা।
বার্সেলোনা ও আলভারেজ—দুই পক্ষই একে অপরকে চাইলেও তাকে ছাড়তে নারাজ অ্যাতলেটিকো মাদ্রিদ। এরই মধ্যে এই অস্থিরতার পেছনে আলভারেজের এজেন্ট ফার্নান্দো হিদালগোর ভূমিকা রয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
সম্প্রতি অ্যাতলেটিকো মাদ্রিদের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মিগেল আনহেল হিল মারিন বলেন, ‘হুলিয়ান সত্যিই কঠিন সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। কিছু মানুষ তাকে প্রতারণা ও বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করেছে। এতে আমি গভীরভাবে দুঃখিত। আমি তাকে চিনি, আমরা দীর্ঘদিন ধরে একসঙ্গে কাজ করছি। সে দারুণ পেশাদার ফুটবলার। ব্যক্তিগত ও পেশাগতভাবে সে খুব বিভ্রান্ত এবং অত্যন্ত কঠিন সময় পার করছে।’
মারিনের এই মন্তব্যে বার্সেলোনার তৎপরতার সমালোচনার পাশাপাশি আলভারেজের এজেন্ট ফার্নান্দো হিদালগোকেও ইঙ্গিত করা হয়েছে বলে মনে করছে স্প্যানিশ সংবাদমাধ্যম মার্কা। সংবাদমাধ্যমটির দাবি, আর্জেন্টিনায় দীর্ঘদিন ধরেই নানা সংঘাত ও বিতর্কের সঙ্গে জড়িয়ে আছেন হিদালগো। আলভারেজকে ঘিরে বর্তমান জটিলতার অন্যতম কারিগর হিসেবেও তার নাম সামনে এসেছে।
যেভাবে এজেন্ট ব্যবসায় হিদালগোর উত্থান
১৯৯০-এর দশকে কিংবদন্তি এজেন্ট গুস্তাভো মাসকার্দির গাড়িচালক হিসেবে কাজ করার মাধ্যমে ফুটবল ব্যবসায় হিদালগোর পথচলা শুরু। মাসকার্দির ক্লায়েন্টদের মধ্যে ছিলেন হার্নান ক্রেসপো, সেবাস্তিয়ান ভেরন ও ক্লদিও লোপেজের মতো তারকারা।
আর্জেন্টাইন সংবাদমাধ্যমের বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়, গাড়িচালক হিসেবে কাজ করার সময়ই ফুটবলারদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা তৈরি করেন হিদালগো। পরে সেই সম্পর্ককে কাজে লাগিয়ে তিনি খেলোয়াড়দের প্রতিনিধিত্বের ব্যবসায় প্রবেশ করেন। এমনকি যিনি তাকে এই ব্যবসায় পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন, সেই মাসকার্দির কয়েকজন খেলোয়াড়কে নিজের এজেন্সিতে নিয়ে যাওয়ার অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে।
মার্কার তথ্যমতে, পরে গুস্তাভো আরিবাস ও পিনি জাহাভির সঙ্গে মিলে ‘এইচএজেড স্পোর্টস এজেন্সি’ প্রতিষ্ঠা করেন হিদালগো। এজেন্সির নামের ‘এইচ’ এসেছে হিদালগো, ‘এ’ আরিবাস এবং ‘জেড’ জাহাভির নাম থেকে।
প্রতিষ্ঠার শুরুতে বেশ সক্রিয় ছিল সংস্থাটি। কয়েক বছরে একাধিক বড় চুক্তি সম্পন্ন করার পর অবশ্য তিন অংশীদারের মধ্যে দ্বন্দ্ব শুরু হয়। তারা একে অপরের বিরুদ্ধে অর্থ আত্মসাৎ ও আর্থিক অনিয়মের অভিযোগও তোলেন। শেষ পর্যন্ত আলাদাভাবে কাজ করার সিদ্ধান্ত নেন হিদালগো।
বিতর্ক পিছু ছাড়েনি
ফুটবলের বাইরে একাধিক কর্মকাণ্ডের কারণেও আলোচনায় এসেছেন হিদালগো। তিনি সুইজারল্যান্ডের তৃতীয় বিভাগের ঐতিহাসিক ক্লাব এফসি লোকানোর মালিকানা নিয়েছিলেন। ১৯০৬ সালে প্রতিষ্ঠিত ক্লাবটিকে দক্ষিণ আমেরিকার তরুণ প্রতিভাদের ইউরোপে নিয়ে আসার আগে ‘শেল ক্লাব’ হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছিল কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন ওঠে। শেষ পর্যন্ত ক্লাবটি দেউলিয়া হয়ে বিলুপ্ত হয়ে যায়।
২০০৭ সালে মোটরস্পোর্টেও পা রাখেন হিদালগো। এইচএজেডের মাধ্যমে সেই যাত্রা শুরু হলেও সেখানেও বিতর্ক থেকে মুক্তি পাননি তিনি। দলের এক চালকের মৃত্যুর পর ২০১১ সালে দলটি বন্ধ করে দেন।
এরপর তার ব্যবসায়িক সাম্রাজ্যেও ধস নামে। অংশীদারদের সঙ্গে বিচ্ছেদের পাশাপাশি পোর্টফোলিওতে থাকা বেশিরভাগ ফুটবলারকেও হারান তিনি। পরে বুয়েন্স আয়ার্সের অফিস বন্ধ করে কর্মীদের ছাঁটাই করে মাদ্রিদে চলে যান। আর্জেন্টিনার বিভিন্ন প্রতিবেদনে দাবি করা হয়, দেশটির কর কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কর-সংক্রান্ত জটিলতাই তার মাদ্রিদে চলে যাওয়ার অন্যতম কারণ।
আলভারেজই বড় সম্পদ
এত বিতর্কের মধ্যেও হিদালগোর পাশে ছিলেন আলভারেজ ও ক্রিস্তিয়ান পাভোন। তাদের মধ্যে আলভারেজই ছিলেন বাজারে তার সবচেয়ে বড় সম্পদ। ম্যানচেস্টার সিটি থেকে অ্যাতলেটিকো মাদ্রিদে আলভারেজের যোগদানের ক্ষেত্রেও হিদালগোর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল।
তবে সাম্প্রতিক অস্থিরতার পর পরিস্থিতি বদলাতে শুরু করেছে। আলভারেজের পরিবার ইতোমধ্যে আর্জেন্টাইন, স্প্যানিশ ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন এজেন্টের সঙ্গে বৈঠক করেছে বলে জানা গেছে।
অ্যাতলেটিকো সমর্থকদের দুয়ো, সতীর্থদের সঙ্গে দূরত্ব এবং একাকী অনুশীলনের মতো পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন আলভারেজ। ফলে বর্তমান পরিস্থিতির দ্রুত অবসান চান আর্জেন্টাইন তারকা। আর সেই প্রক্রিয়ায় তার দীর্ঘদিনের এজেন্ট হিদালগোর ভবিষ্যৎও এখন অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।