Deprecated: Function WP_Dependencies->add_data() was called with an argument that is deprecated since version 6.9.0! IE conditional comments are ignored by all supported browsers. in /home/u102988081/domains/dailyswadhinsangbad.com/public_html/wp-includes/functions.php on line 6260
সদ্য বাবা হয়ে সন্তানের মুখ দেখার আগেই না ফেরার দেশে সৈনিক পিয়াস - দৈনিক স্বাধীন সংবাদ

সদ্য বাবা হয়ে সন্তানের মুখ দেখার আগেই না ফেরার দেশে সৈনিক পিয়াস

মোঃ ইসলাম উদ্দিন তালুকদার ::

চট্টগ্রামের হাটহাজারী ফিল্ড ফায়ারিং রেঞ্জে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর প্রশিক্ষণ চলাকালে ট্যাংক থেকে গোলাবর্ষণের সময় আকস্মিক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন সৈনিক আবু বকর সিদ্দিক পিয়াস। মৃত্যুর মাত্র কয়েকদিন আগে তিনি সন্তানের বাবা হয়েছিলেন। নতুন জীবনের আগমনে যখন পরিবারে বইছিল আনন্দের জোয়ার, ঠিক তখনই দেশের দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে পিয়াসের আকস্মিক মৃত্যুতে সেই আনন্দ পরিণত হয়েছে গভীর শোকে।

নিহত সৈনিক আবু বকর সিদ্দিক পিয়াস নোয়াখালীর কবিরহাট উপজেলার সুন্দলপুর ইউনিয়নের ৮ নম্বর ওয়ার্ডের আব্দুল ওয়াহাবের ছেলে। পরিবারের তিন বোনের একমাত্র ভাই ছিলেন তিনি। ছোটবেলা থেকেই শান্ত, ভদ্র ও অমায়িক স্বভাবের পিয়াস ছিলেন স্বজন, বন্ধু ও প্রতিবেশীদের অত্যন্ত প্রিয়।

সেনাবাহিনীতে যোগ দেওয়ার পর দেশের সেবাকে নিজের জীবনের অন্যতম লক্ষ্য হিসেবে নিয়েছিলেন পিয়াস। একজন সৈনিকের পোশাক পরার সঙ্গে যে দায়িত্ব, শৃঙ্খলা ও দেশপ্রেম জড়িয়ে থাকে, তা তিনি নিজের কর্মজীবনে ধারণ করেছিলেন। দেশের নিরাপত্তা ও মানুষের সেবায় কাজ করার স্বপ্ন নিয়েই এগিয়ে যাচ্ছিলেন তিনি।

চাকরির সুবাদে পরিবার-পরিজন নিয়ে চট্টগ্রামের সেনা কোয়ার্টারে বসবাস করতেন পিয়াস। দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি পরিবার নিয়েও ছিল তার নানা স্বপ্ন। জীবনের নতুন অধ্যায়ে পা রেখে কয়েকদিন আগেই বাবা হওয়ার আনন্দ পেয়েছিলেন তিনি। সদ্যজাত সন্তানকে ঘিরে ছিল নতুন নতুন পরিকল্পনা, ছিল ভবিষ্যৎকে সুন্দর করে সাজানোর স্বপ্ন।

কিন্তু সেই স্বপ্নের মাঝেই ঘটে গেল মর্মান্তিক দুর্ঘটনা।

আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর (আইএসপিআর) জানিয়েছে, ফিল্ড ফায়ারিং অনুশীলনের সময় ট্যাংক থেকে গোলাবর্ষণের একপর্যায়ে আকস্মিক দুর্ঘটনা ঘটে। এতে সৈনিক আবু বকর সিদ্দিক পিয়াসসহ দুই সেনাসদস্য নিহত হন। এ ঘটনায় এক সেনা কর্মকর্তা গুরুতর আহত হয়েছেন। আহত কর্মকর্তাকে উন্নত চিকিৎসার জন্য হেলিকপ্টারে করে ঢাকার সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে।

সন্তানের মুখ দেখার আগেই থেমে গেল বাবার পথচলা

পিয়াসের মৃত্যুর সবচেয়ে হৃদয়বিদারক দিক হলো—মাত্র কয়েকদিন আগেই তিনি বাবা হয়েছিলেন। যে সন্তানকে নিয়ে তার ছিল অসংখ্য স্বপ্ন, সেই সন্তান পৃথিবীতে আসার পর বাবার স্নেহ পাওয়ার সুযোগ পেল না।

একজন বাবার কাছে সন্তানের জন্ম জীবনের সবচেয়ে আনন্দের মুহূর্তগুলোর একটি। পিয়াসও নিশ্চয়ই সেই আনন্দকে নিজের মতো করে উপভোগ করার স্বপ্ন দেখেছিলেন। সন্তানের ভবিষ্যৎ, তার বেড়ে ওঠা, তাকে নিজের হাতে বড় করা—সবকিছু নিয়েই হয়তো ছিল তার নানা পরিকল্পনা।

কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে সন্তানের ছোট্ট হাতটি ধরে হাঁটার আগেই তাকে চলে যেতে হলো না ফেরার দেশে।

সদ্যোজাত সন্তানটি হয়তো এখনো জানে না, তার বাবা আর কখনো তাকে কোলে তুলে নেবেন না। বাবার কণ্ঠ শুনে সাড়া দেওয়ার আগেই সে হারাল তার সবচেয়ে আপন মানুষটিকে। পিয়াসের স্ত্রী ও পরিবারের কাছে তাই এই মৃত্যু শুধু একজন প্রিয় মানুষকে হারানোর শোক নয়; এটি তাদের ভবিষ্যতের অনেক স্বপ্ন একসঙ্গে ভেঙে যাওয়ার বেদনা।

তিন বোনের একমাত্র ভাই ছিলেন পিয়াস

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, পিয়াস ছিলেন পরিবারের তিন বোনের একমাত্র ভাই। ছোটবেলা থেকেই পরিবারের সবার আদরের ছিলেন তিনি। শান্ত স্বভাব, হাসিমুখে কথা বলা এবং মানুষের সঙ্গে ভালো ব্যবহার করার কারণে এলাকায় তার আলাদা পরিচিতি ছিল।

পরিবারের একমাত্র ছেলে হিসেবে তার ওপর ছিল নানা দায়িত্ব। বাবা-মা ও তিন বোনের প্রতি ছিল তার গভীর টান। চাকরির কারণে দূরে থাকলেও সুযোগ পেলেই পরিবারের সঙ্গে সময় কাটাতেন বলে জানিয়েছেন স্বজনরা।

পিয়াসের আকস্মিক মৃত্যুতে সেই পরিবার আজ শূন্যতায় ভরা। যে বাড়িতে কয়েকদিন আগেও নতুন সন্তানের আগমনে আনন্দ ছিল, সেখানে এখন স্বজনদের আহাজারি।

দেশের সেবার স্বপ্নেই বেছে নিয়েছিলেন সেনাজীবন

সেনাবাহিনীর সদস্য হওয়া শুধু একটি চাকরি নয়—এটি দেশের প্রতি দায়িত্ব ও আত্মত্যাগের অঙ্গীকার। দেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও নিরাপত্তার জন্য সেনাসদস্যরা নিজেদের জীবনকে কঠোর শৃঙ্খলার মধ্যে পরিচালনা করেন।

পিয়াসও সেই স্বপ্ন নিয়েই সেনাবাহিনীতে যোগ দিয়েছিলেন। প্রশিক্ষণ, দায়িত্ব পালন এবং দেশের প্রয়োজনে নিজেকে প্রস্তুত রাখাই ছিল তার জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। একজন সৈনিকের জীবনে পরিবার থেকে দূরে থাকা, কঠিন প্রশিক্ষণ, ঝুঁকিপূর্ণ দায়িত্ব এবং যেকোনো পরিস্থিতিতে কর্তব্য পালনের মানসিকতা তৈরি করা—সবকিছুর মধ্য দিয়েই এগিয়ে যেতে হয়।

দেশের জন্য কাজ করার সেই স্বপ্ন হয়তো পূর্ণতা পায়নি, কিন্তু দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে জীবন উৎসর্গ করার মধ্য দিয়ে পিয়াস রেখে গেলেন আত্মত্যাগের এক বেদনাবিধুর স্মৃতি।

পরিবারের স্বপ্ন থেমে গেল, কিন্তু স্মৃতিতে থাকবেন পিয়াস

পিয়াসের স্বজনদের কাছে তিনি ছিলেন শুধু একজন সেনাসদস্য নন—তিনি ছিলেন পরিবারের ভরসা, তিন বোনের একমাত্র ভাই, একজন স্বামী এবং সদ্যোজাত সন্তানের বাবা।

তার চলে যাওয়ায় পরিবারের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনাগুলো যেন হঠাৎ থমকে গেছে। সন্তানের জন্য যে স্বপ্নগুলো তিনি দেখেছিলেন, সেগুলো হয়তো আর নিজের হাতে পূরণ করতে পারবেন না। তবে তার পরিবার, স্বজন ও এলাকার মানুষের স্মৃতিতে তিনি বেঁচে থাকবেন একজন দায়িত্বশীল, অমায়িক ও দেশপ্রেমিক তরুণ হিসেবে।

পিয়াসের মৃত্যু যেন আবারও মনে করিয়ে দিল—দেশের জন্য দায়িত্ব পালন করা প্রতিটি সেনাসদস্যের পেছনে থাকে একটি পরিবার, থাকে অসংখ্য স্বপ্ন ও ভালোবাসার মানুষ। দায়িত্ব পালনের পথে কোনো কোনো সৈনিককে সেই স্বপ্ন অসম্পূর্ণ রেখেই বিদায় নিতে হয়।

এলাকায় শোকের ছায়া

পিয়াসের মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়ার পর নোয়াখালীর কবিরহাটের সুন্দলপুর ইউনিয়নে নেমে আসে গভীর শোকের ছায়া। স্বজন, প্রতিবেশী ও স্থানীয়রা তাকে শেষবারের মতো দেখতে এবং শোকাহত পরিবারের পাশে দাঁড়াতে ছুটে আসেন।

স্থানীয়রা জানান, পিয়াস ছিলেন অত্যন্ত ভালো মনের মানুষ। তার এমন আকস্মিক মৃত্যু মেনে নেওয়া কঠিন। বিশেষ করে সদ্য বাবা হওয়া একজন তরুণের এভাবে চলে যাওয়া পুরো ঘটনাটিকে আরও হৃদয়বিদারক করে তুলেছে।

কবিরহাট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) পূদম পুষ্প চাকমা বলেন, সৈনিক আবু বকর সিদ্দিক পিয়াসের আকস্মিক মৃত্যুতে আমরা গভীরভাবে শোকাহত। দেশের সেবায় নিয়োজিত একজন তরুণের এভাবে অকালে চলে যাওয়া অত্যন্ত বেদনাদায়ক। বিশেষ করে সদ্যজাত সন্তানকে রেখে তার চলে যাওয়ার বিষয়টি সত্যিই হৃদয়বিদারক। শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা জানাই।

সদ্য পৃথিবীতে আসা সন্তানটির কাছে হয়তো পিয়াসের পরিচয় এখনো কেবল একটি নাম। কিন্তু একদিন সেই সন্তান বড় হবে, বাবার ছবি দেখবে, বাবার গল্প শুনবে। তখন হয়তো জানতে পারবে—তার বাবা ছিলেন দেশের জন্য দায়িত্ব পালন করা একজন সৈনিক; যিনি নিজের স্বপ্নের পাশাপাশি দেশের দায়িত্বকে ভালোবেসেছিলেন।

সন্তানের মুখে প্রথম ‘বাবা’ ডাক শোনার আগেই পিয়াস চলে গেলেন। কিন্তু দেশের জন্য তার দায়িত্ববোধ, পরিবারের প্রতি ভালোবাসা এবং অসমাপ্ত স্বপ্নগুলো হয়তো তার সন্তান ও স্বজনদের হৃদয়ে সারাজীবন বেঁচে থাকবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *