আন্তর্জাতিক ডেস্ক ::
২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর যুক্তরাষ্ট্রে ভয়াবহ সন্ত্রাসী হামলার ২৫ বছর পূর্ণ হচ্ছে আজ শুক্রবার। হামলায় নিহতদের স্মরণে নিউইয়র্কের গ্রাউন্ড জিরো এলাকায় সমাবেশ ও শ্রদ্ধা নিবেদন কর্মসূচি ঘিরে নেওয়া হয়েছে কঠোর নিরাপত্তাব্যবস্থা।
এবারের স্মরণ আয়োজনে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের অনুপস্থিতি এবং নিউইয়র্কের প্রথম মুসলিম মেয়র জোহরান মামদানির উপস্থিতিকে ঘিরে রাজনৈতিক বিতর্কও সামনে এসেছে। জানা গেছে, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প নিউইয়র্কে যাচ্ছেন না। তিনি ভার্জিনিয়া অঙ্গরাজ্যের আর্লিংটনে অবস্থিত পেন্টাগনে নিহতদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাবেন।
যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জে ডি ভ্যান্স নিউইয়র্কে যাবেন। এ ছাড়া সাবেক প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটন, জর্জ ডব্লিউ বুশ, বারাক ওবামা ও জো বাইডেনও নিহতদের স্মরণ অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকবেন।
তবে তাঁদের কেউ অনুষ্ঠানে ভাষণ দেবেন না। এর পরিবর্তে শোকসন্তপ্ত পরিবারের সদস্যরা নিহতদের নাম পাঠ করবেন। হামলার সময়কার গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তগুলো স্মরণ করতে ঘণ্টা বাজানো হবে।
৯/১১ মেমোরিয়াল পরিদর্শনে আসা শিকাগোর বাসিন্দা ষাটোর্ধ্ব রবার্ট কাফকা বলেন, “এ ধরনের শোক অনুষ্ঠান এবং সেই ঘটনাগুলো নিয়ে আলোচনা—স্মৃতিকে বাঁচিয়ে রাখার পাশাপাশি ভবিষ্যতে এ ধরনের ট্র্যাজেডি কীভাবে প্রতিরোধ করা যায়, তা বোঝার ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।”
মেয়র মামদানির উপস্থিতি ঘিরে বিতর্ক
সাবেক প্রেসিডেন্টদের পাশাপাশি স্মরণ অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকবেন ডেমোক্রেটিক দলের নেতা ও নিউইয়র্কের মেয়র জোহরান মামদানি। তিনি নিউইয়র্ক শহরের প্রথম মুসলিম মেয়র।
ডানপন্থী সংবাদমাধ্যম নিউইয়র্ক পোস্ট এবং সাবেক মেয়র রুডি জুলিয়ানির নেতৃত্বে তাঁকে অনুষ্ঠান থেকে দূরে থাকার আহ্বান জানিয়ে প্রচারণা চালানো হলেও মামদানি সেখানে উপস্থিত থাকছেন।
এক লাখেরও বেশি স্বাক্ষরসংবলিত একটি আবেদনে মামদানির বিরুদ্ধে এমন ব্যক্তিদের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ আনা হয়েছে, যারা “মার্কিন প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি অবজ্ঞাশীল অথবা চরমপন্থী মতাদর্শের বিষয়ে যথেষ্ট সমালোচনামুখর নন।”
নিউইয়র্ক সিটি কাউন্সিলের সদস্য শাহানা হানিফ সিএনএনকে বলেন, “মেয়র কেবল মুসলিম হওয়ার কারণেই তাঁর সঙ্গে ভিন্ন আচরণ করা হচ্ছে—বিষয়টি আমার কাছে উদ্বেগজনক।”
যেভাবে সংঘটিত হয়েছিল ৯/১১ হামলা
২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর যুক্তরাষ্ট্রে সংঘটিত ভয়াবহ বিমান হামলাটি সংক্ষেপে ‘৯/১১ হামলা’ নামে পরিচিত। ওই দিন আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসীগোষ্ঠী আল-কায়েদার ১৯ জন সদস্য চারটি যাত্রীবাহী বিমান ছিনতাই করে হামলা চালায়।
ছিনতাইকারীদের মধ্যে ১৫ জন ছিলেন সৌদি আরবের, দুজন সংযুক্ত আরব আমিরাতের, একজন মিসরের এবং একজন লেবাননের নাগরিক। তাঁরা চারটি দলে বিভক্ত ছিলেন। প্রতিটি দলে একজন করে পাইলট ছিলেন, যাঁরা উড়োজাহাজ চালানোর প্রশিক্ষণ নিয়েছিলেন।
স্থানীয় সময় সকাল ৮টা ৪৬ মিনিটে প্রথম বিমানটি নিউইয়র্কের ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারের উত্তর টাওয়ারে আঘাত হানে। এর কিছুক্ষণ পর সকাল ৯টা ৩ মিনিটে দ্বিতীয় বিমানটি দক্ষিণ টাওয়ারে বিধ্বস্ত হয়।
দুটি ভবনেই আগুন ধরে যায়। ওপরের তলাগুলোতে বহু মানুষ আটকা পড়েন। আকাশে ছড়িয়ে পড়ে ধোঁয়ার কুণ্ডলী। ১১০ তলাবিশিষ্ট দুটি টাওয়ারই পরবর্তী দুই ঘণ্টার মধ্যে ধসে পড়ে।
তৃতীয় বিমানটি স্থানীয় সময় সকাল ৯টা ৩৭ মিনিটে পেন্টাগনের পশ্চিম অংশে আঘাত হানে। এরপর সকাল ১০টা ৩ মিনিটে চতুর্থ বিমানটি পেনসিলভেনিয়ার একটি মাঠে বিধ্বস্ত হয়। ধারণা করা হয়, ছিনতাইকারীরা বিমানটি দিয়ে ওয়াশিংটন ডিসির ক্যাপিটল ভবনে হামলা চালাতে চেয়েছিল। তবে বিমানের যাত্রীরা ছিনতাইকারীদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলার পর সেটি নির্ধারিত গন্তব্যে পৌঁছাতে পারেনি।
প্রাণ হারান প্রায় তিন হাজার মানুষ
হামলায় ব্যবহৃত চারটি উড়োজাহাজের ২৪৬ জন যাত্রী ও ক্রুর সবাই নিহত হন। এ ছাড়া ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারের দুটি ভবনে ২ হাজার ৬০৬ জন এবং পেন্টাগনে ১২৫ জন নিহত হন। সব মিলিয়ে হামলায় প্রাণ হারান মোট ২ হাজার ৯৭৭ জন।
নিহতদের মধ্যে সর্বকনিষ্ঠ ছিলেন দুই বছর বয়সী ক্রিস্টিন লি হ্যানসন। তিনি বাবা-মায়ের সঙ্গে একটি বিমানের যাত্রী ছিলেন। সর্বজ্যেষ্ঠ নিহত হিসেবে উল্লেখ করা হয় ৮২ বছর বয়সী রবার্ট নর্টনকে, যিনি স্ত্রী জ্যাকুলিনের সঙ্গে একটি বিয়ের অনুষ্ঠানে যোগ দিতে যাচ্ছিলেন।
হামলায় হাজার হাজার মানুষ আহত হন। হতাহতদের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রসহ বিশ্বের ৭৭টি দেশের নাগরিক ছিলেন বলে জানা গেছে।
হামলার দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব
যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর তথ্য অনুযায়ী, ৯/১১ হামলার পরিকল্পনা আল-কায়েদার নেতৃত্বে করা হয়েছিল। হামলার পর আফগানিস্তানে তালেবান সরকারের সঙ্গে আল-কায়েদার সম্পর্ক এবং সৌদি আরবের কিছু কর্মকর্তার সম্ভাব্য সংশ্লিষ্টতা নিয়েও নানা অভিযোগ ও তদন্ত হয়েছে।
ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টার ধসে পড়ার পর সৃষ্ট ধুলোর মেঘ ও বিষাক্ত দূষণের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাবও ভয়াবহ ছিল। এর ফলে বহু উদ্ধারকর্মী, স্থানীয় বাসিন্দা ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হন। বিশেষ করে ক্যান্সারসহ নানা অসুস্থতায় আক্রান্ত হয়ে হাজার হাজার মানুষ এখনো ভুগছেন।
এদিকে, হামলার পর লোয়ার ম্যানহাটনের বাতাসের বিষাক্ততা সম্পর্কে নগর কর্মকর্তারা কী জানতেন, সে-সংক্রান্ত হাজার হাজার নথি সম্প্রতি প্রকাশ করেছেন মেয়র জোহরান মামদানি। এ উদ্যোগের জন্য তিনি প্রশংসাও পেয়েছেন।