খসরু মৃধা:
গাজীপুরে আইন ও সরকারি নীতিমালার তোয়াক্কা না করে কৃষিজমি, জলাশয় ও পুকুর ভরাটের হিড়িক পড়েছে। জেলা প্রশাসনের কোনো চূড়ান্ত অনুমোদন ছাড়াই পূবাইলের সাতানীপাড়া এলাকায় একটি লাভজনক বিশাল পুকুর ও কৃষিজমি কৌশলে ভরাট করে চলেছে একটি প্রভাবশালী মহল। এতে একদিকে যেমন কৃষিজমি ও জলাশয়ের অস্তিত্ব হুমকির মুখে পড়েছে, অন্যদিকে এলাকার প্রাকৃতিক ভারসাম্য ও জলাবদ্ধতা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
ঘটনাস্থলের চিত্র ও মালিকানা
পূবাইল মৌজার খতিয়ান নং-২৮৫ এবং আরএস দাগ নং-১২০৫-এর এই জলাশয়টি রেকর্ড অনুযায়ী বোরো জমি হলেও পরবর্তীতে সেখানে পুকুর খনন করে দীর্ঘদিন ধরে মাছ চাষ করা হচ্ছিল। স্থানীয়দের তথ্য অনুযায়ী, গত বছরও এই পুকুর থেকে প্রায় আট লাখ টাকার মাছ উৎপাদিত হয়।
বর্তমান জমির মালিক এটিকে ‘নাল ও চালা জমি’ হিসেবে দাবি করলেও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে ভিন্ন তথ্য। তাদের দাবি, দীর্ঘদিন ধরে পুকুর হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসা ওই জলাশয়ে বর্তমানে অবৈধভাবে বালু ফেলে ভরাটের কার্যক্রম চলছে।
স্থানীয় সূত্রের অভিযোগ, অবৈধভাবে বালু ফেলে এই পুকুর ভরাটের নেপথ্যে কাজ করছেন বিন্দানের আজমিন ও টঙ্গী টিএনটির টিপু। এ বিষয়ে বালু ব্যবসায়ী আজমিন দাবি করেছেন, পুকুর ভরাটের জন্য জেলা প্রশাসকের অনুমতি নেওয়া হয়েছে।
তবে ভূমি সহকারী কর্মকর্তা আলী হোসেন জানিয়েছেন, তিনি একাধিকবার নিষেধ করা সত্ত্বেও অভিযুক্তরা কর্ণপাত না করে জোরপূর্বক বালু ভরাট চালিয়ে যাচ্ছেন। ফলে জেলা প্রশাসনের অনুমতির দাবি নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
বারবার ভরাটের অপচেষ্টা
স্থানীয়দের অভিযোগ, এই জলাশয় ভরাটের চেষ্টা নতুন নয়। গত বছরের ২০ অক্টোবর ফরিদুদ্দীন আহমেদ নামের এক ব্যক্তি একই ধরনের আবেদন করে দাবি করেন, মাটি কেটে নেওয়ার কারণে তাঁর জমি নিচু হয়ে গেছে। এই অজুহাতে তিনি পুকুর ভরাট করে স্থায়ী শেড নির্মাণের অনুমতি চান।
সে সময় ভ্রাম্যমাণ আদালত অভিযান চালিয়ে পুকুর ভরাটের সেই অপচেষ্টা প্রতিহত করেন।
প্রথম প্রচেষ্টা ব্যর্থ হওয়ার পর ঢাকার উত্তরার বাসিন্দা মো. মঞ্জুরুল ইসলাম সুমন গত ২৫ আগস্ট ২০২৬ তারিখে জেলা প্রশাসক বরাবর একই উদ্দেশ্যে নতুন আবেদন করেন, যা ৩০ আগস্ট কার্যালয় কর্তৃক গৃহীত হয়।
স্থানীয়দের প্রশ্ন, আবেদন গ্রহণের বিষয়টি যদি চূড়ান্ত অনুমোদন না হয়ে থাকে, তাহলে কোন ক্ষমতাবলে সেখানে পুকুর ভরাটের কার্যক্রম চালানো হচ্ছে? এ নিয়ে এলাকাবাসীর মধ্যে ক্ষোভ ও উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।
আইনি বাস্তবতা ও প্রশাসনের অবস্থান
আইন অনুযায়ী কোনো জলাশয় বা পুকুর ভরাট করার সুযোগ না থাকলেও জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে কেবল একটি আবেদন জমা পড়ার বিষয়টিকে চূড়ান্ত অনুমতি হিসেবে প্রচার করে এই অবৈধ কাজ চালানো হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
মূলত জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে কোনো আবেদন গ্রহণ করা এবং সেই আবেদনের ভিত্তিতে চূড়ান্ত অনুমোদন দেওয়া এক বিষয় নয়। কিন্তু স্থানীয়দের অভিযোগ, বিষয়টিকে ভিন্নভাবে উপস্থাপন করে পুকুর ভরাটের কাজ অব্যাহত রাখা হচ্ছে।
এ অবস্থায় প্রশাসনের অনুমোদন ছাড়াই জলাশয় ভরাট করা হচ্ছে কি না, কিংবা কোনো অনুমোদন থাকলে তার শর্ত যথাযথভাবে অনুসরণ করা হচ্ছে কি না—তা খতিয়ে দেখার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
পরিবেশগত ঝুঁকি ও এলাকাবাসীর উদ্বেগ
স্থানীয় পরিবেশবাদীদের মতে, কাগজে-কলমে জলাশয়কে ‘নাল ও চালা জমি’ হিসেবে দাবি করে বাণিজ্যিকভাবে শেড নির্মাণের এই অপচেষ্টা এলাকার প্রাকৃতিক ভারসাম্যকে মারাত্মক হুমকির মুখে ফেলছে।
বিশেষ করে পুকুরটি ভরাট করা হলে সরকারি আশ্রয়কেন্দ্রের লাগোয়া পূর্ব পাশে তীব্র জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন স্থানীয়রা। একই সঙ্গে বর্ষা মৌসুমে বৃষ্টির পানি নিষ্কাশনে সমস্যা তৈরি হওয়ার পাশাপাশি আশপাশের পরিবেশও ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
এলাকাবাসীর অভিযোগ, একটি পুকুর ভরাট শুধু একটি জলাশয়ের অস্তিত্ব বিলীন করে না; এর সঙ্গে স্থানীয় পানি নিষ্কাশনব্যবস্থা, কৃষিজমি, মাছ চাষ এবং পরিবেশগত ভারসাম্যের বিষয়ও জড়িত। ফলে এ ধরনের কার্যক্রম বন্ধে প্রশাসনের দ্রুত পদক্ষেপ প্রয়োজন।
পূবাইলসহ গাজীপুরের বিভিন্ন এলাকায় একটি চক্রের এমন নির্বিচারে বালু ভরাট অবিলম্বে বন্ধ না হলে জলাভূমি ধ্বংসের এক বিপজ্জনক দুয়ার উন্মোচিত হবে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন স্থানীয় এলাকাবাসী।
পরিবেশ ও জনস্বার্থে পুকুর ভরাটের কার্যক্রম সরেজমিনে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ এবং প্রকৃত মালিকানা ও জমির শ্রেণি যাচাইয়ের দাবি জানিয়েছেন তারা। একই সঙ্গে কোনো ধরনের অনুমোদন ছাড়া জলাশয় ভরাট করা হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ারও দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় সচেতন মহল।