মোঃআনজার শাহ
দেশের প্রতিটি মানুষের দোরগোড়ায় মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দিতে প্রতিটি উপজেলায় ১৫১ শয্যাবিশিষ্ট আধুনিক হাসপাতাল নির্মাণের পরিকল্পনা নিয়েছে সরকার। এসব হাসপাতালে থাকবে আইসিইউ, এইচডিইউ, সিসিইউ, ডায়ালাইসিস সেন্টার, মা ও শিশুর জন্য পৃথক চিকিৎসাব্যবস্থা এবং বয়স্কদের জন্য ফিজিওথেরাপি সুবিধা। সরকারের মেয়াদকালের মধ্যেই এই পরিকল্পনা বাস্তবায়নের দৃঢ় আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন গৃহায়ণ ও গণপূর্তমন্ত্রী জাকারিয়া তাহের সুমন।
রোববার (১৩ সেপ্টেম্বর) সরকারি সফরসূচির অংশ হিসেবে নোয়াখালী সফরে গিয়ে এক অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেওয়ার সময় তিনি এসব কথা বলেন। এ সময় নোয়াখালী জেলা বিএনপির পক্ষ থেকে মন্ত্রীকে ফুলেল শুভেচ্ছা জানানো হয়।
উপজেলা পর্যায়ে স্বাস্থ্যসেবার মানোন্নয়ন:
মন্ত্রী বলেন, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও আইনশৃঙ্খলা এই তিন খাতই সরকারের প্রধান অগ্রাধিকারের তালিকায় রয়েছে। সাধারণ মানুষের চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে স্বাস্থ্য খাতকে নতুনভাবে ঢেলে সাজানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। উপজেলা পর্যায়ে মানসম্মত চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করা গেলে ছোটখাটো রোগের জন্য মানুষকে আর জেলা শহর কিংবা রাজধানীমুখী হতে হবে না বলে মন্তব্য করেন তিনি।
তিনি জানান, প্রতিটি উপজেলায় ১৫১ শয্যার হাসপাতাল নির্মাণের কাজ ইতিমধ্যে এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে। বিভিন্ন হাসপাতালের জন্য মাটি পরীক্ষা ও নকশা প্রণয়নসহ প্রয়োজনীয় প্রস্তুতিমূলক কাজ গত এক থেকে দেড় মাস ধরে চলছে। বর্তমান সরকারের মেয়াদকালের মধ্যেই এসব হাসপাতাল নির্মাণের কাজ সম্পন্ন করার প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন তিনি।
প্রাথমিক শিক্ষার ভিত্তি মজবুত করার আহ্বান:
স্বাস্থ্যসেবার পাশাপাশি শিক্ষার মানোন্নয়নের প্রসঙ্গও গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরেন জাকারিয়া তাহের সুমন। তিনি বলেন, প্রাথমিক শিক্ষার ভিত্তি মজবুত না হলে মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ে কাঙ্ক্ষিত ফল অর্জন করা কঠিন হয়ে পড়ে। পাঁচ বছর প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়ার পরও কোনো শিক্ষার্থী ষষ্ঠ শ্রেণিতে উঠে বাংলা-ইংরেজি পড়তে কিংবা সাধারণ অঙ্ক করতে না পারলে প্রাথমিক শিক্ষার মূল উদ্দেশ্যই প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
প্রাথমিক শিক্ষার মান বাড়াতে প্রতিটি উপজেলায় জনপ্রতিনিধি, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এবং প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক-প্রধান শিক্ষকদের সমন্বয়ে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানান মন্ত্রী। পাশাপাশি পরীক্ষায় নকলমুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করার ওপরও বিশেষ গুরুত্ব দেন তিনি।
সংকট মোকাবিলায় প্রয়োজন সম্মিলিত উদ্যোগ:
দেশের অর্থনীতি ও বিভিন্ন খাতে বিদ্যমান চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সম্মিলিত প্রচেষ্টার প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরে মন্ত্রী বলেন, সরকার একটি কঠিন পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে দায়িত্ব গ্রহণ করেছে। আন্তর্জাতিক নানা সংকটের প্রভাব দেশের অর্থনীতি, শিল্প খাত ও সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায়ও পড়ছে। তবে এই প্রতিকূলতার মধ্যেও সরকার হাল ছাড়েনি; দেশকে ঘুরে দাঁড় করাতে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে বলে জানান তিনি।
তিনি বলেন, দেশকে এগিয়ে নিতে শুধু সরকারের একক প্রচেষ্টা যথেষ্ট নয়। প্রশাসন, রাজনৈতিক দল, বিরোধী দল, জনপ্রতিনিধি এবং সমাজের সব শ্রেণি-পেশার মানুষকে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করতে হবে। সম্মিলিত প্রচেষ্টার মাধ্যমেই বাংলাদেশকে একটি শক্তিশালী, সমৃদ্ধ ও সম্ভাবনাময় রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে তোলা সম্ভব বলে মন্তব্য করেন তিনি।
মাদক নির্মূলে জরুরি সামাজিক প্রতিরোধ:
মাদকবিরোধী সামাজিক আন্দোলনের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে জাকারিয়া তাহের সুমন বলেন, শুধু আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযান চালিয়ে মাদক নির্মূল করা সম্ভব নয়; এর জন্য প্রয়োজন সর্বস্তরের মানুষের সামাজিক প্রতিরোধ। প্রশাসনের পাশাপাশি রাজনৈতিক নেতৃত্ব, জনপ্রতিনিধি, শিক্ষক, অভিভাবক ও সাধারণ মানুষকে ঐক্যবদ্ধভাবে মাদকের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর আহ্বান জানান তিনি।
নোয়াখালীর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি আরও উন্নত করতে প্রশাসন ও রাজনৈতিক নেতৃত্বের সমন্বিত ভূমিকার ওপর গুরুত্বারোপ করেন মন্ত্রী। বিশেষ করে হাতিয়া অঞ্চলের নদীপথের নিরাপত্তা ও মাদক নিয়ন্ত্রণে নৌ পুলিশের সক্ষমতা বৃদ্ধি, প্রয়োজনীয় জনবল সংযোজন এবং কোস্ট গার্ডের কার্যক্রম জোরদারের বিষয়ে উদ্যোগ নেওয়ার আশ্বাস দেন তিনি।
হাতিয়ার নতুন ভূখণ্ড ঘিরে উন্নয়নের সম্ভাবনা:
নোয়াখালীর ভৌগোলিক ও অর্থনৈতিক সম্ভাবনার কথাও তুলে ধরেন গৃহায়ণ ও গণপূর্তমন্ত্রী। হাতিয়া ও তার আশপাশে জেগে ওঠা সম্ভাবনাময় নতুন ভূখণ্ডকে দেশের গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ হিসেবে অভিহিত করে তিনি বলেন, পরিকল্পিতভাবে এসব অঞ্চলের উন্নয়ন করা গেলে তার ইতিবাচক প্রভাব পড়বে দেশের অর্থনীতি ও জনজীবনে।
উন্নয়ন প্রসঙ্গে তিনি আরও বলেন, কোনো একক মন্ত্রণালয়ের পক্ষে সব উন্নয়নকাজ বাস্তবায়ন করা সম্ভব নয়; সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও বিভাগকে প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দ দিতে হবে। অর্থের সংস্থান হলে উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় সব ধরনের প্রয়োজনীয় কাজ করতে প্রস্তুত বলে জানান তিনি।
নোয়াখালীবাসীর সহযোগিতা কামনা:
বক্তব্যের শেষ পর্যায়ে নোয়াখালীর মানুষের আন্তরিক সহযোগিতা কামনা করে জাকারিয়া তাহের সুমন বলেন, সবাই সম্মিলিতভাবে কাজ করলে দেশের বর্তমান সংকট কাটিয়ে একটি সুন্দর, সমৃদ্ধ ও সম্ভাবনাময় বাংলাদেশ গড়ে তোলা সম্ভব। তিনি নোয়াখালীর সার্বিক উন্নতি ও সমৃদ্ধি কামনা করে জেলার প্রশাসন, জনপ্রতিনিধি, রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ ও সাধারণ মানুষের সহযোগিতা প্রত্যাশা করেন।
অনুষ্ঠানে নোয়াখালী জেলা বিএনপির নেতৃবৃন্দ, প্রশাসনের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তা, রাজনৈতিক নেতাকর্মী এবং বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ উপস্থিত ছিলেন।