মোঃ রাসেল:
বান্দরবানের লামা পৌরসভার ৬নং ওয়ার্ডের কলিঙ্গা পাড়ায় মায়ের দীর্ঘ ৩০ বছরের পুরনো পৈতৃক ও রেজিস্ট্রিকৃত দানপত্রমূলে প্রাপ্ত নিজস্ব দখলীয় ভিটেবাড়িতে নতুন ঘর নির্মাণকে কেন্দ্র করে সম্পূর্ণ উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে একটি ফৌজদারি মামলা দায়েরের অভিযোগ উঠেছে। বিজ্ঞ নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট আদালত, লামায় দায়েরকৃত পিটিশন মামলা নম্বর–৭০/২০২৬ (ধারা: ১৪৫ কার্যবিধি)-তে ১ নম্বর আসামি মোঃ শাহজাহানের বৈধ জায়গা নিয়ে বিরোধের অজুহাতে, শুধুমাত্র তার সঙ্গে আত্মীয়তার সম্পর্ক থাকার জেরে ভিন্ন ভিন্ন এলাকার তিন নির্দোষ বাসিন্দাকে অন্যায়ভাবে জড়িয়ে সামাজিকভাবে হেয়প্রতিপন্ন করা হচ্ছে বলে ভুক্তভোগীরা অভিযোগ করেছেন।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, এই মামলার পেছনে রয়েছে গভীর পারিবারিক প্রতিহিংসা। মামলার ৫নং বিবাদী জেসমিন আক্তারের সম্পত্তি আত্মসাতের একটি সুনির্দিষ্ট অভিযোগ সম্প্রতি তার ভাই মোঃ কবির হোসেন এবং ভাতিজা মোঃ সাদ্দাম হোসেনের (মামলার বাদী) বিরুদ্ধে দায়ের করা হয়। নিজের আপন বোন ও ফুফুর সম্পত্তি গ্রাস করার এই অপচেষ্টায় বাধা দেওয়া এবং আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার পর থেকেই চরম ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন ভাই কবির হোসেন ও ভাতিজা সাদ্দাম হোসেন। সেই পারিবারিক ও সম্পত্তি-সংক্রান্ত ক্ষোভের জের ধরে এবং সম্পূর্ণ প্রতিহিংসামূলকভাবে ১ নম্বর আসামি মোঃ শাহজাহান, ২নং বিবাদী মোঃ আমির হোসেন, ৪নং বিবাদী জোহরা বেগম এবং ৫নং বিবাদী জেসমিন আক্তারের বিরুদ্ধে এই ভিত্তিহীন ও সাজানো মামলার জাল বুনেছেন বাদী সাদ্দাম হোসেন।
মামলার বিবরণ ও জমিজমার নথিপত্র বিশ্লেষণ করে জানা যায়, মামলার ১ নম্বর আসামি মোঃ শাহজাহান দীর্ঘদিন ধরে ওই এলাকায় তার মা সাহেরা খাতুনের দীর্ঘ ৩০ বছরেরও বেশি সময় ধরে ভোগদখলে থাকা পৈতৃক সূত্রে প্রাপ্ত ৬নং ওয়ার্ডের পুরনো ঘরভিটায় শান্তিপূর্ণভাবে বসবাস করে আসছেন। শুধু তাই নয়, মা সাহেরা খাতুন নিজে উপজেলা নির্বাহী অফিসে (ইউএনও অফিস) সশরীরে উপস্থিত হয়ে এই ৩০ বছরের পুরনো পৈতৃক সম্পত্তিটি ছেলে শাহজাহানের নামে বৈধভাবে দানপত্র (হেবা) করে দেন, যা যথাযথ নিয়ম মেনে রেজিস্ট্রিভুক্ত বা রেজিস্ট্রি করা হয়। সম্পূর্ণ বৈধ কাগজপত্র ও দীর্ঘদিনের দখলীয় এই পুরনো ও জরাজীর্ণ ঘরটি ভেঙে সম্প্রতি শাহজাহান যখন নতুন করে ঘর নির্মাণ শুরু করেন, ঠিক তখনই বাদী পক্ষ ঘর নির্মাণে বাধা সৃষ্টি করতে এবং বৈধ জায়গাটি বিতর্কিত করতে আদালতে এই ১৪৫ ধারার পিটিশন মামলা দায়ের করে।
সবচেয়ে আশ্চর্যজনক বিষয় হলো, ১ নম্বর আসামি মোঃ শাহজাহানের ঘর নির্মাণ বা জেসমিন আক্তারের সম্পত্তির এই বিষয়ের সঙ্গে মোঃ আমির হোসেন এবং জোহরা বেগম কোনোভাবেই জড়িত নন। ভুক্তভোগী ও স্থানীয়দের দেওয়া তথ্যমতে, মামলার ২নং বিবাদী মোঃ আমির হোসেন ৬নং ওয়ার্ডের বাসিন্দা হলেও ৪নং বিবাদী জোহরা বেগম ৪নং ওয়ার্ডের চেয়ারম্যান পাড়ার এবং ৫নং বিবাদী জেসমিন আক্তার সম্পূর্ণ ভিন্ন এলাকা অর্থাৎ রূপসীপাড়া ইউনিয়নের বাসিন্দা। নালিশি ভূমির সীমানা বা মালিকানার সঙ্গে তাদের কোনো ধরনের সম্পৃক্ততা না থাকা সত্ত্বেও শুধুমাত্র আত্মীয়তার কারণে তাদেরকে এই মামলায় জড়ানো হয়েছে।
ভুক্তভোগী আসামিরা জানান, “১ নম্বর আসামি মোঃ শাহজাহান ও জেসমিন আক্তার আমাদের আত্মীয় হন। শাহজাহানের মা সাহেরা খাতুনের ৩০ বছরের পুরনো পৈতৃক ও রেজিস্ট্রিকৃত দানপত্রমূলে পাওয়া বৈধ জায়গায় ঘর তোলা এবং জেসমিন আক্তারের সম্পত্তি আত্মসাতের বিরুদ্ধে আইনের আশ্রয় নেওয়া—এই দুটি বিষয়ের ক্ষোভ থেকে বাদী পক্ষ আক্রোশবশত আমাদেরকে এই মিথ্যা মামলায় জড়িয়ে হয়রানি করছে। যেখানে আমরা ভিন্ন ভিন্ন ওয়ার্ড ও ইউনিয়নের বাসিন্দা, সেখানে ওই জায়গার বিরোধের সঙ্গে আমাদের নাম জড়ানোই প্রমাণ করে এই মামলাটি কতটা কাল্পনিক ও ভুয়া।”
ভুক্তভোগী মোঃ আমির হোসেন ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “মোঃ শাহজাহান তার মা সাহেরা খাতুনের রেজিস্ট্রিকৃত দানপত্র পাওয়া বহু বছরের পুরনো দখলীয় ভিটার জরাজীর্ণ ঘর ভেঙে নতুন ঘর তুলছেন। সেখানে ঘর তোলার সঙ্গে বা আমাদের কোনো সম্পর্ক নেই। শুধুমাত্র শাহজাহানের আত্মীয় হওয়ার অপরাধে এবং আমরা ভিন্ন এলাকায় বসবাস করা সত্ত্বেও সমাজে আমাদের মানহানি করা এবং আমাদেরকে আর্থিক ও মানসিকভাবে হয়রানি করার হীন উদ্দেশ্যে এই ভুয়া মামলায় আমাদের নাম ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছে। আমরা এই প্রকাশ্য অন্যায়ের বিরুদ্ধে আইনের যথাযথ প্রতিকার চাই।”
নারী ভুক্তভোগী জোহরা বেগম ও জেসমিন আক্তার বলেন, “একটি পক্ষ নিজেদের স্বার্থ হাসিলের জন্য আমাদের মতো ভিন্ন এলাকার নির্দোষ নারীদেরও আসামি করতে দ্বিধাবোধ করেনি। আত্মীয়তার সম্পর্ককে পুঁজি করে এভাবে আমাদের মিথ্যা মামলায় ফাঁসানোর তীব্র প্রতিবাদ জানাই। আমরা প্রশাসন ও বিজ্ঞ আদালতের কাছে এর সুষ্ঠু তদন্ত ও ন্যায়বিচার দাবি করছি, যাতে ভবিষ্যতে কেউ এমন মিথ্যা মামলা করার সাহস না পায়।”
এলাকাবাসীর মতে, ১ নম্বর আসামির রেজিস্ট্রিকৃত বৈধ দানপত্রের বিষয় কিংবা অভ্যন্তরীণ সম্পত্তি আত্মসাতের বিষয় লুকাতে আত্মীয়তার জেরে ভিন্ন এলাকার সম্পর্কহীন ও নিরীহ মানুষদের আইনি মারপ্যাঁচে ফেলা সুস্পষ্টভাবে আইনের অপব্যবহার এবং একটি পরিকল্পিত হয়রানি।
উল্লেখ্য, গত ০২/০৯/২০২৬ তারিখে বিজ্ঞ আদালত মামলাটি আমলে নিয়ে সহকারী কমিশনার (ভূমি), লামাকে বিষয়টি সরেজমিনে তদন্তপূর্বক প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশ দিয়েছেন। ভুক্তভোগী পরিবারগুলো প্রশাসনের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা এবং বিজ্ঞ আদালতের কাছে এই ভিত্তিহীন মামলা থেকে অবিলম্বে অব্যাহতি এবং উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে মামলাকারীদের বিরুদ্ধে আইনি প্রতিকার ও দৃষ্টান্তমূলক বিচারের দাবি জানিয়েছেন।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে মামলার বাদী মোঃ সাদ্দাম হোসেনের সঙ্গে মোবাইল ফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি। পরবর্তীতে তার সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হলে বা তার বক্তব্য পাওয়া গেলে তা সংবাদে যুক্ত করা হবে।