স্টাফ রিপোর্টার, বরিশাল:
২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার আন্দোলনকে কেন্দ্র করে দেশের বিভিন্ন স্থানে সংঘর্ষ, হামলা, গুলিবর্ষণ ও হতাহতের ঘটনা ঘটে। এসব ঘটনায় দায়ের করা বিভিন্ন মামলায় তৎকালীন ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মীসহ বিভিন্ন ব্যক্তির বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়েছে। এরই ধারাবাহিকতায় সিলেটের যুবলীগ নেতা আমির হোসেন এবং বরিশালের বাপ্পিকে ঘিরে আন্দোলনকারীদের ওপর হামলা, অর্থ ও রসদ জোগান এবং সংঘর্ষে সম্পৃক্ততার অভিযোগ সামনে এসেছে।
অভিযোগ ও মামলার নথি অনুযায়ী, সিলেটের বিভিন্ন এলাকায় আন্দোলনরত শিক্ষার্থী ও ছাত্র-জনতার ওপর সংঘটিত হামলার ঘটনায় আমির হোসেনের নাম আসামি হিসেবে রয়েছে। অন্যদিকে, বরিশাল নগরীর বিভিন্ন এলাকায় আন্দোলন চলাকালে বাপ্পির বিরুদ্ধে হামলায় সম্পৃক্ততার অভিযোগ রয়েছে। তবে এসব অভিযোগের সত্যতা ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের দায় আদালতে প্রমাণিত হওয়ার বিষয়টি বিচারাধীন।
তদন্ত-সংশ্লিষ্ট সূত্র ও প্রত্যক্ষদর্শীদের বরাত দিয়ে জানা গেছে, ২০২৪ সালের ১৮ জুলাই শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (শাবিপ্রবি) এবং আশপাশের আখালিয়া এলাকায় আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের সঙ্গে পুলিশ ও আওয়ামী লীগ-সমর্থিত নেতাকর্মীদের সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। ওই সময় ধাওয়া-পাল্টাধাওয়ার মধ্যে পানিতে পড়ে শাবিপ্রবি শিক্ষার্থী রুদ্র সেনের মৃত্যু হয়। এ ঘটনায় দায়ের করা মামলায় সাবেক সংসদ সদস্য হাবিবুর রহমান হাবিব ও যুবলীগ নেতা আমির হোসেনসহ একাধিক ব্যক্তিকে আসামি করা হয়েছে বলে জানা গেছে।
পরদিন ১৯ জুলাই সিলেটের বন্দরবাজার এলাকায় কোটা সংস্কার আন্দোলনের মিছিলে গুলিবর্ষণ ও টিয়ারশেল নিক্ষেপের ঘটনা ঘটে। ওই ঘটনায় কর্তব্যরত সাংবাদিক এটিএম তুরাব গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হন। একই দিনে সোবহানীঘাট এলাকাতেও আন্দোলনকারীদের সঙ্গে সংঘর্ষ ও হামলার ঘটনা ঘটে। এসব ঘটনায় দায়ের করা মামলা ও তদন্তে বিভিন্ন ব্যক্তির বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠে এসেছে।
এরপর ৫ আগস্ট সরকার পতনের এক দফা দাবিতে দেশব্যাপী কর্মসূচির মধ্যে সিলেটের দক্ষিণ সুরমার ঝালোপাড়া ও হুমায়ূন রশীদ চত্বর এলাকায় আন্দোলনকারীদের সঙ্গে আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। প্রত্যক্ষদর্শীদের দাবি, ওই সময় আমির হোসেন হামলায় নেতৃত্ব দেন। এ ঘটনায় দক্ষিণ সুরমা থানায় দায়ের করা মামলায় হাবিবুর রহমান হাবিব, আমির হোসেনসহ বেশ কয়েকজনকে আসামি করা হয়েছে বলে জানা গেছে।
বরিশালের বাপ্পিকে ঘিরে অভিযোগ
অনুসন্ধানে আরও উঠে এসেছে, জুলাই-আগস্টের আন্দোলনকে কেন্দ্র করে বরিশাল নগরীর নতুল্লাবাদ বাসস্ট্যান্ড ও চৌমাথা এলাকায় সংঘটিত হামলার ঘটনায় বাপ্পির বিরুদ্ধে সম্পৃক্ততার অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয় কয়েকজনের দাবি, আন্দোলন চলাকালে তিনি ও তাঁর সহযোগীরা বিভিন্ন স্থানে অবস্থান নিয়ে হামলায় অংশ নেন।
এ ছাড়া বাপ্পির সঙ্গে সিলেটের আমির হোসেনের ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ ও বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে অংশীদারিত্বের অভিযোগও রয়েছে। স্থানীয় সূত্রগুলোর দাবি, বিভিন্ন সময়ে অবৈধ জুয়া পরিচালনা, আর্থিক লেনদেন এবং রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে অর্থ জোগানের সঙ্গে তাঁদের সম্পৃক্ততা ছিল। তবে এসব অভিযোগের স্বাধীন ও নিরপেক্ষ যাচাই প্রয়োজন।
অভিযোগ রয়েছে, বরিশালের সাবেক মেয়র সেরনিয়াবাত সাদিক আবদুল্লাহর ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত নিরব হোসেন টুটুলের সঙ্গে বাপ্পির যোগাযোগ ছিল। তবে এই সম্পর্কের প্রকৃতি এবং এর সঙ্গে জুলাই-আগস্টের সহিংসতার কোনো প্রত্যক্ষ যোগসূত্র ছিল কি না, তা তদন্তের বিষয়।
মামলা থাকলেও গ্রেপ্তার নিয়ে প্রশ্ন
সিলেট ও বরিশালে দায়ের করা বিভিন্ন মামলায় নাম আসার পরও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা কী অবস্থায় রয়েছেন এবং তাঁদের বিরুদ্ধে আদালতের কোনো গ্রেপ্তারি পরোয়ানা বা আইনগত ব্যবস্থা কার্যকর হয়েছে কি না—এ নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে প্রশ্ন রয়েছে।
স্থানীয় ছাত্র-জনতা ও সচেতন নাগরিকদের দাবি, জুলাই-আগস্টের সহিংসতার প্রতিটি ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া প্রয়োজন। মামলায় যাঁদের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ ও প্রমাণ পাওয়া যাবে, তাঁদের বিরুদ্ধে প্রচলিত আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।
একই সঙ্গে, কোনো ব্যক্তিকে কেবল রাজনৈতিক পরিচয়, অভিযোগ বা মামলায় নাম থাকার ভিত্তিতে অপরাধী হিসেবে চূড়ান্তভাবে চিহ্নিত না করে তদন্ত ও বিচারিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে দায় নির্ধারণের দাবি জানিয়েছেন সচেতন মহল।
এ বিষয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বক্তব্য পাওয়া গেলে তা পরবর্তী প্রতিবেদনে তুলে ধরা হবে।