চারা বিক্রি কমে বিপাকে মুন্সীগঞ্জের কৃষক, ক্ষতির শঙ্কা ২০ কোটি টাকা

জেলা প্রতিনিধি:

শীতের আগাম প্রস্তুতি হিসেবে কোটি টাকার স্বপ্ন বুনেছিলেন মুন্সীগঞ্জের চারা চাষিরা। কিন্তু গত কয়েক দিনের টানা বৃষ্টি ও হঠাৎ পানি বৃদ্ধিতে সেই স্বপ্ন এখন ধসে পড়েছে। জেলার বিভিন্ন জমিতে পানি জমে যাওয়ায় কৃষকরা চারা রোপণ করতে পারছেন না। ফলে জেলায় উৎপাদিত প্রায় ১৫ থেকে ২০ কোটি টাকার সবজি চারা বিক্রিতে চরম ধস নেমেছে।

সরেজমিনে পঞ্চসার ইউনিয়নের ভট্টাচার্যেরবাগ ও কেপিবাগ এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, বাঁশের চাটাইয়ের নিচে রাখা ফুলকপি, বাঁধাকপি, ব্রকলি, টমেটো, বেগুন ও মরিচের চারা বৃষ্টির পানিতে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। কোনো কোনো জমিতে চারা বড় হয়ে গাছে পরিণত হয়েছে। কিন্তু কাঙ্ক্ষিত ক্রেতা না আসায় চাষিদের মধ্যে হতাশা বিরাজ করছে।

ভট্টাচার্যেরবাগ এলাকার কৃষক নজরুল ইসলাম বলেন, ‘তিরিশ-পঁয়ত্রিশ বছর ধরে চারা চাষ করি। এরকম বেচাকেনা কম আগে কোনো বছরই ছিল না। তিরিশ-পঁয়ত্রিশ বছরের খেসারত এবার আমাদের দিতে হবে। বর্ষার শেষে এসে হঠাৎ পানি বৃদ্ধি ও বৃষ্টির কারণে অনেক জায়গায় জমি প্রস্তুত করেও কৃষকরা চারা রোপণ করতে পারছেন না। তাই আমাদের চারাও বিক্রি হচ্ছে না। এখন সরকার যদি আমাদের কিছু সাহায্য করে তাহলে আমরা বাঁচতাম।’

অপর চাষি বারেক মিয়া বলেন, ‘এই বৃষ্টিতে আমাদের অনেক ক্ষতি হয়ে গেছে। আরও যদি বৃষ্টি হয়, তাহলে চারা বাঁচাতে পারব না। খুব লসে আছি। যদি আরও বৃষ্টি হয়, তাহলে তো আমাদের জীবন শেষ।’

অথচ মাত্র এক সপ্তাহ আগেও চিত্র ছিল ভিন্ন। ভোর থেকে বিকেল পর্যন্ত চারা উৎপাদন ও বিক্রিতে ব্যস্ত সময় পার করতেন চাষিরা। বিদেশ থেকে আমদানি করা উন্নতমানের বীজ দিয়ে উচ্চফলনশীল চারা উৎপাদন করায় মুন্সীগঞ্জের চারা দেশের বিভিন্ন এলাকায় একটি পরিচিত নাম হয়ে উঠেছে।

মুন্সীগঞ্জের চাষিরা যেসব বীজ দিয়ে চারা উৎপাদন করেন, সেগুলোর অধিকাংশই জাপান, ইতালিসহ ইউরোপের বিভিন্ন দেশ থেকে আমদানি করা হয়। এসব বীজের প্রতি কেজির দাম ৭০ হাজার টাকা থেকে দেড় লাখ টাকা পর্যন্ত। স্বাধীনতার আগে থেকেই এ এলাকায় চারা উৎপাদন হয়ে আসছে।

জেলার চাহিদা মিটিয়ে মুন্সীগঞ্জের এসব চারা ঢাকার সাভার, শরীয়তপুর, মাদারীপুর, নারায়ণগঞ্জ, মানিকগঞ্জ, রংপুর, সিলেট, হবিগঞ্জ, কুমিল্লা, চাঁদপুরসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে বিক্রি হয়।

চাষি মাসুম শিকদার জানান, জাপান, ইতালিসহ ইউরোপের বিভিন্ন দেশ থেকে আমদানি করা উন্নত জাতের বীজ দিয়ে তারা চারা উৎপাদন করেন। এসব বীজের ১০ গ্রামের দামও ১ হাজার ৫০০ টাকা পর্যন্ত। প্রতি হাজার চারা ১ হাজার থেকে ২ হাজার টাকা দরে বিক্রি হয়।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ১০ হেক্টর জমিতে আগস্ট থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত তিন থেকে চার দফায় ১৫ থেকে ২০ কোটি টাকার চারা বেচাকেনা হয়। প্রায় ২৫ থেকে ৩০ জন উদ্যোক্তা সারা বছর এ ব্যবসার সঙ্গে জড়িত।

চারা ব্যবসায়ীরা জানান, একটি চারা বিক্রির উপযোগী করতে ২৫ থেকে ৩০ দিন শিশুর মতো যত্ন নিতে হয়। রোদ বেশি হলে চাটাই দিয়ে ঢেকে রাখতে হয়। ভারি বৃষ্টি চারার জন্য সবচেয়ে বড় শত্রু। এ ছাড়া ঝড় হলে ঢেকে রাখা চাটাই উড়িয়ে নিয়ে যায়। তখন বৃষ্টির পানি ও বাতাসে চারাগুলো নষ্ট হয়ে যায়। এবার টানা বৃষ্টিই তাদের বড় ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এ অবস্থায় চাষিরা সরকারি সহায়তার দিকে তাকিয়ে আছেন।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক হাবিবুর রহমান বলেন, মুন্সীগঞ্জে বিদেশি উচ্চফলনশীল জাতের বীজ দিয়ে চারা উৎপাদন করায় এখানকার চারা একটি ব্র্যান্ডে পরিণত হয়েছে। এখানকার চারার গুণগত মান ভালো হওয়ায় দেশের বিভিন্ন জেলার চাষিরা এসে এখান থেকে চারা কিনে নিয়ে যান। উচ্চফলনশীল জাতের ব্যবহার বাড়ায় কৃষিতে নবদিগন্তের সূচনা হচ্ছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *