স্টাফ রিপোর্টার:
গাজীপুরের কাপাসিয়া উপজেলা ভূমি অফিসে দীর্ঘদিন ধরে একটি সংঘবদ্ধ সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্য চলছে বলে অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ অনুযায়ী, একসময় নামজারি সহকারী মাহবুবুর রহমানের নেতৃত্বে পরিচালিত ওই সিন্ডিকেটের নেতৃত্ব এখন নাজির শিব্বির আহমেদের হাতে। নেতৃত্বে পরিবর্তন এলেও ঘুষ-দুর্নীতির চর্চা বন্ধ হয়নি বলে দাবি সংশ্লিষ্টদের।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, ২০২০ সাল থেকে কাপাসিয়া উপজেলা ভূমি অফিসকে ঘিরে একটি সংঘবদ্ধ সিন্ডিকেট সক্রিয় রয়েছে বলে অভিযোগ। নামজারি সহকারী মাহবুবুর রহমানের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা এই সিন্ডিকেটের অন্যতম সদস্য হিসেবে সায়রাত সহকারী শিব্বির আহমেদ ও সাবেক নাজির ফারিয়া সরকার ববির নাম উঠে এসেছে। পরবর্তীতে ফারিয়া সরকার ববিকে জেলা প্রশাসক কার্যালয়ের লাইব্রেরি শাখায় বদলি করা হলে নাজিরের দায়িত্ব পান শিব্বির আহমেদ।
মাহবুবুর রহমানের নেতৃত্বাধীন সিন্ডিকেটের ঘুষ-দুর্নীতি নিয়ে ঘটনার আড়ালে-তে একাধিক প্রতিবেদন প্রকাশের পর বিষয়টি নিয়ে ব্যাপক তোলপাড় সৃষ্টি হয়। গত ৫ মে ‘কাপাসিয়া এসিল্যান্ড অফিসে দুর্নীতির রাজত্ব, মাহবুব সিন্ডিকেটের খুঁটির জোর কোথায়?’ শিরোনামে প্রতিবেদন প্রকাশের পর বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয় থেকে তদন্তের নির্দেশ দেওয়া হয় বলে জানা গেছে। তবে ওই নির্দেশের পর তিন মাস পার হলেও তদন্তের অগ্রগতি সম্পর্কে কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।
অভিযোগ রয়েছে, সিন্ডিকেটের কার্যক্রম বন্ধ না হয়ে শুধু নেতৃত্বে পরিবর্তন এসেছে। মাহবুব সিন্ডিকেট এখন শিব্বির সিন্ডিকেটে রূপ নিয়েছে বলে অভিযোগ সংশ্লিষ্টদের। তাদের দাবি, ২০২০ সালের ১ জানুয়ারি থেকে একই কর্মস্থলে থাকা এসব কর্মকর্তা-কর্মচারীর বিরুদ্ধে বিভিন্ন সময়ে অভিযোগ উঠলেও কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়ায় তাদের দৌরাত্ম্য অব্যাহত রয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, নির্ধারিত তিন বছরের পরিবর্তে বিধিবহির্ভূতভাবে কেউ কেউ সাড়ে ছয় বছরেরও বেশি সময় ধরে একই কর্মস্থলে বহাল রয়েছেন।
কাপাসিয়া উপজেলায় আটটি ইউনিয়ন ভূমি অফিসের মাধ্যমে ১১টি ইউনিয়নের ভূমিসেবা কার্যক্রম পরিচালিত হয়। এসব অফিস থেকে প্রতি মাসে প্রায় ৮০০টি নামজারি ও জমাভাগের প্রস্তাব উপজেলা ভূমি অফিসে জমা হয় বলে জানা গেছে।
অভিযোগ অনুযায়ী, বর্তমানে সাধারণ নামজারির ক্ষেত্রে এক একর পর্যন্ত পাঁচ হাজার টাকা এবং এক একরের বেশি জমির জন্য ১০ হাজার টাকা করে নেওয়া হয়। জমির পরিমাণ বেশি হলে ঘুষের অঙ্ক কয়েক গুণ বেড়ে যায় বলেও অভিযোগ রয়েছে। বন্দোবস্তকৃত জমির ক্ষেত্রে ৩০ হাজার থেকে ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত দিতে হয় বলে সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ। টাকা না দিলে নানা কারণ দেখিয়ে আবেদন নামঞ্জুর করা হয় বলেও অভিযোগ উঠেছে। কাগজপত্রে ত্রুটি-বিচ্যুতি থাকলেও মোটা অঙ্কের অর্থের বিনিময়ে কাজ করে দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, নাজির শিব্বির আহমেদ ও নামজারি সহকারী মাহবুবুর রহমান অফিসে ঘুষের রেট নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। সহকারী কমিশনার (ভূমি) বা এসিল্যান্ডরা পুরনো কর্মচারী হিসেবে তাদের পরামর্শ নেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। বর্তমান এসিল্যান্ড নাহিদুল হক যোগদানের পর ঘুষের রেট আরও বেড়েছে বলে অভিযোগ করেছেন সংশ্লিষ্টরা।
অভিযোগ অনুযায়ী, অভিযুক্তরা সরাসরি আবেদনকারীদের সঙ্গে লেনদেন না করে ইউনিয়ন ভূমি অফিসের কর্মচারী ও দালালদের মাধ্যমে টাকা আদায় করেন। এসব টাকা পরে নৈশপ্রহরী পলাশের কাছে জমা দেওয়া হয় বলেও অভিযোগ রয়েছে।
এদিকে এসিল্যান্ড নাহিদুল হকের বিরুদ্ধে অভিযোগ, তার আশ্রয়-প্রশ্রয়ে ভূমি অফিসের কথিত দুর্নীতিগ্রস্তদের দাপট বেড়েছে। বাণিজ্যের একটি বড় অংশ তিনি নিয়ে নেন এবং অবশিষ্ট অর্থ পদ অনুযায়ী অন্যদের মধ্যে ভাগ-বাঁটোয়ারা হয় বলে অভিযোগ করা হয়েছে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে এসিল্যান্ডের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
মিসকেস চলমান থাকলেও নামজারি অনুমোদনের অভিযোগ
কাপাসিয়ার টোক ইউনিয়নের উলুসাড়া মৌজার বিরোধপূর্ণ আরএস ১৫৬ নম্বর খতিয়ানের ৪ একর ১৪ শতাংশ জমির নামজারি ও জমাভাগ করার অভিযোগ উঠেছে। এ-সংক্রান্ত নথি নম্বর ২৩৮৯/২০২৩-২৪। নামজারিটি বাতিলের জন্য প্রতিপক্ষ জামাল উদ্দিন গং গত বছরের ১৯ জুন উপজেলা ভূমি অফিসে একটি মিসকেস দায়ের করেন। মামলাটির নম্বর ১০১/২০২৫।
অভিযোগ অনুযায়ী, মিসকেসটি চলমান থাকা অবস্থায় গত বছরের ১২ অক্টোবর ওই খতিয়ানসহ কয়েকটি খতিয়ানে নতুন করে নামজারির আবেদন করা হয়। আবেদন নম্বর ১৩২৩৩১৫৫ এবং নথি নম্বর ২৫৪৫/২০২৫-২৬। আবেদনকারী আবদুল ওয়াহেদ ঢাকার গুলশানের বাসিন্দা বলে জানা গেছে।
পরবর্তীতে উপজেলা ভূমি অফিস থেকে তদন্ত প্রতিবেদনের জন্য বিষয়টি টোক ইউনিয়ন ভূমি অফিসে পাঠানো হয়। ভূমি উপসহকারী কর্মকর্তা মজিবুর রহমান গত ২০ অক্টোবর তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করেন। এর পরদিন, অর্থাৎ ২১ অক্টোবর, এসিল্যান্ড নাহিদুল হক আবেদিত ৬ একর ৯২ শতাংশ জমির নামজারি অনুমোদন করেন বলে নথিপত্রে উল্লেখ রয়েছে।
তবে নামজারি অনুমোদনের আগে গত ১৫ অক্টোবর ওই মিসকেসটি বদলি করে গাজীপুরের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (শিক্ষা ও আইসিটি) আদালতে নেওয়া হয়। এর বদলি মিস মোকদ্দমা নম্বর ৪২/২০২৫। পক্ষগণকে নোটিশ ও নথির জন্য ধার্য তারিখ ছিল ২৯ অক্টোবর।
অভিযোগকারীদের দাবি, নথিপত্র পর্যালোচনায় দেখা যায়, সংশ্লিষ্ট মিসকেস তখনো নিষ্পত্তি হয়নি। মিসকেস আমলে না নিয়েই গোপনে দ্বিতীয় নামজারি অনুমোদন করা হয়েছে বলে অভিযোগ। পুরো প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন করতে মাত্র এক সপ্তাহ সময় নেওয়া হয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, বিবাদীপক্ষ ওই জমি শিল্প প্রতিষ্ঠান ডিবিএল গ্রুপের কাছে বিক্রি করে দেয়। পরে মালিক নিজের নামে নামজারি করিয়ে নেন। নাজির শিব্বির আহমেদের চুক্তি ও এসিল্যান্ড নাহিদুল হকের উৎসাহে কাজটি অস্বাভাবিক দ্রুততার সঙ্গে সম্পন্ন হয়েছে বলে অভিযোগ। এ ঘটনায় ১৫ লাখ টাকা লেনদেন হয়েছে বলেও অভিযোগ করা হয়েছে।
তবে এ বিষয়ে ভূমি উপসহকারী কর্মকর্তা মজিবুর রহমানের সঙ্গে মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি ঘটনার আড়ালে-কে বলেন, মিসকেসের বিষয়টি তার জানা ছিল না। কোথাও বিষয়টি লেখা ছিল না। হয়তো ডিবিএলের লোকজনের তদবির ছিল।
১৩ লাখ টাকা ঘুষ নেওয়ার অভিযোগ
রায়েদ ইউনিয়নের সাহাবিদ্যারকোট মৌজায় জমি কেনেন সনমানিয়া ইউনিয়নের দক্ষিণগাঁও গ্রামের বাসিন্দা আলম আহমেদ। পরবর্তীতে তিনি নামজারির জন্য আবেদন করলে আপত্তির কারণে একাধিকবার আবেদন নামঞ্জুর হয় বলে জানা গেছে।
অভিযোগ অনুযায়ী, একপর্যায়ে আলম আহমেদের পক্ষে দলিল লেখক রাসেল মোল্লা উপজেলা ভূমি অফিসে গিয়ে নাজির শিব্বির আহমেদের সঙ্গে দেখা করেন। এ সময় শিব্বির আহমেদ ১৩ লাখ টাকা দাবি করেন এবং ওই অর্থের বিনিময়ে সমস্যার সমাধানের আশ্বাস দেন বলে অভিযোগ।
এরপর তিন দফায় শিব্বির আহমেদকে ১৩ লাখ টাকা দেওয়া হয় বলে দাবি করেছেন রাসেল মোল্লা। তার ভাষ্য অনুযায়ী, উপজেলা ভূমি অফিসের দ্বিতীয় তলায় খাবারের কক্ষে প্রথমে পাঁচ লাখ এবং পরবর্তী দুই দফায় চার লাখ টাকা করে দেওয়া হয়। এ লেনদেনের সাক্ষী রয়েছে বলেও দাবি করেন তিনি।
তবে টাকা নেওয়ার পরও নামজারি অনুমোদন করা হয়নি বলে অভিযোগ। পরবর্তীতে আপত্তি প্রদানকারী ব্যক্তির সঙ্গে আলোচনা করে জমির পরিমাণ কমিয়ে নামজারি সম্পন্ন করা হয় বলে জানা গেছে।
রাসেল মোল্লা ঘটনার আড়ালে-কে বলেন, শিব্বির আহমেদ ১৩ লাখ টাকা নিয়েও কাজটি করে দিতে পারেননি। টাকা ফেরত দেওয়ার কথা থাকলেও এখনো ফেরত দেননি। বিষয়টি এসিল্যান্ডকেও জানানো হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।
খাসজমি আত্মসাতের অভিযোগেও মাহবুবের নাম
নাজির শিব্বির আহমেদ ও নামজারি সহকারী মাহবুবুর রহমানের বিরুদ্ধে ঘুষ-দুর্নীতির আরও অভিযোগ রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র দাবি করেছে।
রায়েদ ইউনিয়নের বাগেরহাট মৌজায় মাহবুবুর রহমানের সহযোগিতায় ২ একর ৯৭ শতাংশ খাসজমি আত্মসাতের একটি ঘটনা ঘটেছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। ওই ঘটনায় সাবেক উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এ কে এম লুৎফর রহমান মাহবুবুর রহমানের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য জেলা প্রশাসকের কাছে প্রতিবেদন দাখিল করেছিলেন বলে জানা গেছে।
তবে অভিযোগ রয়েছে, ওই প্রতিবেদন দাখিলের পরও গত প্রায় পৌনে দুই বছরে মাহবুবুর রহমানের বিরুদ্ধে কোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
বক্তব্য মেলেনি সংশ্লিষ্টদের
এসব অভিযোগের বিষয়ে সহকারী কমিশনার (ভূমি) নাহিদুল হক ও নাজির শিব্বির আহমেদের সঙ্গে মোবাইল ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তারা কল ধরেননি। বক্তব্যের বিষয় উল্লেখ করে এসিল্যান্ড নাহিদুল হকের হোয়াটসঅ্যাপে বার্তা পাঠানো হলেও তিনি কোনো জবাব দেননি।
ফলে অভিযোগগুলোর বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি। অভিযোগের সত্যতা যাচাই ও তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা নির্ধারণ করা প্রয়োজন বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।