চট্টগ্রামে হামের পর ডেঙ্গুর দাপট, ২০ দিনে মৃত্যু ১২

নিজস্ব প্রতিবেদক:

একদিকে হামের বিস্তার, অন্যদিকে ডেঙ্গুর ঊর্ধ্বমুখী প্রকোপ—দুই সংক্রামক রোগের চাপ সামলাতে হিমশিম খাচ্ছে চট্টগ্রামের হাসপাতালগুলো। বিশেষ করে শিশু রোগীর সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালের বিভিন্ন ওয়ার্ডে শয্যার বাইরে মেঝেতেও রোগীদের চিকিৎসা নিতে হচ্ছে। কোথাও কোথাও একটি শয্যায় রাখা হচ্ছে দুই শিশুকে। পাশাপাশি সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালগুলোতে বাড়ছে ডেঙ্গু রোগীর চাপ। গুরুতর রোগীদের জন্য আইসিইউ ও কেবিনের সংকটের কথাও জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

চট্টগ্রাম জেলা সিভিল সার্জনের কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, মার্চের মাঝামাঝি থেকে ১৯ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত মহানগর ও জেলার ১৫ উপজেলায় হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে ৮ হাজার ৮০ জন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। তাদের মধ্যে ৭ হাজার ৭৮৪ জন সুস্থ হয়ে ছাড়পত্র পেয়েছেন। বর্তমানে বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন ২৯৬ জন। এ সময়ে হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে ২১ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে পরীক্ষায় হাম নিশ্চিত হওয়ার পর মারা গেছেন ৩ জন। আর হামের উপসর্গ নিয়ে মৃত্যু হয়েছে ১৮ জনের।

হামের পাশাপাশি নতুন করে উদ্বেগ বাড়াচ্ছে ডেঙ্গু। চলতি সেপ্টেম্বরের প্রথম ২০ দিনেই চট্টগ্রামে ডেঙ্গুতে মারা গেছেন ১২ জন। অথচ আগের আট মাসে ডেঙ্গুতে মৃত্যু হয়েছিল ৫ জনের। সেপ্টেম্বরের প্রথম ২০ দিনে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছেন ১ হাজার ৪২৭ জন।

সিভিল সার্জন কার্যালয়ের আরেক হিসাবে, ২০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত চট্টগ্রাম জেলায় ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা ৩ হাজার ৪৬৩ জন এবং এ বছর মৃত্যু হয়েছে ১৭ জনের। চট্টগ্রাম বিভাগে আক্রান্তের সংখ্যা ৩ হাজার ৫০০ ছাড়িয়েছে।

মার্চের মাঝামাঝি চট্টগ্রামে হামের প্রাদুর্ভাব শুরু হওয়ার পর থেকে হাসপাতালগুলোতে রোগীর চাপ ক্রমেই বেড়েছে। গত রোববার এক দিনেই মহানগরে ৭১ জন হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। তবে ওই দিন কোনো উপজেলায় হামের উপসর্গ নিয়ে কেউ ভর্তি হননি।

সম্প্রতি চমেক হাসপাতাল ঘুরে দেখা যায়, হামে আক্রান্ত বা হামের উপসর্গ নিয়ে ভর্তি হওয়া শিশুদের অনেকের অবস্থাই গুরুতর। নিউমোনিয়াসহ বিভিন্ন জটিলতায় আক্রান্ত হচ্ছে শিশুরা। তীব্র গরম ও বিদ্যুৎ-সংকট পরিস্থিতিকে আরও কঠিন করে তুলছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

হামের চিকিৎসার জন্য চমেক হাসপাতালে বিশেষায়িত ওয়ার্ডে শয্যা রয়েছে ৫০টি। পিএসইউ ওয়ার্ডে হামের রোগীদের জন্য রয়েছে আরও ১০টি শয্যা। এর বাইরে বিভিন্ন ওয়ার্ডে রাখা হয়েছে ১৬টি আইসোলেশন শয্যা। কিন্তু রোগীর সংখ্যা এসব শয্যার ধারণক্ষমতার দ্বিগুণের বেশি হওয়ায় অনেক শিশুকে মেঝেতে বিছানা পেতে চিকিৎসা দিতে হচ্ছে। কোথাও একটি শয্যায় দুই শিশুকেও রাখা হচ্ছে।

চট্টগ্রাম বিভাগের স্বাস্থ্য পরিচালক শেখ ফজলে রাব্বি বলেন, হাম প্রতিরোধে টিকাদান এবং আক্রান্ত ব্যক্তিকে পৃথক রাখা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। হাসপাতালে চিকিৎসার পাশাপাশি বাড়িতেও আক্রান্ত রোগীকে অন্যদের থেকে পৃথক রাখতে হবে। তবে হাসপাতালেই যখন রোগীর চাপ ধারণক্ষমতার বাইরে চলে যায়, তখন সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ আরও কঠিন হয়ে পড়ে।

সিভিল সার্জন কার্যালয়ের তথ্যমতে, মার্চ থেকে এ পর্যন্ত হাম পরীক্ষার জন্য ১৬ হাজার ৯৬০টি নমুনা পাঠানো হয়েছে। এর মধ্যে ৭৪৩ জনের শরীরে হাম নিশ্চিত হয়েছে।

মহানগরেই রোগীর চাপ সবচেয়ে বেশি। সেখানে হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ৭ হাজার ৮৯৭ জন। তাদের মধ্যে ৭ হাজার ৬০৯ জন ছাড়পত্র পেয়েছেন। বর্তমানে ভর্তি রয়েছেন ২৮৮ জন। মহানগরে পরীক্ষায় হাম নিশ্চিত হয়েছে ৪৮৬ জনের। হামের উপসর্গ নিয়ে মারা যাওয়া ১৯ ব্যক্তির মধ্যে ১৫ জন মহানগরের।

অন্যদিকে জেলার ১৫ উপজেলায় হামের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ৩৬৮ জন। বর্তমানে ভর্তি রয়েছেন ২৯৫ জন। উপজেলাগুলোতে ২৫৭ জনের শরীরে হাম নিশ্চিত হয়েছে। হামের উপসর্গ নিয়ে মৃত্যু হয়েছে ৪ জনের।

হামের প্রকোপের চিত্রে শুধু আক্রান্তের সংখ্যা নয়, হাসপাতালগুলোর বর্তমান পরিস্থিতিও উদ্বেগ তৈরি করছে। রোগীর চাপের সঙ্গে চিকিৎসা অবকাঠামোর সামঞ্জস্য রাখা কঠিন হয়ে পড়েছে।

চমেক হাসপাতালের হামের বিশেষায়িত ইউনিটে মেঝেতে বিছানা পেতে চিকিৎসা নেওয়া শিশুদের একজন হালিশহরের মো. রিফাত। পরিবারের সদস্যদের দাবি, হাম নিয়ে ২৮ দিন ধরে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন সে। সন্তানের দীর্ঘদিনের অসুস্থতা ও কষ্টে উদ্বিগ্ন তার মা শিরিন আক্তার। তাঁর মতো অনেক অভিভাবককেই সন্তানকে নিয়ে হাসপাতালে দিন-রাত কাটাতে হচ্ছে।

হামের বিস্তার নিয়ে সম্প্রতি একটি গবেষণায় উদ্বেগজনক তথ্য উঠে এসেছে। গবেষণায় দেখা গেছে, হামে আক্রান্ত ১০ শিশুর প্রায় ৬ জনই কোনো না কোনো স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রে সংক্রমিত হয়েছে। গবেষণায় অন্তর্ভুক্ত শিশুদের ৫৯ দশমিক ৪ শতাংশ কোনো না কোনো স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র, ক্লিনিক বা হাসপাতালে অন্য রোগের চিকিৎসা নিতে গিয়ে হামে আক্রান্ত হয়েছে।

গবেষণায় আরও দেখা গেছে, আক্রান্ত শিশুদের ৪৮ শতাংশের বয়স ৯ মাসের কম। অর্থাৎ, বাংলাদেশের নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচিতে হামের প্রথম টিকা নেওয়ার বয়স হওয়ার আগেই তারা সংক্রমিত হয়েছে। আক্রান্ত শিশুদের ৮৫ দশমিক ২ শতাংশই ছিল সম্পূর্ণ টিকাবিহীন। তাদের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ তীব্র অপুষ্টিতে ভুগছিল। গবেষণাটি করেছে এসপেরিয়া হেলথ রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট ফাউন্ডেশন (এআরএফ)।

সিভিল সার্জন কার্যালয়ের হিসাবে, ২০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত চট্টগ্রাম জেলায় ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা ৩ হাজার ৪৬২ জন এবং মৃত্যু হয়েছে ১৭ জনের। বিভাগীয় হিসাবে আট জেলায় আক্রান্তের সংখ্যা ৩ হাজার ছাড়িয়েছে এবং মৃত্যুর সংখ্যাও বেড়েছে। ডেঙ্গুতে মৃতদের মধ্যে নারীর সংখ্যাও বেশি বলে জানিয়েছে বিভাগীয় স্বাস্থ্য দপ্তর। শিশু থেকে শুরু করে গর্ভবতী নারী ও বয়স্ক ব্যক্তিও রয়েছেন মৃত্যুর তালিকায়।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, থেমে থেমে বৃষ্টি ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়ার অন্যতম কারণ। বৃষ্টির পানি বিভিন্ন পাত্র, টায়ার, প্লাস্টিকের সামগ্রী ও বাসাবাড়ির আশপাশে জমে থাকায় সেখানে এডিস মশার প্রজনন বাড়ছে।

চট্টগ্রাম জেলা সিভিল সার্জন মোহাম্মদ সাজেদুর রহমান বলেন, ডেঙ্গুর প্রবণতা হঠাৎ বেড়ে যাওয়ার পেছনে একাধিক কারণ থাকতে পারে। এর মধ্যে আবহাওয়া একটি বড় বিষয়। প্রায় প্রতিদিন থেমে থেমে বৃষ্টি হচ্ছে। জমে থাকা পানিতে এডিস মশার বিস্তার ঘটছে।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ জালাল উদ্দিন বলেন, সরকার সীমিত পরিসরে মশক নিধন কার্যক্রমের জন্য ডিডিটি ব্যবহারের অনুমতি দিয়েছে। চাইলে সীমিত পরিসরে এর ব্যবহার শুরু করা যেতে পারে। মশক নিধন কার্যক্রম পরিচালনার দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের হলেও নাগরিক সচেতনতাও গুরুত্বপূর্ণ।

ডেঙ্গুর প্রকোপ মোকাবিলায় চট্টগ্রাম বিভাগীয় স্বাস্থ্য কার্যালয় নগরীর বিভিন্ন হটস্পটে সচেতনতামূলক প্রচার শুরু করেছে। মাইকিংয়ের পাশাপাশি লিফলেট বিতরণ করা হচ্ছে। আগের লিফলেট শেষ হয়ে যাওয়ায় আরও ৫০ হাজার লিফলেট ছাপানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এগুলো হটস্পটের পাশাপাশি হাসপাতালের বিভিন্ন ওয়ার্ডেও বিতরণ করা হবে।

বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালক শেখ ফজলে রাব্বি বলেন, সেপ্টেম্বরে ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা বেড়েছে। অক্টোবরে আরও বাড়তে পারে বলে তারা আশঙ্কা করছেন। এ কারণে সচেতনতা বাড়াতে মাইকিং ও লিফলেট বিতরণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তবে শুধু সচেতনতামূলক প্রচার নয়, সরকারি পর্যায়ে মশক নিধন কার্যক্রমও জোরদার করা প্রয়োজন বলে মনে করেন সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকেরা।

ডেঙ্গু রোগীদের ক্ষেত্রে চিকিৎসকদের অন্যতম উদ্বেগ ডেঙ্গু শক সিনড্রোম। রোগের তীব্র পর্যায়ে, বিশেষ করে জ্বর কমার সময়, রোগীর শরীর থেকে অতিরিক্ত তরল বেরিয়ে গিয়ে রক্তচাপ কমে যেতে পারে। এতে রোগীর অবস্থা দ্রুত গুরুতর হয়ে উঠতে পারে।

চমেক হাসপাতালের মেডিসিন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক আব্দুর রব বলেন, ডেঙ্গুতে প্লাটিলেট কমে গেলেই কেবল বিপদ হয়—এমন ধারণা ঠিক নয়। অনেক রোগী শকে গিয়ে গুরুতর অবস্থায় পড়ছেন। তাই রোগীর অবস্থা খারাপ হওয়ার অপেক্ষা না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।

চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতালের মেডিসিন বিভাগের সিনিয়র কনসালট্যান্ট এএসএম লুৎফুল কবির শিমুল বলেন, ডেঙ্গুতে শক সিনড্রোম ও এক্সপান্ডেড সিনড্রোম দেখা যাচ্ছে। এতে রক্তচাপ দ্রুত কমে যেতে পারে এবং লিভার, কিডনিসহ বিভিন্ন অঙ্গ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। জ্বর হলে ডেঙ্গু পরীক্ষা করানো এবং ডেঙ্গু শনাক্ত হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।

ঢাকার বাইরে বড় শহরগুলোর মধ্যে চট্টগ্রামেই ডেঙ্গু রোগীর চাপ বেশি হলেও এখানে ডেঙ্গু রোগীদের জন্য আলাদা কোনো ডেডিকেটেড হাসপাতাল নেই। নগরীর মেমন হাসপাতাল, আন্দরকিল্লা জেনারেল হাসপাতাল এবং সীতাকুণ্ডের বিআইটিআইডিসহ বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালে ডেঙ্গু রোগীদের জন্য বিশেষ ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।

চমেক হাসপাতালে প্রতিদিন গড়ে ২৫ থেকে ৩০ জন ডেঙ্গু রোগী চিকিৎসা নিচ্ছেন বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট সূত্র। পাশাপাশি ফৌজদারহাটের বিআইটিআইডি, আন্দরকিল্লা জেনারেল হাসপাতাল, চট্টগ্রাম সিএমএইচ এবং বিভিন্ন বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকেও রোগী ভর্তি হচ্ছেন।

রোগীর চাপ বাড়ায় গুরুতর রোগীদের জন্য আইসিইউ শয্যার সংকট দেখা দিচ্ছে। কেবিনের সংকটের কথাও জানিয়েছেন রোগী ও স্বজনরা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *