রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে মিয়ানমারের ওপর ঐক্যবদ্ধ কূটনৈতিক চাপ বাড়ানোর আহ্বান

অনলাইন ডেস্ক:

রোহিঙ্গা সংকটের সমাধানে মিয়ানমারের ওপর ঐক্যবদ্ধ ও অব্যাহত কূটনৈতিক চাপ বাড়ানোর আহ্বান জানিয়েছে বাংলাদেশ। একই সঙ্গে রোহিঙ্গা ও তাদের আশ্রয়দাতা বাংলাদেশি জনগোষ্ঠীর জন্য আন্তর্জাতিক সহায়তা বৃদ্ধি এবং আন্তর্জাতিক বিচার ও জবাবদিহির প্রক্রিয়ায় সমর্থন অব্যাহত রাখার জন্য ইসলামি সহযোগিতা সংস্থার (ওআইসি) সদস্য দেশগুলোর প্রতি আহ্বান জানানো হয়েছে।

জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশন উপলক্ষে নিউইয়র্কে অনুষ্ঠিত ওআইসির রোহিঙ্গাবিষয়ক কন্টাক্ট গ্রুপের বৈঠকে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে দেওয়া বক্তব্যে এসব আহ্বান জানানো হয়। ওআইসির তথ্য অনুযায়ী, ২০ সেপ্টেম্বর নিউইয়র্কে অনুষ্ঠিত বৈঠকে রোহিঙ্গা সংকটের একটি ব্যাপক ও টেকসই রাজনৈতিক সমাধানের জন্য আন্তর্জাতিক সমন্বয় জোরদারের আহ্বান জানানো হয়।

বাংলাদেশের বক্তব্যে বলা হয়, প্রায় এক দশক ধরে সীমিত সম্পদের মধ্যে থেকেও জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত মিয়ানমারের নাগরিকদের (এফডিএমএন) আশ্রয় দিয়ে আসছে বাংলাদেশ। ২০২৪ সালের শুরু থেকে নতুন করে বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গা বাংলাদেশে প্রবেশ করায় সংকটের ওপর চাপ আরও বেড়েছে। জাতিসংঘের ২০২৬ সালের যৌথ সাড়াদান পরিকল্পনায় (জেআরপি) রোহিঙ্গা শরণার্থী ও আশ্রয়দাতা জনগোষ্ঠীসহ ১৫ লাখ ৬০ হাজার মানুষের জন্য ৭১ কোটি ৫ লাখ মার্কিন ডলার প্রয়োজন বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

বক্তব্যে বলা হয়, রোহিঙ্গা সংকট দীর্ঘায়িত হওয়ায় এটি শুধু মানবিক সংকটের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; এর প্রভাব আঞ্চলিক শান্তি, নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতার ওপরও পড়ছে। অনিয়মিত সমুদ্রপথে যাতায়াত, মানব পাচার ও মাদক পাচারসহ আন্তঃদেশীয় অপরাধের ঝুঁকি বাড়ার কথাও তুলে ধরা হয়।

বাংলাদেশের পক্ষ থেকে বলা হয়, রোহিঙ্গা সংকটের উৎস মিয়ানমারে এবং এর সমাধানও মিয়ানমারেই হতে হবে। তাই রোহিঙ্গাদের নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক, মর্যাদাপূর্ণ ও টেকসই প্রত্যাবাসনই বাংলাদেশের চূড়ান্ত লক্ষ্য। ওআইসির কন্টাক্ট গ্রুপও রোহিঙ্গাদের পূর্ণ নাগরিকত্বসহ অধিকার পুনঃপ্রতিষ্ঠা এবং রাখাইন রাজ্যে নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক, মর্যাদাপূর্ণ ও টেকসই প্রত্যাবাসনের পরিবেশ তৈরির আহ্বান জানিয়েছে।

ওআইসির ২০২৬-২০৩৫ মেয়াদি কর্মপরিকল্পনায় রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনকে অগ্রাধিকার দেওয়াকে বাংলাদেশ স্বাগত জানিয়েছে। একই সঙ্গে প্রত্যাবাসনের উপযোগী পরিবেশ তৈরি না হওয়া পর্যন্ত আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বোঝা ও দায়িত্ব ভাগাভাগি আরও জোরদারের আহ্বান জানানো হয়েছে।

২০২৬ সালের যৌথ সাড়াদান পরিকল্পনায় রোহিঙ্গা ও আশ্রয়দাতা বাংলাদেশি জনগোষ্ঠীর জন্য ৭১ কোটি ৫ লাখ মার্কিন ডলার প্রয়োজন ধরা হয়েছে। জাতিসংঘ জানিয়েছে, এই অর্থায়নের আবেদন ২০২৫ সালের তুলনায় ২৬ শতাংশ কম; তবে এটি প্রয়োজন কমে যাওয়ার প্রতিফলন নয়, বরং অগ্রাধিকারভিত্তিক অর্থায়নের প্রতিফলন।

এ অবস্থায় রোহিঙ্গা সংকটে জরুরি, পূর্বানুমেয় ও দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক সহায়তা দিতে ওআইসি সদস্য দেশগুলোর প্রতি আহ্বান জানানো হয়েছে। প্রায় এক দশক ধরে সংকটের ভার বহন করে আসা বাংলাদেশের আশ্রয়দাতা জনগোষ্ঠীকেও আন্তর্জাতিক সহায়তার আওতায় রাখার আহ্বান জানানো হয়।

রোহিঙ্গাদের জন্য আন্তর্জাতিক বিচার ও জবাবদিহির বিষয়টিও বক্তব্যে গুরুত্ব পেয়েছে। মিয়ানমারের বিরুদ্ধে গাম্বিয়ার করা মামলাসহ আন্তর্জাতিক বিচারিক প্রক্রিয়ায় ওআইসি সদস্য দেশগুলোর সমর্থনের বিষয়টি তুলে ধরে এ সমর্থন অব্যাহত রাখার আহ্বান জানানো হয়েছে।

রোহিঙ্গা সংকট মোকাবিলায় তিনটি তাৎক্ষণিক অগ্রাধিকারও তুলে ধরা হয়। এগুলো হলো—জাতিসংঘ ও আসিয়ানের সঙ্গে সমন্বিতভাবে মিয়ানমারের ওপর কূটনৈতিক চাপ অব্যাহত রাখা, ২০২৬ সালের যৌথ সাড়াদান পরিকল্পনার জন্য জরুরি ও পূর্বানুমেয় অর্থায়ন নিশ্চিত করা এবং আন্তর্জাতিক বিচার ও জবাবদিহির প্রক্রিয়াকে আরও শক্তিশালী করা।

বাংলাদেশের বক্তব্যে বলা হয়, সময়ের সঙ্গে রোহিঙ্গা সংকটকে স্বাভাবিক ঘটনায় পরিণত করা যাবে না। মানবিক সহায়তার ক্লান্তি যেন রাজনৈতিক উদাসীনতায় পরিণত না হয়, সে বিষয়ে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে সক্রিয় থাকতে হবে।

এদিকে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতির কার্যালয়ও ২১ সেপ্টেম্বর মিয়ানমারবিষয়ক জাতিসংঘের বিশেষ দূতের সঙ্গে বৈঠকে রোহিঙ্গাদের পরিস্থিতি, শরণার্থী আশ্রয়দাতা দেশগুলোর প্রতি আন্তর্জাতিক সহায়তা এবং সংকটের মূল কারণ মোকাবিলার গুরুত্ব তুলে ধরেছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *