উত্তর কোরিয়ার নতুন হাইপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা, শনাক্ত ও প্রতিহত করা কঠিন

আন্তর্জাতিক ডেস্ক:

ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষাব্যবস্থাকে ফাঁকি দিতে সক্ষম বলে ধারণা করা হচ্ছে উত্তর কোরিয়ার নতুন একটি হাইপারসনিক অস্ত্রকে। দেশটি সম্প্রতি অত্যাধুনিক এই অস্ত্রের পরীক্ষা চালিয়েছে। সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, ক্ষেপণাস্ত্রটির গতিপথ শনাক্ত করা এবং আকাশে তা ধ্বংস করা অত্যন্ত কঠিন হতে পারে।

দক্ষিণ কোরিয়া ও জাপান জানিয়েছে, গত রোববার উত্তর কোরিয়ার পূর্ব উপকূল থেকে দুটি স্বল্পপাল্লার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়া হয়েছে। এ উৎক্ষেপণকে আঞ্চলিক শান্তি ও নিরাপত্তার জন্য হুমকি উল্লেখ করে এর নিন্দা জানিয়েছে সিউল ও টোকিও।

তবে পরীক্ষিত অস্ত্রটির সুনির্দিষ্ট নাম প্রকাশ করেনি উত্তর কোরিয়া। দেশটির ক্ষেপণাস্ত্র ব্যুরো জানিয়েছে, অত্যাধুনিক প্রতিরক্ষা প্রযুক্তির কার্যকারিতা প্রদর্শনের অংশ হিসেবে নতুন ধরনের একটি অস্ত্রের সফল পরীক্ষা চালানো হয়েছে।

বিশ্লেষকদের ধারণা, পরীক্ষিত অস্ত্রটি উত্তর কোরিয়ার আগের স্বল্পপাল্লার ‘হোয়াসংফো-১১এমএ-১’ হাইপারসনিক ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের উন্নত সংস্করণ হতে পারে।

সিউলের ইউনিভার্সিটি অব নর্থ কোরিয়ান স্টাডিজের সাবেক প্রেসিডেন্ট ইয়াং মু-জিন এএফপিকে বলেন, ৪৫০ থেকে ৬০০ কিলোমিটার পাল্লার এই হাইপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্রটি অল্প সময়ের মধ্যে পুরো কোরীয় উপদ্বীপের গুরুত্বপূর্ণ সামরিক স্থাপনায় আঘাত হানার উপযোগী করে তৈরি করা হয়েছে।

উত্তর কোরিয়ার রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম প্রকাশিত ছবিতে দেশটির নেতা কিম জং উন ও তার কন্যা জু আয়ে একটি স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থাকতে দেখা যায়। স্ক্রিনে ‘হোয়াসংফো-১১এমএ-১ ফ্লাইট ট্র্যাজেক্টরি’ লেখা ক্ষেপণাস্ত্রটির সম্ভাব্য উড্ডয়নপথ প্রদর্শিত হয়।

দেশটির সরকারি বার্তা সংস্থা কোরিয়ান সেন্ট্রাল নিউজ এজেন্সি (কেসিএনএ) জানিয়েছে, চলতি সপ্তাহে কিম জং উন সতর্ক করে বলেছেন, অস্ত্রের এমন অগ্রগতি শত্রুপক্ষের জন্য বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ তৈরি করবে।

জাতিসংঘের দীর্ঘদিনের নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও উত্তর কোরিয়া নিজেকে পারমাণবিক শক্তিধর রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। দেশটির নেতারা তাদের পারমাণবিক অস্ত্রভাণ্ডার স্থায়ী ও অপরিবর্তনীয় রাখার কথাও বারবার বলে আসছেন।

এদিকে ঐতিহ্যবাহী মিত্র চীনের পাশাপাশি উত্তর কোরিয়া রাশিয়ার কাছ থেকেও গুরুত্বপূর্ণ সমর্থন পাচ্ছে। এর ফলে ওয়াশিংটনের সঙ্গে নতুন করে কূটনৈতিক আলোচনায় বসার আগ্রহ পিয়ংইয়ংয়ের কমে গেছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।

উত্তর কোরীয় গবেষক আন চান-ইল এএফপিকে বলেন, উত্তর কোরিয়া তাদের সামরিক সক্ষমতার কথা বাড়িয়ে বলতে পারে। তবে এ ধরনের সামরিক ক্ষমতাসম্পন্ন অস্ত্র উৎক্ষেপণের সক্ষমতা দেশটি অর্জন করেছে বলে তিনি মনে করেন।

তার মতে, এসব পরীক্ষা নিজেদের সামরিক সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি রাশিয়ার যুদ্ধকালীন চাহিদা মেটাতে উত্তর কোরিয়ায় তৈরি অস্ত্র পরখ করার উদ্দেশ্যেও হয়ে থাকতে পারে।

বিশ্লেষকেরা বলছেন, ২০২২ সালে ইউক্রেনে রাশিয়ার আক্রমণের পর থেকে উত্তর কোরিয়া ক্রেমলিনের অন্যতম প্রধান মিত্রে পরিণত হয়েছে। অর্থনৈতিক সুবিধা ও সামরিক প্রযুক্তির বিনিময়ে মস্কোর যুদ্ধপ্রচেষ্টায় সহায়তা করতে উত্তর কোরিয়া সেনা পাঠিয়েছে বলেও তারা উল্লেখ করেন।

সিউলভিত্তিক কোরিয়া ইনস্টিটিউট ফর মিলিটারি অ্যাফেয়ার্সের জ্যেষ্ঠ গবেষক হং সুং-পিও বলেন, দক্ষিণ কোরিয়ার বিরুদ্ধে ব্যবহার করা হলে এই হাইপারসনিক অস্ত্র বড় ধরনের হুমকি তৈরি করতে পারে।

তবে তিনি বলেন, একটি সফল পরীক্ষাই অস্ত্রটির চূড়ান্ত সক্ষমতা প্রমাণের জন্য যথেষ্ট নয়। কিন্তু এটি বাস্তবে মোতায়েন করা হলে এর বিরুদ্ধে কার্যকর প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা তৈরি করা কঠিন হয়ে পড়তে পারে।

হং সুং-পিওর মতে, ক্ষেপণাস্ত্রটি উড্ডয়নের শেষ ধাপে নিচে নামার সময় গতিপথ পরিবর্তন করতে পারে। ফলে সাধারণ ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের তুলনায়, বিশেষ করে হাইপারসনিক গতিতে চলার সময়, এর গতিপথ শনাক্ত ও প্রতিহত করা আরও কঠিন হতে পারে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *