মোঃ আনজার শাহ:
নিজস্ব এলাকায় এক জনসভায় গৃহায়ণ ও গণপূর্তমন্ত্রী জাকারিয়া তাহের সুমন শিক্ষা, স্বাস্থ্য, জ্বালানি ও অবকাঠামো উন্নয়ন নিয়ে বিস্তারিত পরিকল্পনার কথা তুলে ধরেছেন। তিনি বলেন, সরকার জনগণের প্রকৃত চাহিদাকে অগ্রাধিকার দিয়ে কাজ করছে এবং স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও বিদ্যুৎ খাতে দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা বাস্তবায়নের পথে রয়েছে।
শিক্ষাব্যবস্থায় স্বচ্ছতা ফেরানোর অঙ্গীকার:
মন্ত্রী বলেন, পরীক্ষায় নকলের সুযোগ বন্ধ করার ফলে সাম্প্রতিক পাসের হার কমে যাওয়াকে ইতিবাচক পদক্ষেপ হিসেবে দেখা উচিত। তাঁর ভাষায়, স্বয়ংক্রিয়ভাবে সবাইকে পাস করিয়ে দেওয়া প্রকৃত শিক্ষা নয়, বরং জাতিকে দুর্বল করে রাখার একটি কৌশল। তিনি অভিযোগ করেন, প্রতিবেশী দেশ চায় না বাংলাদেশ শিক্ষিত ও স্বাবলম্বী জাতি হিসেবে দাঁড়িয়ে যাক। একই সঙ্গে তিনি শিক্ষক, অভিভাবক ও স্কুল ম্যানেজিং কমিটিকে শিক্ষার মান নিশ্চিত করতে সক্রিয় ভূমিকা রাখার আহ্বান জানান, কারণ শুধু ভবন নির্মাণেই শিক্ষার উন্নয়ন সম্ভব নয়।
দক্ষ জনশক্তি গড়ে তুলতে বগুড়ায় একটি কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র (টিটিসি) নির্মাণের কাজ শিগগিরই শুরু হচ্ছে বলে জানান তিনি। জমি অধিগ্রহণ ইতোমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে এবং আগামী বছরের মধ্যে নির্মাণকাজ শুরু হবে। এখান থেকে প্রশিক্ষণ নিয়ে জাপানি বা কোরীয় ভাষা শিখে দক্ষ হয়ে বিদেশ গেলে অদক্ষ শ্রমিকের তুলনায় কয়েকগুণ বেশি আয়ের সুযোগ তৈরি হবে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
প্রতিটি উপজেলায় আধুনিক হাসপাতাল:
স্বাস্থ্যখাতকে সরকারের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকারের একটি হিসেবে উল্লেখ করে মন্ত্রী জানান, আগামী রমজানের মধ্যেই তাঁর এলাকায় ১৫০ শয্যাবিশিষ্ট একটি হাসপাতাল চালু হতে যাচ্ছে। এই হাসপাতালে আইসিইউ, সিসিইউ, এইচডিইউ, ডায়ালাইসিস সেন্টার, মাতৃস্বাস্থ্য সুবিধা এবং বয়স্কদের জন্য ফিজিওথেরাপি সুবিধা থাকবে। লক্ষ্য হলো, সাধারণ মানুষকে চিকিৎসার জন্য কুমিল্লা বা ঢাকায় ছুটতে না হওয়া। তিনি জানান, দেশব্যাপী প্রতিটি উপজেলায় একই মানের হাসপাতাল নির্মাণের পরিকল্পনা তাঁর মন্ত্রণালয় বাস্তবায়ন করছে এবং কাজ ইতোমধ্যে চলমান।
সৌরবিদ্যুতে স্বনির্ভরতার ডাক
জ্বালানি সংকটের প্রসঙ্গ টেনে মন্ত্রী বলেন, ইরান-সংশ্লিষ্ট যুদ্ধের কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে তেল ও গ্যাসের দাম কয়েকগুণ বেড়েছে, যার প্রভাব দেশের বিদ্যুৎ খাতেও পড়েছে। তিনি এ পরিস্থিতির জন্য বিগত সরকারের ভুল জ্বালানি নীতিকে দায়ী করেন, বিশেষত নতুন গ্যাসক্ষেত্র অনুসন্ধানে দীর্ঘদিনের অবহেলার কথা উল্লেখ করেন।
সমাধান হিসেবে তিনি জানান, আগামী পাঁচ বছরে দেশে ১০ হাজার মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিকল্পনা নিয়েছে সরকার। স্কুলের ছাদে সৌরপ্যানেল বসিয়ে বিদ্যুৎ বিল শূন্যে নামিয়ে আনার পাশাপাশি উদ্বৃত্ত বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে সরবরাহের পরিকল্পনার কথাও তিনি তুলে ধরেন। বাড়িতে সৌরপ্যানেল স্থাপনে সবাইকে উৎসাহিত করে তিনি বলেন, সরকার আগামী তিন বছর উৎপাদিত অতিরিক্ত বিদ্যুৎ কিনে নেবে, ফলে বিনিয়োগ থেকে বাড়তি আয়ও সম্ভব।
যোগাযোগ অবকাঠামোয় একাধিক নতুন উদ্যোগ:
মন্ত্রী একাধিক নতুন সড়ক প্রকল্পের ঘোষণা দেন কাঞ্চন খাল সংলগ্ন এলাকা থেকে মুজাফফরগঞ্জ পর্যন্ত একটি সংযোগ সড়ক, যা ঢাকা-কুমিল্লা-চাঁদপুর মহাসড়কের সঙ্গে যুক্ত হবে। এ ছাড়া স্থানীয় বাজার এলাকা এড়িয়ে স্কুলের সামনে দিয়ে একটি বিকল্প সড়কের অনুমোদনও ইতোমধ্যে পাওয়া গেছে বলে জানান তিনি। এলাকায় একটি মিনি স্টেডিয়াম ও স্পোর্টস কমপ্লেক্স নির্মাণেরও পরিকল্পনা রয়েছে। পুরনো একটি সড়ক ২৪ ফুট প্রশস্ত করার উদ্যোগও প্রক্রিয়াধীন বলে তিনি উল্লেখ করেন।
মাদকের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান:
বক্তব্যে সবচেয়ে জোরালো অংশ ছিল মাদকবিরোধী আহ্বান। মন্ত্রী উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, এলাকায় মাদকাসক্তির কারণে সামাজিক অপরাধ বাড়ছে এবং সম্প্রতি কুমিল্লায় মাদকাসক্ত এক সন্তানের হাতে মায়ের মৃত্যুর ঘটনা উল্লেখ করে তিনি এর ভয়াবহতা তুলে ধরেন। তিনি জানান, সাম্প্রতিক সংসদ অধিবেশনে মাদকবিরোধী আইন আরও কঠোর করা হয়েছে এবং আগামীতে এ বিষয়ে কোনো ছাড় দেওয়া হবে না। দলীয় কোনো নেতাকর্মী মাদক ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত থাকলে তাদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে তিনি স্পষ্ট হুঁশিয়ারি দেন। স্থানীয় বাসিন্দাদের প্রতি তিনি আহ্বান জানান, মাদক ব্যবসায়ীদের সম্পর্কে তথ্য দিয়ে প্রশাসনকে সহযোগিতা করে একটি সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে।
রাজনৈতিক অবস্থান ও ব্যক্তিগত অনুভূতি:
রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ মোকাবিলার প্রসঙ্গে মন্ত্রী বলেন, প্রশাসন বা পুলিশকে ব্যবহার করে নয়, বরং সাংগঠনিক শক্তি দিয়েই রাজনৈতিকভাবে প্রতিপক্ষের মোকাবিলা করতে চান তাঁরা। বক্তব্যের শেষদিকে তিনি ব্যক্তিগত আবেগ প্রকাশ করে জানান, পরদিন তাঁর প্রয়াত পিতার মৃত্যুবার্ষিকী, এবং দীর্ঘ ১৫ বছর পর একটি হাসপাতাল নির্মাণের মধ্য দিয়ে পিতার স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানানো হচ্ছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
সবশেষে উপস্থিত জনতার ধৈর্য ও উপস্থিতির জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে মন্ত্রী এলাকাবাসীকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের খেলাধুলা কার্যক্রমে সম্পৃক্ত থাকা ও সামাজিক সচেতনতা বজায় রাখার আহ্বান জানিয়ে বক্তব্য শেষ করেন।