মানিকগঞ্জ বিআরটিএতে দায়িত্ব পালন করছেন মাহবুব কামাল, অভিযোগের পক্ষে মেলেনি নির্দিষ্ট প্রমাণ

নিজস্ব প্রতিবেদক:

বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) মানিকগঞ্জ সার্কেলের সহকারী পরিচালক (ইঞ্জিঃ) হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন মাহবুব কামাল। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, তিনি ২৬ জানুয়ারি ২০২২ তারিখে এ পদে যোগ দেন। দীর্ঘদিন ধরে একই সার্কেলে দায়িত্ব পালনের কারণে তাঁর বিরুদ্ধে বিভিন্ন ধরনের অভিযোগ উঠলেও এসব অভিযোগের স্বাধীন ও নিরপেক্ষ সত্যতা এখনো নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি।

সম্প্রতি মাহবুব কামালের বিরুদ্ধে ঘুষ গ্রহণ, অনিয়ম, দুর্নীতি এবং অবৈধভাবে অর্থ-সম্পদ অর্জনের অভিযোগ তোলা হয়েছে। অভিযোগকারীদের পক্ষ থেকে তাঁর নামে-বেনামে ফ্ল্যাট, বাড়ি ও গাড়ি থাকার দাবিও করা হয়েছে। তবে এসব সম্পদের বিষয়ে নির্দিষ্ট নথি, আদালতের কোনো সিদ্ধান্ত কিংবা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তদন্ত প্রতিবেদন এই প্রতিবেদনের হাতে নেই।

অভিযোগকারীদের দাবি, বিআরটিএর বিভিন্ন সেবা নিতে আসা সেবাপ্রত্যাশীদের কাছ থেকে নির্ধারিত সরকারি ফি’র বাইরে অতিরিক্ত অর্থ আদায় করা হয়। বিশেষ করে ড্রাইভিং লাইসেন্স পরীক্ষা, যানবাহনের মালিকানা পরিবর্তন, রেজিস্ট্রেশন ও ফিটনেস সংক্রান্ত সেবায় ঘুষ লেনদেনের অভিযোগ করা হয়েছে।

তবে অভিযোগগুলোর বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—এসব দাবির পক্ষে সুনির্দিষ্ট নথি বা সরকারি তদন্তের ফলাফল প্রকাশ্যে পাওয়া যায়নি। ফলে অভিযোগগুলোকে সরাসরি সত্য ঘটনা হিসেবে বিবেচনা করার সুযোগ নেই।

ড্রাইভিং লাইসেন্স পরীক্ষা নিয়ে কয়েকজন সেবাপ্রত্যাশীর অভিযোগের কথাও বলা হয়েছে। তাঁদের দাবি, ঘুষ দিতে রাজি না হলে পরীক্ষায় অকৃতকার্য দেখানো হয় এবং অর্থ দিলে উত্তীর্ণ হওয়ার সুযোগ তৈরি করা হয়। কিন্তু এসব অভিযোগের সমর্থনে পরীক্ষার ফলাফল, লিখিত অভিযোগ, অর্থ লেনদেনের প্রমাণ কিংবা কোনো সরকারি তদন্ত প্রতিবেদন পাওয়া যায়নি।

মালিকানা বদলি শাখায় ফাইল আপডেট ও ডাটা এন্ট্রির নামে ১০ থেকে ৫০ হাজার টাকা, রেজিস্ট্রেশন শাখায় ফাইল সম্পন্ন ও স্বাক্ষরের জন্য ১০ থেকে ২০ হাজার টাকা এবং ফিটনেস সংক্রান্ত কাগজপত্রের জন্য ৫ থেকে ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত নেওয়ার অভিযোগও করা হয়েছে।

এ ধরনের অভিযোগ গুরুতর হলেও অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণে সংশ্লিষ্ট সেবাপ্রত্যাশীর লিখিত অভিযোগ, অর্থ লেনদেনের প্রমাণ, সরকারি রসিদ, সংশ্লিষ্ট ফাইলের নথি এবং দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের বক্তব্য গুরুত্বপূর্ণ। এসব প্রমাণ ছাড়া অভিযোগের সত্যতা সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সম্ভব নয়।

অভিযোগকারীদের কেউ কেউ বিআরটিএ কার্যালয়ের উচ্চমান সহকারী মো. শাহ আলমের নামও উল্লেখ করেছেন। তাঁদের দাবি, বিভিন্ন কাজের ক্ষেত্রে তাঁর মাধ্যমে অর্থ লেনদেন করা হয়। তবে শাহ আলমকে মাহবুব কামালের ঘনিষ্ঠ হিসেবে উল্লেখ করা কিংবা অর্থ লেনদেনে তাঁর ভূমিকার দাবিরও স্বাধীন প্রমাণ এই প্রতিবেদনের হাতে নেই।

অভিযোগের আরেকটি অংশে বলা হয়েছে, দূরদূরান্ত থেকে ড্রাইভিং লাইসেন্স পরীক্ষা দিতে আসা সেবাপ্রত্যাশীদের বিভিন্নভাবে হয়রানি করা হয়। ঘুষ দিতে অপারগতা প্রকাশ করলে আইনি জটিলতার ভয় দেখানো কিংবা পরীক্ষায় অকৃতকার্য করার অভিযোগও রয়েছে। কিন্তু এসব অভিযোগের ক্ষেত্রেও নির্দিষ্ট কোনো তদন্ত প্রতিবেদন বা প্রামাণ্য নথি পাওয়া যায়নি।

অন্যদিকে, বিআরটিএ মানিকগঞ্জ সার্কেলের সহকারী পরিচালক হিসেবে মাহবুব কামালের সরকারি কার্যক্রম ও বিভিন্ন অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণের তথ্যও বিভিন্ন সময়ে প্রকাশিত হয়েছে। জাতীয় সড়ক নিরাপত্তা দিবসের একটি অনুষ্ঠানে তিনি ড্রাইভিং লাইসেন্স প্রদানের ক্ষেত্রে নির্ধারিত প্রক্রিয়া অনুসরণের ওপর গুরুত্বারোপ করেছিলেন।

সড়ক নিরাপত্তা, যানবাহন ব্যবস্থাপনা এবং বিআরটিএর বিভিন্ন সেবা নিয়ে সরকারি কার্যক্রমের অংশ হিসেবেও তিনি দায়িত্ব পালন করছেন। একজন সরকারি কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলেই তা প্রমাণিত হয়েছে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো আইনগত ও সাংবাদিকতার দৃষ্টিকোণ থেকে সমীচীন নয়।

বিশেষ করে ঘুষ ও দুর্নীতির অভিযোগের ক্ষেত্রে অভিযোগকারী কে, কী প্রমাণ রয়েছে, অর্থের লেনদেন কীভাবে হয়েছে, সংশ্লিষ্ট সরকারি নথিতে তার প্রতিফলন আছে কি না এবং কোনো তদন্তকারী সংস্থা বিষয়টি যাচাই করেছে কি না—এসব বিষয় বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।

মাহবুব কামালের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের ক্ষেত্রে এখন পর্যন্ত এমন কোনো সরকারি তদন্ত প্রতিবেদন এই প্রতিবেদনের হাতে আসেনি, যেখানে তাঁকে ঘুষ গ্রহণ বা দুর্নীতির জন্য দায়ী করা হয়েছে। একইভাবে তাঁর বিরুদ্ধে কোনো আদালতের রায় বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের তথ্যও পাওয়া যায়নি।

ফলে অভিযোগ ও প্রমাণের বিষয়টি আলাদা করে দেখা জরুরি। অভিযোগ থাকলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ তা তদন্ত করতে পারে। তদন্তে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। আবার অভিযোগের পক্ষে প্রমাণ না পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার বিরুদ্ধে প্রচারিত অভিযোগের দায়ও পুনর্মূল্যায়নের প্রয়োজন হতে পারে।

মানিকগঞ্জ বিআরটিএর সহকারী পরিচালক হিসেবে মাহবুব কামাল ২০২২ সালের জানুয়ারি থেকে দায়িত্ব পালন করছেন। একই কর্মস্থলে দীর্ঘ সময় দায়িত্ব পালন করাকে কেন্দ্র করে কোনো পক্ষের অভিযোগ থাকলেও শুধু কর্মস্থলে দীর্ঘদিন থাকার বিষয়টি নিজে কোনো অনিয়মের প্রমাণ নয়।

তাঁর বিরুদ্ধে সম্পদ অর্জনের যে অভিযোগ করা হয়েছে, সেটিও যাচাই করতে হলে সম্পদের দলিল, ক্রয়মূল্য, মালিকানার তথ্য, আয়কর নথি, ব্যাংক লেনদেনসহ সংশ্লিষ্ট সরকারি ও আর্থিক নথি পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। এসব নথি ছাড়া কোনো সম্পদকে অবৈধ বা ঘুষের অর্থে অর্জিত বলে চিহ্নিত করা সমীচীন নয়।

একইভাবে বিআরটিএর সেবায় অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের অভিযোগ যাচাই করতে হলে নির্ধারিত সরকারি ফি, সংশ্লিষ্ট সেবার আবেদন, সরকারি রসিদ এবং অভিযোগকারীর প্রদত্ত অর্থের প্রমাণ পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।

এ কারণে মাহবুব কামালের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলো নিয়ে নিরপেক্ষ তদন্ত হলে প্রকৃত তথ্য সামনে আসতে পারে। অভিযোগ সত্য হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া যেমন প্রয়োজন, তেমনি অভিযোগের পক্ষে প্রমাণ না থাকলে একজন সরকারি কর্মকর্তার ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয় এমন তথ্য প্রচার থেকেও সতর্ক থাকা জরুরি।

সব মিলিয়ে, মাহবুব কামালের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অভিযোগ উত্থাপিত হলেও বর্তমানে এসব অভিযোগের স্বাধীন ও নিরপেক্ষ সত্যতা নিশ্চিত করার মতো নির্দিষ্ট প্রমাণ পাওয়া যায়নি। সরকারি তথ্য অনুযায়ী তিনি এখনো বিআরটিএ মানিকগঞ্জ সার্কেলের সহকারী পরিচালক (ইঞ্জিঃ) হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *