তিগ্রেতে তিন বিমানবন্দরের নিয়ন্ত্রণ, বাড়ছে নতুন যুদ্ধের আশঙ্কা

অনলাইন ডেস্ক:

ইথিওপিয়ার উত্তরের তিগ্রে অঞ্চলে আবারও উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছে। বুধবার (২৩ সেপ্টেম্বর) তিগ্রের আঞ্চলিক বাহিনী তিনটি বিমানবন্দরের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার পর বিভিন্ন এলাকায় কেন্দ্রীয় সরকারের সেনাদের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়িয়েছে। কয়েক মাস ধরে চলা উত্তেজনার মধ্যে এ ঘটনাকে নতুন করে বড় ধরনের সামরিক সংঘাতের আশঙ্কার ইঙ্গিত হিসেবে দেখা হচ্ছে।

রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তিগ্রের বাহিনী মেকেলে, শিরে ও আকসুম এলাকায় থাকা বিমানবন্দরগুলোর নিয়ন্ত্রণ নেয়। পরিস্থিতির কারণে ইথিওপিয়ান এয়ারলাইনস তিগ্রে অঞ্চলে ফ্লাইট চলাচল স্থগিত করেছে। এর আগে মেকেলে বিমানবন্দর নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার বিষয়টি স্থানীয় সূত্রগুলোও নিশ্চিত করে।

২০২০ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত তিগ্রে পিপলস লিবারেশন ফ্রন্ট (টিপিএলএফ) ও ইথিওপিয়ার কেন্দ্রীয় সরকারের বাহিনীর মধ্যে ভয়াবহ যুদ্ধ হয়েছিল। আফ্রিকান ইউনিয়নের মধ্যস্থতায় ২০২২ সালের নভেম্বরে দক্ষিণ আফ্রিকার প্রিটোরিয়ায় শান্তিচুক্তি হয়। ওই চুক্তির মাধ্যমে যুদ্ধের অবসান হলেও দুই পক্ষের মধ্যে আস্থার সংকট পুরোপুরি কাটেনি। ওই যুদ্ধে কয়েক লাখ মানুষ নিহত হয় বলে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

সাম্প্রতিক মাসগুলোতে কেন্দ্রীয় সরকার ও টিপিএলএফ একে অপরের বিরুদ্ধে শান্তিচুক্তি লঙ্ঘনের অভিযোগ করে আসছে। চলতি বছরের মে মাসে টিপিএলএফ শান্তিচুক্তির অধীনে গঠিত অন্তর্বর্তী প্রশাসনের কাছ থেকে তিগ্রে অঞ্চলের সরকারের নিয়ন্ত্রণ নেয়। এরপর পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে।

এরই মধ্যে গত রোববার টিপিএলএফসহ ইথিওপিয়ার সাতটি সশস্ত্র গোষ্ঠী প্রধানমন্ত্রী আবি আহমেদের সরকারকে ক্ষমতা থেকে সরানোর লক্ষ্যে একটি জোট গঠনের ঘোষণা দেয়। জোটে এমন কিছু গোষ্ঠীও রয়েছে, যারা ২০২০-২২ সালের তিগ্রে যুদ্ধে টিপিএলএফের বিপক্ষে কেন্দ্রীয় সরকারের পক্ষে লড়েছিল।

বুধবার তিগ্রের বাহিনীর সঙ্গে কেন্দ্রীয় সরকারের সেনাদের সংঘর্ষের পাশাপাশি প্রতিবেশী আফার ও আমহারা অঞ্চলেও লড়াইয়ের খবর পাওয়া গেছে। তবে সংঘর্ষের বিস্তৃতি ও তীব্রতা সম্পর্কে এখনো পূর্ণাঙ্গ চিত্র পাওয়া যায়নি।

তিগ্রের নতুন করে সংঘাতের সঙ্গে ইথিওপিয়া ও ইরিত্রিয়ার সম্পর্কের অবনতিও উদ্বেগ বাড়াচ্ছে। ইথিওপিয়ার সরকার অভিযোগ করেছে, ইরিত্রিয়া নতুন জোটের সদস্যদের আর্থিক সহায়তা দিচ্ছে। তবে ইরিত্রিয়া এ অভিযোগ অস্বীকার করেছে।

ইরিত্রিয়ার সঙ্গে ইথিওপিয়ার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিরোধের বিষয় হলো লোহিত সাগরে প্রবেশাধিকার। স্থলবেষ্টিত ইথিওপিয়া দীর্ঘদিন ধরে সমুদ্রপথে প্রবেশাধিকারকে নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বলে আসছে। বিশেষ করে ইরিত্রিয়ার আসাব বন্দরে প্রবেশের বিষয়টি দুই দেশের সম্পর্কের অন্যতম স্পর্শকাতর ইস্যু। অন্যদিকে ইরিত্রিয়া আশঙ্কা করে, ইথিওপিয়া সামরিক শক্তি ব্যবহার করে ওই বন্দর নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করতে পারে।

২০২০-২২ সালের যুদ্ধে ইরিত্রিয়ার সেনারা ইথিওপিয়ার কেন্দ্রীয় বাহিনীকে সমর্থন করেছিল। তবে প্রিটোরিয়া শান্তিচুক্তিতে ইরিত্রিয়া পক্ষ ছিল না। চুক্তির পর দুই দেশের সম্পর্ক আরও খারাপ হয়েছে। ফলে তিগ্রেতে নতুন করে সংঘাত শুরু হলে ইরিত্রিয়ার ভূমিকা নিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের উদ্বেগ রয়েছে।

এদিকে তিগ্রের সংঘাতকে শুধু ইথিওপিয়ার অভ্যন্তরীণ সমস্যা হিসেবে দেখছেন না আঞ্চলিক পর্যবেক্ষকেরা। প্রতিবেশী সুদানে ২০২৩ সাল থেকে গৃহযুদ্ধ চলছে, সোমালিয়ায় দীর্ঘদিনের অস্থিরতা রয়েছে এবং নীল নদের পানি নিয়ে ইথিওপিয়া, মিসর ও সুদানের মধ্যে বিরোধ রয়েছে। এর সঙ্গে লোহিত সাগর ও মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক উত্তেজতাও যুক্ত হয়েছে।

সুদানের সংঘাতেও ইথিওপিয়ার ভূমিকা নিয়ে অভিযোগ রয়েছে। ইথিওপিয়া র‍্যাপিড সাপোর্ট ফোর্সেসকে (আরএসএফ) সহায়তা করছে—এমন অভিযোগ করেছে বিভিন্ন পক্ষ; তবে ইথিওপিয়া তা অস্বীকার করেছে। একইভাবে সংযুক্ত আরব আমিরাতের বিরুদ্ধেও আরএসএফকে সহায়তার অভিযোগ রয়েছে, যা আবুধাবি অস্বীকার করেছে।

তিগ্রের পরিস্থিতির মধ্যে আফ্রিকান ইউনিয়নের কমিশনের চেয়ারম্যান মাহমুদ আলী ইউসুফ সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোকে উত্তেজনা কমিয়ে সরাসরি আলোচনায় বসার আহ্বান জানিয়েছেন। পাশাপাশি প্রতিবেশী দেশগুলোকে সংঘাত আরও বাড়িয়ে দিতে পারে—এমন কোনো পদক্ষেপ না নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে।

তিগ্রে অঞ্চলে নতুন করে লড়াই শুরু হলে ২০২২ সালের প্রিটোরিয়া শান্তিচুক্তি আরও দুর্বল হয়ে পড়ার পাশাপাশি সংঘাত আফার, আমহারা ও ইথিওপিয়ার অন্যান্য অঞ্চলেও ছড়িয়ে পড়তে পারে—এমন আশঙ্কা রয়েছে। একই সঙ্গে ইরিত্রিয়া, সুদান ও লোহিত সাগরকে ঘিরে বিদ্যমান উত্তেজনার কারণে পরিস্থিতি আঞ্চলিক সংঘাতে রূপ নেওয়ার ঝুঁকিও তৈরি হয়েছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *