শিক্ষকের সম্মান ও ঈমানি দায়িত্ব: বরুড়ায় গণপূর্তমন্ত্রী

মোঃআনজার শাহ

কুমিল্লার বরুড়ায় প্রাথমিক শিক্ষার মানোন্নয়ন এবং শিক্ষাবান্ধব পরিবেশ গড়ে তোলার লক্ষ্যে আজ বৃহস্পতিবার (২৪ সেপ্টেম্বর) অনুষ্ঠিত হয়েছে এক গুরুত্বপূর্ণ মতবিনিময় সভা। বরুড়া হাজী নোয়াব আলী পাইলট উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে আয়োজিত এ সভায় উপজেলার সকল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ও স্কুল ম্যানেজিং কমিটির (এসএমসি) সভাপতিরা অংশ নেন। প্রধান অতিথি ছিলেন গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের গৃহায়ণ ও গণপূর্তমন্ত্রী জনাব জাকারিয়া তাহের সুমন, এমপি।

সভায় প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোর শিক্ষার মান উন্নয়ন, শিক্ষাঙ্গনের পরিবেশকে আরও কার্যকর ও শিক্ষাবান্ধব করে তোলা এবং প্রতিটি শিক্ষার্থীর জন্য মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করার নানা দিক নিয়ে খোলামেলা আলোচনা হয়।

শিক্ষকের মর্যাদা: বাবা-মায়ের পরেই আসন:
বক্তব্যের শুরুতেই মন্ত্রী শিক্ষকের গুরুদায়িত্বের কথা স্মরণ করিয়ে দেন। তিনি বলেন, “বাবা-মা তাঁর সবচেয়ে আদরের ধন, সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ সন্তানকে আপনাদের কাছে পাঠান মানুষ করার জন্য। কুরআনেও আছে, বাবা-মায়ের পরে শিক্ষকরাই সবচেয়ে বেশি সম্মান ও শ্রদ্ধার পাত্র।”
স্মৃতিচারণ করে তিনি বলেন, “আমরা এক সময় শিক্ষকদের দেখলেই সালাম করতাম, সম্মান ও শ্রদ্ধায় নত হতাম। আজ কি আমরা সে কথা বলতে পারি?” তাঁর বিশ্বাস, গত সরকারের সময়ে দেশ ও জাতিকে ধ্বংস করার উদ্দেশ্যেই শিক্ষাব্যবস্থাকে ভেঙে দেওয়া হয়েছে।

ভবনের আগে চাই শিক্ষার মান:
প্রায় আট বছর পর বরুড়া হাজী স্কুলে সব প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ও সভাপতিদের আমন্ত্রণ জানিয়ে কথা বলার সুযোগ পেয়ে তিনি সন্তোষ প্রকাশ করেন। একই সঙ্গে গভীর ক্ষোভও ব্যক্ত করেন। মন্ত্রী বলেন, “সত্যিই দুঃখ লাগে, যখন শুনি পঞ্চম শ্রেণি পাস করার পরও একটি শিশু ঠিকমতো বাংলা পড়তে পারে না, ইংরেজি পড়তে পারে না। শিক্ষার অবস্থা যদি এই হয়, তাহলে ভবন দিয়ে কিছুই হবে না। ভবনের তখনই মূল্য, যখন সেখানে শিক্ষার মান ঠিক থাকে। শিক্ষার মান দেখলেই তবে ভবন দেব।”

সম্মিলিত প্রচেষ্টার আহ্বান:
মন্ত্রী বলেন, শিক্ষক, ম্যানেজিং কমিটি ও এলাকাবাসী বিদ্যালয়ের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সবাই যদি সক্রিয় হয়ে সময় দেন, তবেই শিক্ষাঙ্গনের পরিবেশ ঠিক হবে। “শিক্ষকরা যদি মনোযোগ দেন, যদি মনে করেন নিজের সন্তানের মতো এদের মানুষ করার দায়িত্ব তাঁদের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে, তখনই শিক্ষার্থীরা ঠিকমতো পড়াশোনা করবে।”

ছেলেরা কোথায়?
শিক্ষাঙ্গনে ছেলেশিক্ষার্থীর কমে যাওয়া নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে মন্ত্রী বলেন, “স্কুল-কলেজে গেলে শুধু আমাদের মেয়েদেরই দেখি। ছেলেরা কোথায়? আমি জানতাম, বাংলাদেশে ছেলে-মেয়ের সংখ্যা প্রায় সমান। অথচ স্কুল-কলেজে গেলে মনে হয়, চার ভাগের তিন ভাগই মেয়ে, ছেলে মাত্র এক ভাগ। বাকি ছেলেরা কোথায় আছে? বাবা-মায়েরা কি জিজ্ঞেস করেন না? শিক্ষকরা কি খোঁজ নেন? এরা যদি পড়াশোনা না করে, ভবিষ্যতে কী করবে?” এলাকার অভিভাবকদের উদ্দেশে তিনি প্রশ্ন রাখেন, তাঁদের ছেলেরা কোথায় আছে, তা তাঁরা জানেন কি না।

শিক্ষার শুরু ঘর থেকে:
মন্ত্রী বলেন, শিক্ষা কেবল ভবনের ওপর নির্ভর করে না; তা শুরু হয় ঘর থেকে, এরপর শিক্ষকদের হাতে। তিনি আবেগঘন কণ্ঠে বলেন, “আজ শিক্ষার্থীদের জন্য যতটা এসেছি, তার চেয়েও বেশি এসেছি শিক্ষকদের কাছে অনুরোধ নিয়ে। খোদার ওয়াস্তে, এটি আপনাদের ঈমানি দায়িত্ব। বাবা-মায়েরা কলিজার টুকরাকে আপনাদের কাছে পাঠান। দয়া করে এদের মানুষ করার চেষ্টা করুন, সময় দিন। নইলে খোদার কাছেও আপনাদের জবাবদিহি করতে হবে।”

সম্মান ধরে রাখুন, মনোযোগ দিন:
শিক্ষকদের উদ্দেশে তিনি বলেন, “হয়তো বেতন বেশি পান না, কিন্তু সম্মানটা পান। এই সম্মান হারাতে দেবেন না। একটু মনোযোগ দিন। শিশুরা সারাদিন কষ্ট করে শিখতে চেষ্টা করে। আপনারা না শেখালে কে শেখাবে?” নকলের প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, গত ১৫ বছর ধরে, গত সরকারের আমলে এ প্রবণতা চলেছে। “আগামীতে নকলকে কোনোভাবেই প্রশ্রয় দেওয়া হবে না। আমরা চাই, আমাদের সন্তানরা সুশিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে দেশের আগামী নেতৃত্ব দেবে। তারা যদি সুশিক্ষিত না হয়, ভবিষ্যতে আমরা কী পাব?”

জাপান: শিক্ষা, শৃঙ্খলা ও পরিশ্রমের দৃষ্টান্ত:
গত ৫০ বছরে প্রতিবেশী দেশগুলো অনেক এগিয়ে গেছে উল্লেখ করে মন্ত্রী জাপানের উদাহরণ টানেন। তিনি বলেন, “বোমার আঘাতে জাপানের বাড়িঘর, কলকারখানা সব ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল। সেই জাপান মাত্র ৩০ বছরে ঘুরে দাঁড়িয়েছে শিক্ষা ও সমাজের চিন্তাধারার কারণে। আজ আমাদের দেশের বড় বড় প্রকল্পে জাপানি সহায়তা ছাড়া কিছুই হয় না। অথচ জাপানের জনসংখ্যা আমাদের অর্ধেকেরও কম, কিন্তু তারা অত্যন্ত পরিশ্রমী, শৃঙ্খলাপরায়ণ ও শিক্ষিত জাতি।” মালয়েশিয়ার প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, এক সময় সে দেশ থেকে মানুষ আমাদের এখানে পড়তে আসত, আর আজ সেই মালয়েশিয়া কোথায় পৌঁছে গেছে! “আমরা কোথায় আছি? কিসের কারণে?” প্রশ্ন তোলেন তিনি।

হিংসা-বিদ্বেষ ভুলে দেশ গড়ার ডাক:
বক্তব্যের শেষ দিকে মন্ত্রী বলেন, আমরা সত্য বলার বদলে স্বার্থের খেলায় মেতে থাকি, হিংসা-বিদ্বেষে সময় নষ্ট করি। কেউ ভালো কাজ করলেও তার প্রশংসা করি না; নিজের পক্ষে না হলে সবকিছুই খারাপ মনে হয়। এই মানসিকতা থেকে বেরিয়ে এসে সবাইকে মিলেমিশে দেশ গড়ার আহ্বান জানান গৃহায়ণ ও গণপূর্তমন্ত্রী।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *