বান্দরবানে ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্যে মধু পূর্ণিমা উদযাপন

মোঃ শামীম হোসেন সিকদার:

যথাযথ ধর্মীয় মর্যাদা, ভাবগাম্ভীর্য ও নানা ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতার মধ্য দিয়ে বান্দরবানে বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় উৎসব মধু পূর্ণিমা উদযাপিত হয়েছে। এ উপলক্ষে জেলার বিভিন্ন বৌদ্ধ বিহারে ধর্মীয় অনুষ্ঠান, প্রার্থনা, ধর্মদেশনা ও দানসহ নানা কর্মসূচির আয়োজন করা হয়।

শনিবার (২৬ সেপ্টেম্বর) সকাল ১০টার দিকে বান্দরবান জেলা উৎসব উদযাপন পরিষদের উদ্যোগে জেলার বিভিন্ন বৌদ্ধ বিহারে মধু পূর্ণিমা উপলক্ষে ধর্মীয় অনুষ্ঠান শুরু হয়। এ সময় বিভিন্ন বিহারে দায়ক-দায়িকা ও বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী ভক্তদের ব্যাপক সমাগম ঘটে। ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্যের মধ্য দিয়ে তারা বিভিন্ন আনুষ্ঠানিকতায় অংশ নেন।

মধু পূর্ণিমা উপলক্ষে শত শত দায়ক-দায়িকা ও ভক্ত পুণ্যলাভের আশায় জেলার বিভিন্ন বৌদ্ধ বিহারে গিয়ে ভিক্ষুদের মধু, ফলমূল, মধুমিশ্রিত পায়েস ও ছোয়াইং (খাবার) দান করেন। দান কার্যক্রম শেষে তারা ধর্মীয় প্রার্থনায় অংশ নেন। এ সময় দেশ, জাতি ও সকল প্রাণীর মঙ্গল কামনা করে বিশেষ প্রার্থনা করা হয়।

রাজগুরু বৌদ্ধ বিহারে ধর্মীয় আয়োজন

বান্দরবান শহরের ঐতিহ্যবাহী রাজগুরু বৌদ্ধ বিহারেও মধু পূর্ণিমা উপলক্ষে নানা ধর্মীয় কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হয়। এ উপলক্ষে বিহার প্রাঙ্গণে ভক্তদের উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো। ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতার পাশাপাশি বিহারে ধর্মদেশনার আয়োজন করা হয়।

রাজগুরু বৌদ্ধ বিহারে এ উপলক্ষে ধর্মদেশনা প্রদান করেন বিহারাধ্যক্ষ কেতু মথাথের। অনুষ্ঠানে পুণ্যলাভের আশায় অংশ নেন বান্দরবান পার্বত্য জেলা পরিষদের সদস্য ও জেলা উৎসব উদযাপন পরিষদের সভাপতি জনাব চনুমং মার্মাসহ দায়ক-দায়িকা, ভক্ত ও গণ্যমান্য ব্যক্তিরা।

এ সময় বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীরা ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়ার পাশাপাশি ভিক্ষুদের বিভিন্ন ধরনের দানসামগ্রী প্রদান করেন। মধু, ফলমূল, মধুমিশ্রিত পায়েস ও ছোয়াইংসহ বিভিন্ন খাবার দানের মধ্য দিয়ে তারা ধর্মীয় পুণ্য অর্জনের চেষ্টা করেন।

মধু পূর্ণিমার ধর্মীয় তাৎপর্য

ধর্মীয় কাহিনি ও বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের বিশ্বাস অনুযায়ী, গৌতম বুদ্ধ বর্ষাকালীন বনবাসে থাকাকালে পারিলেয়্য বনে অবস্থান করেন। এ সময় একটি হাতি প্রতিদিন বুদ্ধকে ফলমূল দান করত। পরে একটি বানর মৌচাক এনে বুদ্ধকে দান করলে মৌচাকে ছানা ও ডিম থাকায় বুদ্ধ তা গ্রহণ করেননি।

এরপর বানরটি মৌচাকটি পরিষ্কার করে পুনরায় মধু দান করলে বুদ্ধ তা গ্রহণ করেন। এই ঘটনাকে স্মরণ করেই বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীরা মধু পূর্ণিমা পালন করে থাকেন।

মধু পূর্ণিমাকে বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় উৎসব হিসেবে বিবেচনা করা হয়। ভাদ্র মাসের পূর্ণিমা তিথিতে এ উৎসব পালিত হওয়ায় এটি ‘ভাদ্র পূর্ণিমা’ নামেও পরিচিত।

দান ও ধর্মীয় অনুশীলনের মাধ্যমে পুণ্য অর্জন

মধু পূর্ণিমা উপলক্ষে বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীরা ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্যের সঙ্গে বিভিন্ন বৌদ্ধ বিহারে গিয়ে ভিক্ষুদের দান করেন। দান, শীল ও ধর্মীয় অনুশীলনের মাধ্যমে তারা পুণ্য অর্জনের চেষ্টা করেন। একই সঙ্গে দেশ, জাতি, পরিবার এবং সকল প্রাণীর শান্তি ও মঙ্গল কামনা করে প্রার্থনায় অংশ নেন।

বান্দরবানের বিভিন্ন বৌদ্ধ বিহারে দিনব্যাপী ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতার মধ্য দিয়ে মধু পূর্ণিমা উদযাপিত হয়। ধর্মীয় উৎসবকে ঘিরে দায়ক-দায়িকা ও ভক্তদের মধ্যে ছিল উৎসাহ-উদ্দীপনা। বিহারগুলোতে ভক্তদের উপস্থিতিতে সৃষ্টি হয় ধর্মীয় ও ভাবগম্ভীর পরিবেশ।

মধু পূর্ণিমার ধর্মীয় শিক্ষা ও তাৎপর্য তুলে ধরে আয়োজকরা বলেন, দান, ধর্মীয় অনুশীলন ও সকল প্রাণীর মঙ্গল কামনার মধ্য দিয়ে এ উৎসবের মূল তাৎপর্য প্রকাশ পায়। প্রতিবছর বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীরা ধর্মীয় মর্যাদা ও ভাবগাম্ভীর্যের সঙ্গে এ পূর্ণিমা তিথি পালন করে থাকেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *