বই-খাতা পলিব্যাগে মুড়িয়ে খাল পাড়ি দেয় শিশুরা: সেতুহীন বমু খালে জিম্মি ১২ পাহাড়ি পাড়া

মোঃ রাসেল, স্টাফ রিপোর্টার:

বই, খাতা আর স্কুল ইউনিফর্ম যাতে ভিজে না যায়, সেজন্য সেগুলো শক্ত করে মুড়িয়ে নেওয়া হয়েছে পলিব্যাগে। এরপর এক হাতে সেই ব্যাগ মাথার ওপর উঁচিয়ে ধরে অন্য হাতে ভারসাম্য রক্ষা করে কোমরসমান পানি মাড়িয়ে খাল পার হচ্ছে একদল শিশু। এটি কোনো সিনেমার দৃশ্য নয়, বান্দরবানের লামা উপজেলার গজালিয়া ইউনিয়নের ‘বমু খাল’ পারাপারের নিত্যদিনের চিত্র।

স্বাধীনতার সাড়ে পাঁচ দশক পেরিয়ে গেলেও আধুনিক যোগাযোগব্যবস্থা থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে আছে গজালিয়া ইউনিয়নের এই প্রত্যন্ত অঞ্চলটি। বমু খালের ওপর একটি স্থায়ী সেতুর অভাবে বছরের পর বছর ধরে চরম ভোগান্তি পোহাচ্ছেন ১২টি পাহাড়ি পাড়ার ৫ সহস্রাধিক মানুষ। বিশেষ করে চিনতাবাপাড়াসহ আশপাশের এলাকার ৫০০-এর বেশি স্কুলগামী কোমলমতি শিক্ষার্থী প্রতিদিন জীবনের ঝুঁকি নিয়ে এই খাল পারাপার হচ্ছে।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, এই ১২টি পাড়ার মানুষের যোগাযোগের একমাত্র মাধ্যম বমু খাল। এই খালে কোনো সেতু কিংবা স্থায়ী নৌকার ব্যবস্থা না থাকায় প্রতিদিন কৃষক, শ্রমিক, ব্যবসায়ী ও শিক্ষার্থীদের তীব্র ভোগান্তি নিয়ে পার হতে হয়। শুষ্ক মৌসুমে হেঁটে কোনোমতে পার হওয়া গেলেও বর্ষাকালে পাহাড়ি ঢল ও খালের পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় যোগাযোগব্যবস্থা সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যায়। ফলে শিক্ষার্থীদের পড়ালেখা ও সাধারণ মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা স্থবির হয়ে পড়ে।

সরেজমিনে দেখা যায়, প্রতিদিন সকালে খুদে শিক্ষার্থীরা খালের পাড়ে এসে থমকে দাঁড়ায়। খালের কোনো কোনো জায়গায় পানি হাঁটু থেকে কোমর পর্যন্ত থাকায় ছোট শিশুরা একা পার হতে ভয় পায়। কোনো শিক্ষক বা বড় পথচারী পার হতে এলে তাঁদের সঙ্গে দল বেঁধে শিক্ষার্থীরাও খাল পার হয়। বর্ষাকালে খালের তীব্র স্রোতে অনেক শিক্ষার্থীর বই-খাতা ভেসে যাওয়ার ঘটনাও ঘটে।

দুর্ভোগের সত্যতা স্বীকার করে গজালিয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান জানান, “বমু খালের ওপর সেতু না থাকায় ১২টি পাড়ার হাজার হাজার মানুষ এবং শত শত খুদে শিক্ষার্থীর দুর্ভোগের বিষয়টি অত্যন্ত দুঃখজনক। বর্ষা মৌসুমে এই দুর্ভোগ আরও প্রকট আকার ধারণ করে। আমরা ইউনিয়নের পক্ষ থেকে সংশ্লিষ্ট উপজেলা প্রশাসন ও এলজিইডি (LGED) কর্তৃপক্ষকে বিষয়টি একাধিকবার জানিয়েছি। এখানে দ্রুত একটি স্থায়ী সেতু নির্মাণের জন্য জোরালো প্রচেষ্টা চালানো হচ্ছে।”

১২টি পাহাড়ি পাড়ার মানুষের এই দীর্ঘদিনের দুর্ভোগ লাঘবে এবং শিক্ষার্থীদের শিক্ষাজীবন ও জরুরি চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে অবিলম্বে বমু খালের ওপর একটি স্থায়ী সেতু নির্মাণের জোর দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় সচেতন মহল ও ভুক্তভোগী এলাকাবাসী।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *