পুরোনো টার্মিনাল, নতুন চাপ; ফিটনেসবিহীন বাসে ঝুঁকিপূর্ণ যাত্রা

মোঃ মশিউর রহমান:

শহর বেড়েছে, বেড়েছে জনসংখ্যা ও যানবাহনের চাপ। নতুন নতুন রুট চালু হয়েছে, টার্মিনালে বেড়েছে বাসের সংখ্যাও। কিন্তু ৪৫ বছর ধরে একই জায়গায় পড়ে আছে টাঙ্গাইলের নতুন বাস টার্মিনাল। ছয় একর জায়গার ওপর ১৯৮১ সালে যাত্রা শুরু করা এই টার্মিনালে এরপর বড় কোনো অবকাঠামোগত সম্প্রসারণ হয়নি। ফলে জায়গার সংকট, যানজট ও ফিটনেসবিহীন বাসের কারণে প্রতিদিনই ভোগান্তিতে পড়ছেন যাত্রীরা। ১৯৮১ সালে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি বিচারপতি আব্দুস সাত্তার টাঙ্গাইল নতুন বাস টার্মিনালের উদ্বোধন করেন। এরপর কেটে গেছে প্রায় সাড়ে চার দশক। এই সময়ে টাঙ্গাইল শহরের পরিধি ও মানুষের চলাচল কয়েক গুণ বাড়লেও টার্মিনালের আয়তন রয়ে গেছে আগের ছয় একরেই।

টার্মিনালে জায়গার সংকটের কারণে বিভিন্ন রুটের বাস এলোমেলোভাবে দাঁড়িয়ে থাকছে। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে সিএনজি, অটোরিকশা ও ব্যাটারিচালিত রিকশার চাপ। সব মিলিয়ে নতুন বাস টার্মিনাল ও আশপাশের এলাকায় প্রায় প্রতিদিনই তৈরি হচ্ছে যানজট। বিশেষ করে টাঙ্গাইল-ময়মনসিংহ রুটে ফিটনেসবিহীন ও পুরোনো বাসের সংখ্যা বেশি বলে অভিযোগ যাত্রীদের। সেবার মান নিয়েও রয়েছে নানা অভিযোগ। সরেজমিনে টাঙ্গাইল বাস টার্মিনালের উত্তর-পূর্ব প্রান্তে সারি সারি পুরোনো ও জরাজীর্ণ বাস দেখা যায়। স্থানীয়দের অভিযোগ, এসব বাসের অনেকগুলোই সড়কে চলাচলের উপযোগী নয়।

প্রান্তিক পরিবহনের চালক রুবেল ও আলমাস বলেন, “মালিক যে গাড়ি দেন, আমরা সেটাই চালাই। ফিটনেসবিহীন ও পুরোনো গাড়ির জন্য মালিকরাই দায়ী।” তবে তারাও স্বীকার করেন, প্রান্তিক পরিবহনের অধিকাংশ গাড়িই ফিটনেসবিহীন। ঢাকা রুটের নিরালা পরিবহনের যাত্রী সৃষ্টি একাডেমিক কলেজের ইন্টার প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী হাসান এবং ধলেশ্বরী পরিবহনের যাত্রী এএসআই শাজাহান জানান, অনেক বাসের আসনের অবস্থা ভালো নয়। কোথাও কোথাও ছারপোকার সমস্যাও রয়েছে। তাদের ভাষ্য, বাসগুলো নির্ধারিত সময়ে ছাড়লেও সিটিং সার্ভিসের নামে বিভিন্ন জায়গায় বাস থামিয়ে যাত্রী ওঠানো হয়। যাত্রীসেবার মান বাড়াতে আসন আধুনিকায়নের পাশাপাশি যত্রতত্র বাস থামিয়ে যাত্রী ওঠানো বন্ধ করার দাবি জানান তারা।

টাঙ্গাইল জেলা বাস-মিনিবাস মালিক সমিতির আহ্বায়ক শফিকুর রহমান খান শফিক বলেন, দায়িত্ব নেওয়ার পর বিভিন্ন রুট থেকে পুরোনো ও জরাজীর্ণ বাস সরানো এবং যানজট কমাতে মালিক সমিতির পক্ষ থেকে কাজ করা হচ্ছে। তিনি বলেন, যাত্রীদের নিরাপত্তাকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি নিরালা পরিবহনের কাউন্টার উচ্ছেদের পর নতুন করে তাদের কাউন্টারের জন্য জায়গার ব্যবস্থা করা হয়েছে। নতুন বাস টার্মিনালের যানজট কমাতে প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয় করেও কাজ চলছে বলে জানান তিনি। টাঙ্গাইলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ডিএসবি) কাজী শাহনেওয়াজ বলেন, শহরে ধারণক্ষমতার তুলনায় অতিরিক্ত সিএনজি, অটোরিকশা ও ব্যাটারিচালিত রিকশা চলাচল করছে। বিশেষ করে অটোরিকশাগুলো দুই শিফটে চালানোর বিষয়ে পৌর কর্তৃপক্ষের সঙ্গে নিয়মিত সমন্বয় করা হচ্ছে।

তার আশা, শহরের যানজট কমানো গেলে নতুন বাস টার্মিনাল এলাকার যানজটও অনেকটা কমে আসবে। তবে এজন্য কিছুটা সময় প্রয়োজন। ১৯৮১ সালে ছয় একর জায়গায় যে টার্মিনাল চালু হয়েছিল, ২০২৬ সালেও সেটি একই জায়গায় দাঁড়িয়ে আছে। এর মধ্যে শহর ও যাত্রীর সংখ্যা বেড়েছে, বেড়েছে বাসের রুট ও যানবাহনের চাপ। কিন্তু টার্মিনালের অবকাঠামো রয়ে গেছে প্রায় সেই পুরোনো কাঠামোতেই। জায়গার সংকট, ফিটনেসবিহীন বাস, অতিরিক্ত অটো-সিএনজি এবং যত্রতত্র যাত্রী ওঠানামা—সব মিলিয়ে টাঙ্গাইল বাস টার্মিনাল এখন নগরবাসীর নিয়মিত ভোগান্তির একটি বড় কারণ হয়ে উঠেছে। যাত্রীদের দাবি, টার্মিনালের জায়গা দ্রুত সম্প্রসারণের পাশাপাশি ফিটনেসবিহীন বাসের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হোক। একই সঙ্গে যানজট নিয়ন্ত্রণে কার্যকর ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নেওয়ারও দাবি জানিয়েছেন তারা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *