আন্তর্জাতিক ডেস্ক:
চাঁদে দীর্ঘমেয়াদি মহাকাশ ঘাঁটি স্থাপন ও ভবিষ্যৎ গভীর মহাকাশ অভিযানের প্রস্তুতিতে পারমাণবিক শক্তিকে গুরুত্ব দিচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র, চীন ও রাশিয়া। চাঁদের মাটিতে পারমাণবিক চুল্লি স্থাপনের পরিকল্পনা নিয়ে দেশগুলো নিজেদের সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি প্রযুক্তিগত প্রতিযোগিতায় এগিয়ে যাচ্ছে।
এনডিটিভির এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চাঁদের দক্ষিণ মেরুতে ব্যবহারের উপযোগী একটি পারমাণবিক চুল্লি তৈরির লক্ষ্যে কাজ করছে মার্কিন মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসা। ২০৩০ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে এটি প্রস্তুত করার লক্ষ্য রয়েছে। চুল্লিটি দীর্ঘ সময় রক্ষণাবেক্ষণ ছাড়াই বিদ্যুৎ সরবরাহ করতে সক্ষম হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
অন্যদিকে, চীন ও রাশিয়া যৌথভাবে ‘সেলিনা’ নামে একটি চন্দ্র পারমাণবিক চুল্লি তৈরির পরিকল্পনা করছে। ২০৩৬ সালের মধ্যে এটি নির্মাণের লক্ষ্য রয়েছে। প্রস্তাবিত এই চুল্লি চীনের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা চন্দ্র স্টেশনে বিদ্যুৎ সরবরাহ করবে বলে পরিকল্পনায় উল্লেখ করা হয়েছে।
চাঁদে স্থায়ী ঘাঁটি পরিচালনার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জগুলোর একটি হলো নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ। সৌর প্যানেলের মাধ্যমে দিনের বেলায় বিদ্যুৎ উৎপাদন করা গেলেও চাঁদের একেকটি রাত প্রায় দুই সপ্তাহ স্থায়ী হয়। ফলে দীর্ঘমেয়াদি ঘাঁটির জন্য শুধু সৌরশক্তির ওপর নির্ভর করা কঠিন।
এই পরিস্থিতিতে পারমাণবিক চুল্লিকে নিরবচ্ছিন্ন শক্তির সম্ভাব্য উৎস হিসেবে দেখা হচ্ছে। নাসার প্রস্তাবিত চন্দ্র চুল্লির উৎপাদন ক্ষমতা অন্তত ২০ কিলোওয়াট হতে পারে। অন্যদিকে রাশিয়া-চীনের পরিকল্পিত ‘সেলিনা’ থেকে প্রায় ১০ কিলোওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের আশা করা হচ্ছে।
তবে চাঁদে পারমাণবিক প্রযুক্তি ব্যবহারের সঙ্গে নিরাপত্তা ঝুঁকিও রয়েছে। বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা করছেন, রকেট উৎক্ষেপণের সময় কোনো দুর্ঘটনা ঘটলে তেজস্ক্রিয় পদার্থ ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। চাঁদের পরিবেশে পৃথিবীর মতো প্রচলিত নিরাপত্তাবেষ্টনী তৈরি করাও তুলনামূলকভাবে কঠিন।
ঝুঁকি কমাতে যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়া চুল্লিগুলো নিষ্ক্রিয় অবস্থায় চাঁদে পাঠানোর পরিকল্পনা করছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। সেখানে পৌঁছানোর পর নির্ধারিত স্থানে চুল্লিগুলো সক্রিয় করার পরিকল্পনা রয়েছে।
এদিকে চাঁদে পারমাণবিক চুল্লি স্থাপন আন্তর্জাতিক আইন ও মহাকাশ ব্যবস্থাপনা নিয়েও নতুন প্রশ্ন তৈরি করছে। ১৯৬৭ সালের মহাকাশ চুক্তি অনুযায়ী কোনো দেশ চাঁদ বা অন্য কোনো মহাজাগতিক বস্তুর ওপর সার্বভৌমত্ব দাবি করতে পারে না।
তবে কোনো দেশ পারমাণবিক চুল্লি স্থাপনের পর নিরাপত্তার কারণ দেখিয়ে ওই এলাকার আশপাশে অন্য দেশের প্রবেশ সীমিত বা নিষিদ্ধ করলে তা আন্তর্জাতিক মহাকাশ আইনের সঙ্গে কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
প্রযুক্তিগত সক্ষমতা, নিরাপত্তা ও আন্তর্জাতিক আইনের বিভিন্ন চ্যালেঞ্জের মধ্যেই চাঁদে পারমাণবিক শক্তি ব্যবহারের পরিকল্পনা এগিয়ে নিচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র, চীন ও রাশিয়া। ভবিষ্যতে চাঁদে স্থায়ী মানব বসতি ও গভীর মহাকাশ অভিযানে এই প্রযুক্তি কতটা কার্যকর ভূমিকা রাখবে, সেটিই এখন গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠেছে।