বিনোদন ডেস্ক:
বলিউডের জনপ্রিয় অভিনেতা আরশাদ ওয়ারসিকে নতুন করে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার প্রয়োজন নেই। ‘মুন্নাভাই এমবিবিএস’ সিনেমার ‘সার্কিট’ চরিত্রে অভিনয় করে দর্শকের হৃদয়ে স্থায়ী জায়গা করে নিয়েছেন তিনি। পর্দায় হাস্যরস আর দুর্দান্ত অভিনয়ে মুগ্ধ করা এই অভিনেতার আজকের সাফল্যের পেছনে রয়েছে দীর্ঘ সংগ্রাম ও কঠিন বাস্তবতার গল্প।
একসময় জীবিকার তাগিদে বাসে বাসে ঘুরে প্রসাধনী বিক্রি করতে হয়েছে আরশাদকে। লিপস্টিক ও নেইলপলিশ বিক্রি করে অর্থ উপার্জন করেছেন তিনি। এমনকি কাজ করেছেন একটি ফটো ল্যাবেও। সেখান থেকে ধীরে ধীরে অভিনয়জগতে প্রবেশ এবং পরবর্তী সময়ে বলিউডের পরিচিত মুখ হয়ে ওঠার পথটি মোটেও সহজ ছিল না।
আরশাদ ওয়ারসির বাবা ছিলেন সংগীতশিল্পী। কিন্তু মাত্র ১৪ বছর বয়সেই মা-বাবা দুজনকেই হারান তিনি। এরপরই তার জীবনে নেমে আসে কঠিন বাস্তবতা। মহারাষ্ট্রের নাসিকের একটি বোর্ডিং স্কুলে পড়াশোনা করলেও পরিবারের আর্থিক সংকট দিন দিন প্রকট হতে থাকে।
শৈশবের সেই সময়ের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে আরশাদ জানিয়েছেন, বোর্ডিং স্কুল থেকে বাড়ি ফিরলে প্রায়ই দেখতেন তাদের ঠিকানা বদলে গেছে। তখন বয়স ছিল ১০ থেকে ১২ বছরের মধ্যে। কেন বারবার বাড়ি পরিবর্তন করতে হচ্ছে, তা তিনি বুঝতে পারতেন না। তাকে বলা হতো, পুরোনো বাড়িতে মেরামতের কাজ চলছে, তাই সাময়িকভাবে অন্য বাসায় থাকা হচ্ছে।
কিন্তু সময়ের সঙ্গে তিনি বুঝতে পারেন, বিষয়টি শুধু বাড়ি পরিবর্তনের ছিল না। আর্থিক সংকটের কারণে প্রতিবার নতুন বাসায় ওঠার সঙ্গে সঙ্গে তাদের থাকার জায়গার আকারও ছোট হয়ে আসছিল। পরিবারের সেই কঠিন সময় তাকে অল্প বয়সেই বাস্তবতার মুখোমুখি করে।
পরিবারের আর্থিক অনটনের কারণে দশম শ্রেণির পরই পড়াশোনা ছেড়ে দিতে হয় আরশাদকে। এরপর শুরু হয় জীবিকার জন্য তার সংগ্রাম। মুম্বাইয়ের বোরিভালি থেকে বান্দ্রাগামী লোকাল বাসে উঠে যাত্রীদের কাছে লিপস্টিক ও নেইলপলিশ বিক্রি করতেন তিনি। একই সময়ে একটি ফটো ল্যাবেও কাজ করেন।
তবে জীবনের প্রতিকূলতা তাকে থামিয়ে রাখতে পারেনি। অভিনয়ের প্রতি আগ্রহ ও নিজের স্বপ্নকে সামনে রেখে সুযোগ খুঁজতে থাকেন তিনি। একপর্যায়ে নির্মাতা মহেশ ভাটের ‘কাশ’ ও ‘ঠিকানা’ সিনেমায় সহকারী হিসেবে কাজ করার সুযোগ পান। অভিনয় ও চলচ্চিত্র জগতের সঙ্গে সেখান থেকেই তার পেশাগত যাত্রার গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় শুরু হয়।
নিজের সংগ্রামী জীবন নিয়ে আরশাদ একাধিকবার বলেছেন, তার পথচলা মোটেও সহজ ছিল না। জীবনের নানা প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে নিজেকেই অনেক কিছু শিখতে হয়েছে। তবে অতীতের কঠিন সময়কে তিনি আক্ষেপের চোখে দেখেন না। বরং তার বিশ্বাস, জীবনে সবকিছু যদি সহজেই পাওয়া যেত, তাহলে হয়তো জীবনের মূল্যও তিনি একইভাবে উপলব্ধি করতে পারতেন না।
আরশাদ ওয়ারসির ক্যারিয়ারে সবচেয়ে বড় পরিবর্তন আসে ২০০৩ সালে। ওই বছর মুক্তি পায় রাজকুমার হিরানি পরিচালিত ‘মুন্নাভাই এমবিবিএস’। সিনেমাটিতে সঞ্জয় দত্তের সঙ্গে ‘সার্কিট’ চরিত্রে অভিনয় করে রাতারাতি দর্শকের কাছে ব্যাপক জনপ্রিয়তা পান তিনি। সঞ্জয় দত্তের সঙ্গে তার পর্দার রসায়ন এবং কমেডি টাইমিং সিনেমাটিকে আরও আকর্ষণীয় করে তোলে।
এরপর একের পর এক সফল সিনেমায় নিজের অভিনয়ের বৈচিত্র্য তুলে ধরেছেন আরশাদ। ‘গোলমাল’ ফ্র্যাঞ্চাইজি থেকে ‘ধামাল’ সিরিজ—বিভিন্ন ধরনের চরিত্রে অভিনয় করে দর্শকের কাছে নিজের আলাদা অবস্থান তৈরি করেছেন তিনি। কমেডির পাশাপাশি ওটিটি, ক্রাইম, অ্যাকশন ও থ্রিলারধর্মী কাজেও নিজের অভিনয়ক্ষমতার ভিন্ন দিক দেখিয়েছেন।
দীর্ঘ অভিনয়জীবনে আরশাদ ওয়ারসি একাধিক ব্যবসাসফল ও প্রশংসিত সিনেমায় অভিনয় করেছেন। সাম্প্রতিক সময়েও তার কাজের পরিধি বেড়েছে। ২০২৫ সালে ‘জলি এলএলবি ৩’-এর পর ২০২৬ সালেও একাধিক আলোচিত প্রকল্পে দেখা গেছে তাকে। এ বছর মুক্তি পেয়েছে ‘ওয়েলকাম টু দ্য জঙ্গল’ ও ‘ধামাল ৪’-এর মতো ফ্র্যাঞ্চাইজির সিনেমা।
এ ছাড়া সেপ্টেম্বরের শুরুতে তার অভিনীত ডাবল রোলের ক্রাইম-কমেডি ‘জীবন ইয়া ভীমা কন?’ মুক্তি পায়। এরপর ১১ সেপ্টেম্বর প্রেক্ষাগৃহে আসে তার অভিনীত অ্যাকশন-থ্রিলার ‘ঘমাসান’। এতে প্রতীক গান্ধীর বিপরীতে ভিন্নধর্মী চরিত্রে অভিনয় করে দর্শকের আলোচনায় আসেন তিনি।
বাসে প্রসাধনী বিক্রি করা কিশোর থেকে বলিউডের পরিচিত অভিনেতা হয়ে ওঠার আরশাদ ওয়ারসির গল্প তাই শুধু তারকা হয়ে ওঠার কাহিনি নয়; এটি প্রতিকূলতার মধ্যেও স্বপ্ন ধরে রাখার এবং নিজের জায়গা তৈরি করে নেওয়ার এক দীর্ঘ সংগ্রামের গল্প।