জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক:
হাসপাতালে রোগীর মৃত্যুকে কেন্দ্র করে চিকিৎসকের ওপর হামলা বা মারধর কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয় বলে মন্তব্য করেছেন প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচারবিষয়ক উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান। একই সঙ্গে স্বাস্থ্য খাতে দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা দুর্নীতি ও অনিয়মের কাঠামো ধীরে ধীরে পরিবর্তনের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন তিনি।
মঙ্গলবার (৬ অক্টোবর) সচিবালয়ে সরকারের বিভিন্ন কার্যক্রমের অগ্রগতি নিয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি এসব কথা বলেন।
স্বাস্থ্য খাতে দুর্নীতি ও সাধারণ মানুষের ভোগান্তি নিয়ে প্রশ্নের জবাবে জাহেদ উর রহমান বলেন, শুধু চিকিৎসকদের দায়ী করলে স্বাস্থ্য ব্যবস্থার সামগ্রিক সমস্যার চিত্র পাওয়া যাবে না। স্বাস্থ্য খাতে নানা ধরনের কাঠামোগত সমস্যা রয়েছে এবং সেগুলোও বিবেচনায় নিতে হবে।
তিনি বলেন, একটি সমাজে যখন ব্যাপকভাবে দুর্নীতি ছড়িয়ে পড়ে, তখন তা কোনো নির্দিষ্ট খাতের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। স্বাস্থ্য খাতও এর বাইরে নয়।
চিকিৎসকদের ওপর হামলার বিষয়ে তথ্য উপদেষ্টা বলেন, হাসপাতালে রোগী মারা যাওয়ার পর অনেক সময় স্বজন বা অন্যদের পক্ষ থেকে চিকিৎসকদের ওপর হামলার ঘটনা ঘটে। এমনকি জরুরি বিভাগে চিকিৎসক রোগীকে মৃত ঘোষণা করার পরও হামলার ঘটনা ঘটেছে।
জাহেদ উর রহমান বলেন, ‘চিকিৎসকদের অন্ধভাবে সাফাই গাওয়ার বিষয় নয়। তবে রোগীর মৃত্যুর ঘটনায় চিকিৎসককে মারধর করাও গ্রহণযোগ্য নয়। একইসঙ্গে স্বাস্থ্য খাতে দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগও গুরুত্বের সঙ্গে দেখতে হবে।’
তিনি বলেন, গত ১৫ বছরে দেশের বিভিন্ন খাতে দুর্নীতির পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে বলে তিনি মনে করেন। স্বাস্থ্য খাতও এর বাইরে নয়। দীর্ঘ সময় ধরে কোনো খাতে দুর্নীতির কাঠামো চলতে থাকলে তা পরিবর্তন করা সহজ হয় না।
তথ্য উপদেষ্টা বলেন, ‘বাংলাদেশে কখনো দুর্নীতি ছিল না, তা বলছি না। ছিল কম-বেশি। তবে গত ১৫ বছরে পরিস্থিতি অকল্পনীয় মাত্রায় অবনতি হয়েছে। দুর্নীতি ও অনিয়মের প্রভাব পড়েছে দেশের প্রায় প্রতিটি খাতেই।’
স্বাস্থ্য খাতে পরিবর্তনের উদ্যোগ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরেজমিনে কাজ করছেন। পাশাপাশি স্বাস্থ্য খাতে বাজেট বরাদ্দ বাড়ানো হচ্ছে। এসব উদ্যোগের মাধ্যমে ধীরে ধীরে স্বাস্থ্য ব্যবস্থার উন্নতি হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
তিনি বলেন, ‘আমাদের বাজেট বরাদ্দ অনেক, প্রায় দ্বিগুণ করে ফেলা হচ্ছে।’ তবে শুধু বরাদ্দ বাড়ানোই যথেষ্ট নয়, স্বাস্থ্য খাতে দীর্ঘদিনের অনিয়ম ও দুর্নীতির কাঠামো থেকে বেরিয়ে আসার জন্য ধারাবাহিকভাবে কাজ করতে হবে।
দুর্নীতি কমানোর অগ্রগতি পরিমাপের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান কত নম্বরে রয়েছে, শুধু সেটিকে বিবেচনায় না নিয়ে দেশের স্কোর কতটা উন্নত হচ্ছে, সেটিও গুরুত্ব দিয়ে দেখার আহ্বান জানান তিনি।
এ সময় বিএনপিকে নিয়ে প্রচলিত ‘দুর্নীতিতে চ্যাম্পিয়ন’ হওয়ার দাবির প্রসঙ্গও তুলে ধরেন তথ্য উপদেষ্টা। তিনি বলেন, বিএনপি পাঁচবার দুর্নীতিতে চ্যাম্পিয়ন হয়েছে—এমন একটি প্রচার রয়েছে। তবে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের সংশ্লিষ্ট সূচকের স্কোর বিশ্লেষণ করলে ভিন্ন চিত্র পাওয়া যায় বলে তিনি দাবি করেন।
জাহেদ উর রহমান বলেন, ‘আপনি যদি স্কোর দেখেন, প্রতি বছর বিএনপির স্কোর আগের চাইতে বেটার হয়েছে। তার মানে বিএনপি ক্রমাগত দুর্নীতি কমিয়ে এনেছে।’
তিনি বলেন, ভবিষ্যতে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল দুর্নীতির সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান প্রকাশ করবে। তখন দেশের অবস্থান কত নম্বরে রয়েছে, তার পাশাপাশি স্কোরের পরিবর্তনও গুরুত্ব দিয়ে দেখা প্রয়োজন।
তিনি বলেন, ‘ওই র্যাংকিংয়ে অবস্থান আমরা কত, তার চাইতে আমাদের র্যাংকিংয়ের পয়েন্ট কত, আমি আপনাদেরকে এটা ফলো করার জন্য অনুরোধ করব।’
দুর্নীতি কমানোর প্রক্রিয়ায় ধীরে ধীরে পরিবর্তন আসবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করে তথ্য উপদেষ্টা বলেন, সরকার এই পরিবর্তনের গতি যতটা সম্ভব দ্রুত করার বিষয়ে নজর রাখবে।
তিনি আরও বলেন, ‘আমি বিশ্বাস করি, ক্রমাগত আপনি দেখবেন এটা চেঞ্জ তো হবে। তবে এই গতিটা যতটা ফাস্টার করা যায় সরকারের সেদিকে নজর থাকবে।’
স্বাস্থ্য খাতে দুর্নীতি ও অনিয়মের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি চিকিৎসকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ বলে সংবাদ সম্মেলনে উঠে আসে। রোগীর মৃত্যুকে কেন্দ্র করে কোনো অভিযোগ বা অসন্তোষ তৈরি হলে তা আইন ও প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সমাধানের ওপর গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।