নিরাপত্তার চাপে ইসরাইলমুখী হচ্ছে সৌদি আরব?

আন্তর্জাতিক ডেস্ক:

রিয়াদে হামলা, ইয়েমেনের হুথিদের হুমকি এবং যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সহায়তা নিয়ে অনিশ্চয়তা—সব মিলিয়ে নতুন নিরাপত্তা সমীকরণের মুখে সৌদি আরব। এমন পরিস্থিতিতে ইসরাইলের সঙ্গে গোপন নিরাপত্তা সহযোগিতা বাড়ানোর বিষয়টি দেশটির কৌশলগত আলোচনায় গুরুত্ব পেতে পারে। তবে নিরাপত্তার প্রয়োজনে সহযোগিতা বাড়ানো আর আনুষ্ঠানিকভাবে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্বাভাবিক করা এক বিষয় নয়।

মুসলিম বিশ্বে সৌদি আরবের রাজনৈতিক অবস্থান, ফিলিস্তিন প্রশ্নে দেশটির ঘোষিত নীতি এবং অভ্যন্তরীণ জনমত—সবকিছুই ইসরাইলের সঙ্গে সম্পর্কের ভবিষ্যৎ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। ফলে নিরাপত্তার চাপ বাড়লেও রিয়াদ কতটা ইসরাইলের দিকে ঝুঁকবে, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে।

সৌদি আরবের নিরাপত্তা হিসাব-নিকাশে হুথিদের সামরিক সক্ষমতা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ১০ অক্টোবর রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে হামলায় ১২ জন নিহত ও তিন শতাধিক মানুষ আহত হন। পরদিনও বিমানবন্দর লক্ষ্য করে হামলার খবর আসে। এসব ঘটনায় দেশটির গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বেড়েছে।

তেল পরিবহন ব্যবস্থাও সৌদি আরবের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে। হরমুজ প্রণালি দিয়ে তেল পরিবহন ব্যাহত হওয়ায় দেশটি বিকল্প হিসেবে ইস্ট-ওয়েস্ট পাইপলাইন ব্যবহার করে আসছিল। ওই ব্যবস্থায় হামলার অভিযোগ এবং লোহিত সাগরে সৌদি জাহাজকে লক্ষ্যবস্তু করার খবর দেশটির জ্বালানি বাণিজ্যের ঝুঁকি বাড়িয়েছে।

ইয়েমেনের হুথিরা ইরানের ঘনিষ্ঠ মিত্র হিসেবে পরিচিত। তাদের সঙ্গে সংঘাতের ঝুঁকি বাড়লে সৌদি আরবের জন্য নিজস্ব প্রতিরক্ষা জোরদারের পাশাপাশি গোয়েন্দা তথ্য বিনিময়, ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ও আঞ্চলিক নিরাপত্তায় সহযোগিতা বাড়ানো গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

এ ধরনের ক্ষেত্রে ইসরাইলের সঙ্গে সৌদি আরবের স্বার্থের কিছু মিল থাকতে পারে। ইরান ও হুথিদের সামরিক তৎপরতা পর্যবেক্ষণ, গোয়েন্দা তথ্য বিনিময় এবং আকাশ প্রতিরক্ষার মতো বিষয়ে সহযোগিতার সুযোগ রয়েছে। তবে এ ধরনের সহযোগিতা বাস্তবে কতটা বাড়ছে, তা নিশ্চিতভাবে বলার মতো তথ্য এখানে নেই।

দীর্ঘদিন ধরে সৌদি আরবের প্রধান নিরাপত্তা অংশীদার যুক্তরাষ্ট্র। কিন্তু হুথিদের বিরুদ্ধে সম্ভাব্য সংঘাতে ওয়াশিংটন কতটা সরাসরি ভূমিকা নেবে, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হলে রিয়াদ বিকল্প আঞ্চলিক সহযোগিতার পথ বিবেচনা করতে পারে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ১০ অক্টোবর সৌদি অভিযানে যুক্তরাষ্ট্রের অংশগ্রহণের বিষয়টি বিবেচনার কথা বলেন। ওয়াশিংটনের ভূমিকা নিয়ে অনিশ্চয়তা সৌদি আরবের নিরাপত্তা কৌশলে নতুন হিসাব তৈরি করতে পারে।

তবে সৌদি আরবের সামনে বিকল্প হিসেবে শুধু ইসরাইলই নেই। পাকিস্তান ও তুরস্কের সঙ্গেও দেশটির প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা সহযোগিতার সম্পর্ক রয়েছে। ফলে নতুন কোনো নিরাপত্তা সমীকরণ তৈরির ক্ষেত্রে রিয়াদকে একাধিক আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক অংশীদারের ভূমিকা বিবেচনা করতে হবে।

ইসরাইলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণের পথে সৌদি আরবের ঘোষিত অবস্থান এখনো বড় বাধা। রিয়াদ বলে আসছে, ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সুস্পষ্ট পথ ছাড়া ইসরাইলের সঙ্গে পূর্ণাঙ্গ সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণ সম্ভব নয়।

অন্যদিকে, ফিলিস্তিন প্রশ্নে ইসরাইলের বর্তমান অবস্থান ও রাজনৈতিক বাস্তবতা দুই পক্ষের মধ্যে সমঝোতাকে জটিল করে তুলেছে। সৌদি জনমতও এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। মুসলিম বিশ্বের অন্যতম প্রভাবশালী দেশ হিসেবে ফিলিস্তিন ইস্যুতে সৌদি আরবের অবস্থানের কূটনৈতিক গুরুত্ব রয়েছে।

তাই নিরাপত্তার প্রয়োজনে ইসরাইলের সঙ্গে কোনো ধরনের সহযোগিতা বাড়লেও তা দ্রুত আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক সম্পর্কে রূপ নেবে—এমন নিশ্চয়তা নেই। বরং প্রকাশ্য সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণের পরিবর্তে সীমিত নিরাপত্তা সহযোগিতা নিয়ে আলোচনা এগোনোর সুযোগ থাকতে পারে।

সব মিলিয়ে, সৌদি আরবের সামনে এখন একদিকে হুথিদের সামরিক হুমকি ও গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর নিরাপত্তা, অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা এবং ফিলিস্তিন প্রশ্নে রাজনৈতিক অবস্থান—এই তিনটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। এসব সমীকরণ কীভাবে বদলায়, তার ওপরই নির্ভর করবে ইসরাইলের সঙ্গে সৌদি আরবের ভবিষ্যৎ সম্পর্ক কোন পথে এগোবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *